নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে প্রচুর ইলিশ। ধরা পড়া অধিকাংশ ইলিশের পেটে রয়েছে ডিম। মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের দেওয়া নিষেধাজ্ঞার সঠিক সময় নির্ধারণ হয়নি বলে মনে করছেন জেলে ও ইলিশ ব্যবসায়ীরা।
এতে করে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে তাদের মনে।
তবে মৎস্য বিভাগ বলছে, মা ইলিশ রক্ষা কার্যক্রম সফল হয়েছে। এ বছর ৯০ ভাগ ইলিশ নদীতে ডিম ছাড়তে পেড়েছে বলে দাবি তাদের।
৯ থেকে পর্যন্ত ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ ছিল।
আমাদের চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীতে নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেরা জাল নিয়ে নদীতে নামে মাছ ধরতে নামেন। তাদের জালে ইলিশও ধরা পড়ছে প্রচুর। ইলিশ বেশি পাওয়ায় সরগরম চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাট।
শুক্রবার দুপুরে চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাট ঘুরে দেখা যায়, জেলেরা নৌকা বোঝাই ইলিশ নিয়ে আসছে মাছঘাটে। তা ছাড়া ভোলা ও বরিশালসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকেও ইলিশ আসছে ট্রলার ও ট্রাকে করে।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য সমিতির সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান কালূ ভূইয়া ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত বলেন, প্রতিটি ইলিশের পেটেই পর্যাপ্ত ডিম রয়েছে। গত বছর এ সময়ে ইলিশের পেটে ডিম না থাকলেও এ বছর অধিকাংশ ইলিশের পেটে ডিম রয়েছে।
সঠিকভাবে পর্যালোচনা করে ইলিশের প্রজনন সময় নির্ধারণের দাবি জানিয়ে তারা আরো বলেন, ইলিশ প্রজননের মূল সময়টা চিহ্নিত করে অল্প সময়ের জন্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হোক। ইলিশ ডিম ছাড়তে না পারলে ভবিষ্যতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে বড় আকারের ইলিশ মণপ্রতি ২৮ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা, মাঝারি আকারের মণপ্রতি ২০ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকা এবং ছোট সাইজের ইলিশ মণপ্রতি ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে জানান তারা।
ইলিশ গবেষক, মৎস্যবিজ্ঞানী ড. মো. আনিছুর রহমান, চান্দ্রমাসের ভিত্তিতে ইলিশ ধরায় যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তা সঠিক দাবি করে বলেন, পূর্ণিমা ও অমাবস্যাকে কেন্দ্র করে মা ইলিশ নদীর মিঠা পানিতে ডিম ছেড়েছে।
ইলিশের পেটে ডিম থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, সারা বছরই ইলিশের পেটে ডিম থাকে। নিষেধাজ্ঞা যদি আরো কয়েক দিন বাড়ানো হতো, তবে জেলেদের কষ্ট আরো বৃদ্ধি পেত। মা ইলিশ যে ডিম ছেড়েছে তা জাটকা রক্ষা কার্যক্রমের সময় বাঁচিয়ে রাখলে আগামী মৌসুমে ইলিশের উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পাবে বলে জানান তিনি।
চাঁদপুর সদর উপজেলার পুরানবাজার রণগোয়াল, বহরিয়া, ইব্রাহিমপুর, হরিনা ফেরিঘাট এলাকার জেলেরা জানান, নিষেধাজ্ঞা শেষে বৃহস্পতিবার থেকে তারা নদীতে মাছ ধরছেন। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর পদ্মা-মেঘনায় প্রচুর ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। এতে করে তারা লাভবান হচ্ছেন।
ইলিশের নিষেধাজ্ঞা সঠিক সময়ে করা হয়েছে দাবি করে চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আসাদুল বাকি বলেন, কিছু অসাধু জেলে নিষেধাজ্ঞার সময়ে নদীতে মাছ ধরলেও মা ইলিশ পর্যন্ত ডিম ছাড়তে পেড়েছে। তাই আগামী বছর ইলিশের উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পাবে
বরিশাল থেকে আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো প্রতিবেদনে জানা যায়, শুক্রবার ইলিশের দাম একটু বেশি থাকলেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তা ছিল কম।
শুক্রবারও অনেক ট্রলার এসেছে ইলিশ মোকামে। ভোর থেকে বরিশালের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও জেলেরা পাইকারি বাজারে ইলিশ নিয়ে আসতে শুরু করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ীদের হাঁক-ডাক, শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততায় মুখরিত হয়ে ওঠে পাইকারি বাজারটি।
বরিশাল পাইকারি বাজারের বিক্রেতা পিন্টু দাস বলেন, বাজারে প্রচুর ইলিশ আসছে। তবে সব ইলিশের পেটে ডিম বোঝাই। ধারণা করা হচ্ছে নিষেধাজ্ঞার আগের ধরা ইলিশ সংরক্ষিত ছিল সেই ইলিশই বেশি এসেছে। তবে শনিবার থেকে সাগর এবং নদীর মাছ আসা শুরু করবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইলিশ ধরা হয়েছিল। সেগুলো বাজারে আসেনি। সে ইলিশই এখন আসছে।
বরিশাল জেলা মৎস্য আড়তদার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অজিত কুমার দাস বলেন, শুক্রবার ছয় থেকে নয় শ গ্রামের ইলিশের পাইকারি দর মণপ্রতি ২৪-২৫ হাজার, ১ কেজি ওজনের ইলিশের মণ ৩০ হাজার, ১২ শ গ্রামের ওপরে ইলিশের মণ ৩৫-৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।
বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস জানান, ইলিশের পেটে সারা বছর ডিম থাকে। শুধু প্রধান প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়। বাকি সময় ইলিশের পেটে ডিম থাকলে এটা স্বাভাবিক ঘটনা। নিষেধাজ্ঞার পর জেলেদের জালে প্রচুর মাছ উঠছে। যে কারণে অল্প সময়ের মধ্যে তারা মাছ ধরে বাজারে নিয়ে আসতে পেরেছে।