নিজ শহরে এত্তবড় ফুটবলযজ্ঞ। অথচ খেলতে পারলেন না তার দল ঢাকা আবাহনী চট্টগ্রামে শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্লাব কাপ থেকে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ানোয়। বন্দরনগরীতে আট ক্লাবের এই আন্তর্জাতিক আসর শুরুর প্রথম দিন থেকেই তাই মন ভার ঢাকা আবাহনীর অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার মামুনুল ইসলামের। তাই তো আসরের শেষ দিন অর্থাৎ ফাইনাল দেখতে প্রিয় শহরে এসে হাজির জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক। হাজারো দর্শকের সঙ্গে তিনিও উপভোগ করলেন চট্টগ্রাম আবাহনী ও তেরেঙ্গানু এফসির ফাইনাল। সেই ফাঁকে এই টুর্নামেন্ট, নিজের আন্তর্জাতিক ও ক্লাব ক্যারিয়ার, অবসর ভাবনা, সর্বোপরি দেশের ফুটবল নিয়ে গল্পে মেতেছিলেন দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ’র সঙ্গে। দীর্ঘ আলাপচারিতার চুম্বক অংশগুলো তুলে ধরা হয়েছে এবারের সাক্ষাৎকারে।
প্রশ্ন : চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট। অথচ আপনি খেলতে পারলেন না। কেমন লাগছে?
মামুনুল ইসলাম : চট্টগ্রামে খেলতে সব সময় মুখিয়ে থাকি। এখানে সবাই আমাকে চেনে, আমার খেলা ভালোবাসে। সুযোগ পেলে তাই সেটা নষ্ট করতে চাই না। আসলে আমার খানিকটা দুর্ভাগ্যই। ২০১৫ সালে প্রথম আসরে শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাব আমাদের খেলার জন্য অনুমতি দেয়নি বলে ছিলাম দর্শক হয়ে। ২০১৭-তে অবশ্য চট্টগ্রাম আবাহনীর হয়ে খেলেছি। কিন্তু সেমিফাইনালেই বিদায় নিতে হয়েছিল। এবার মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দল পুরোপুরি গোছানো সম্ভব হয়নি বলে আমাদের দল নাম প্রত্যাহার করে নেয়। ক্লাব যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা হয়তো সঠিক। তবে খেলতে না পারার দুঃখ তো খানিকটা থাকবেই। শত হলেও খেলাটা যে আমার প্রাণের শহরে।
প্রশ্ন : খেলতে পারেননি। তবে খেলা তো দেখেছেন। কেমন মনে হলো এবারের এই টুর্নামেন্ট?
মামুনুল : টুর্নামেন্ট অবশ্যই সফল হয়েছে। কারণ দুটি স্থানীয় দলের মধ্যে একটি দল ফাইনাল খেলছে। এই আসরের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের ফুটবলের এগিয়ে যাওয়ার প্রমাণ দেওয়া যায়। ফাইনালে মালয়েশিয়ান দলকে হারাতে না পারলেও কিন্তু আমাদের ফুটবল এগিয়ে যাবে। কারণ এশিয়ান ফুটবলে মালয়েশিয়া তৃতীয় স্তরে রয়েছে। আর বাংলাদেশের অবস্থান সেখানে পঞ্চম স্তরে। সব মিলিয়ে ভালো একটা দল হিসেবেই ফাইনাল খেলেছে চট্টগ্রাম আবাহনী। হয়তো ফাইনালে শক্তিশালী মালয়েশিয়ান দলের সঙ্গে পারেনি। তবে ওদের বিদেশিরা ভালো করেছে। আর কোচ (মারুফুল হক) তো দেশের সেরাদের একজন। চট্টগ্রাম আবাহনীর ফুটবলারদের আত্মনিবেদনটা খুব ভালো লেগেছে এই আসরে।
প্রশ্ন : পুরো টুর্নামেন্টেই প্রচুর দর্শক এসেছে দেখলাম...
মামুনুল : দেখুন, এটা চট্টগ্রামে হয়েছে বলে বলছি না। আসলে ফুটবলের জনপ্রিয়তা একবিন্দুও কমেনি। আজ এ রকম একটা আসর দেশের অন্য যেকোনো প্রান্তে আয়োজন করুক, দেখবেন হাজারো দর্শক এসে উপস্থিত হবেন। ঘরোয়া পর্যায়ে দর্শক না হওয়ার কারণ মানুষ এখন তাদের জীবন নিয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত। কিন্তু আন্তর্জাতিক ম্যাচ হলে ঠিকই মানুষ সমর্থন জানাতে আসে। দেখবেন, বাংলাদেশ সামনে যখন আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলবে বিশ^কাপ বাছাইয়ের কিংবা বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপে তখন ঠিকই প্রচুর মানুষ উপস্থিত হবে। আসলে একটু ইতিবাচক রেজাল্ট হলেই সবাই সমর্থন দিতে শুরু করে। আরেকটা কথা বলি, আমরা যারা এখন খেলি তাদের একটা কষ্ট আছে। সেটা হলো আমাদের সাবেক বড় ভাইরা বলে বেড়ান যে, এদেশে তারকা ফুটবলার নেই। তাই মানুষ মাঠে আসতে চায় না। এটা শুনলে খারাপ লাগে। মানের দিক দিয়ে কিন্তু আগের চেয়ে আমাদের ফুটবল অনেক এগিয়েছে।
প্রশ্ন : মানের কথাই যেহেতু এলো, আপনি তো জাতীয় দলে কয়েকটা ধাপ দেখেছেন। ভালো-মন্দ সবই দেখেছেন। আগের চেয়ে জাতীয় দল মানের দিক দিয়ে কতটা এগিয়েছে?
মামুনুল : অতীতেও মান যে খুব খারাপ ছিল, সেটা ঠিক না। গত বিশ^কাপ বাছাইপর্বের দলগুলোর কথা ভাবুন। আমাদের খেলতে হয়েছে অস্ট্রেলিয়া, জর্ডানের মতো দলের বিপক্ষে। এছাড়া তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান ছিল। এবার কিন্তু আমরা উপমহাদেশের দুটি দল পেয়েছি গ্রুপে। ভারত এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে ম্যাচে আমাদের সুযোগ থাকে সমান সমান। তবে আমাদের খেলার ধরনে একটা পরিবর্তন এনেছেন কোচ জেমি ডে। আমরা আগে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে চাইতাম। কিন্তু এখন খেলি প্রতি আক্রমণনির্ভর ফুটবল। যেটার সঙ্গে আমরা ভালোভাবেই মানিয়ে নিয়েছি। জেমি আসলে আমাদের সামর্থ্য বুঝতে পেরেই এই কৌশলটার সঙ্গে আমাদের ধাতস্থ করে তুলছেন। ফলে দল ভালো করছে। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের তিনটি ম্যাচেই দেখবেন আমরা গোছানো ফুটবল খেলেছি। এই ম্যাচগুলো থেকে অনেক আত্মবিশ^াস আমরা পেয়েছি, যা সামনের ম্যাচগুলোতে সহায়তা দেবে।
প্রশ্ন : সামনে বলতে আপনাদের পরবর্তী ম্যাচ ওমানের মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে ১৪ নভেম্বর। দু-এক দিনের মধ্যেই আপনারা সেখানে চলে যাচ্ছেন...
মামুনুল : পরিবর্তনটা দেখুন। আগে কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার আগে আমরা খুব বেশি প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পেতাম না। আর এখন আমরা প্রস্তুতি নেই কাতারে গিয়ে। বিভিন্ন জায়গায় কন্ডিশনিং ক্যাম্প হচ্ছে। প্রচুর প্রস্তুতি ম্যাচ খেলারও সুযোগ পাচ্ছি। কয়েক বছর আগেও আমরা এ রকম সুযোগ-সুবিধা পাইনি। ওমানের ম্যাচটা যেহেতু ওদের মাঠে, সেহেতু সেখানে জয় পাওয়া কঠিন হবে। তবে কাতার ও ভারতের ম্যাচে এটা প্রমাণিত যে, আমরা যে ২৩ জন খেলব, তারা তাদের শতভাগ দিতে প্রস্তুত। আমি কিন্তু বাছাই নিয়ে খুব ইতিবাচক। এখানে আমাদের আরও ভালো করার যথেষ্ট সুযোগ আছে।
প্রশ্ন : দীর্ঘদিন জাতীয় দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখন নতুন অধিনায়ক জামাল ভুইয়া। পূর্বসূরিকে অধিনায়ক হিসেবে কেমন মনে হচ্ছে?
মামুনুল : একজন অধিনায়কের দায়িত্ব কিন্তু কেবল মাঠে নয়। মাঠের বাইরেও অনেক দায়িত্ব থাকে। খেলোয়াড়দের মোটিভেটেড করা, সাহস দেওয়া। সুসময়-দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো, এসব কাজও করতে হয়। এখন জাতীয় দলে ভালো একটা সময় যাচ্ছে। আমি এখনই তাই জামালের নেতৃত্ব নিয়ে বেশি কিছু বলব না। ও তখনই সত্যিকারের অধিনায়ক হয়ে উঠবে, যখন দলের দুঃসময়ে অবদান রাখতে পারবে। তবে বর্তমান এই দলটির অধিনায়ক হিসেবে আমি মনে করি জামালই সবচেয়ে যোগ্য। দু’বছর আগের জামাল এবং এখনকার জামালের মধ্যে আমি অনেক পরিবর্তন দেখেছি। দু’বছর আগের জামাল কেবল খেলার জন্য খেলত। কিন্তু এখনকার জামাল খেলে দেশের জন্য, অনেক বেশি দায়িত্ব নিয়ে। আমি টানা ছ’বছর অধিনায়ক ছিলাম। এরপর কিন্তু দলের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। জামাল সেই জায়গাটা ভালোভাবেই পূরণ করেছেন।
প্রশ্ন : এখন অধিনায়ক না থাকলেও দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ হিসেবে বাড়তি কিছু দায়িত্ব নিশ্চয় এসে পড়ে?
মামুনুল : আমি আসলে চাইলেও দায়িত্ব এড়াতে পারব না। এখনকার দলটির বেশিরভাগই তরুণ। মাঠে ও মাঠের বাইরে তাদের সাহস দেওয়ার দায়িত্বটা না চাইলেও পালন করতে হয়। কোচও হয়তো মনে করেন দলে আমার উপস্থিতি তরুণদের পরিণত করে তুলতে সাহায্য করে। আর আরেকটা কথা। আমার আসলে প্রমাণ দেওয়ার কিছু নেই। দীর্ঘদিন দেশকে সার্ভিস দিচ্ছি। সম্প্রতি অনেকে আমার ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আমি একটা কথাই বলব, ফিটনেস যদি খারাপই হয় তবে জেমি ডে’র দলে কেন আমি বারবার সুযোগ পাই। এই কোচ তো সব সময় ফিটনেসের দিকে জোর দেন। এ কারণেই আমাদের সময়ের অনেকে ছিটকে গেছেন। কই আমি তো ঠিকই নতুনদের সঙ্গে সমান্তরালে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। আমার প্রয়োজনীয়তা আছে বলেই তো কোচ আমাকে দলে নেন। তবে এটা ঠিক, আগের চেয়ে ক্লাব পর্যায়ে কোচরা ফিটনেস নিয়ে অনেক বেশি কাজ করেন। যার সুফল জাতীয় দল পাচ্ছে।
প্রশ্ন : জাতীয় দলের কোচ জেমি ডে সম্পর্কে কিছু বলবেন?
মামুনুল : আগেও বলেছি, ও আমাদের সামর্থ্যটা সম্পর্কে খুব স্বচ্ছ ধারণা নিয়েই একটা স্টাইল ঠিক করে খেলাচ্ছে। কোচ হিসেবে ও খুবই ফ্রেন্ডলি। তবে ফিটনেসে তার কড়া নজর। বলতে পারেন, আমি এখনো জাতীয় দলে সার্ভিস দিচ্ছি জেমির কারণেই। সবার কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনার ক্ষমতা আছে ওর।
প্রশ্ন : আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের কথা ভাবছেন শুনলাম?
মামুনুল : আমার বয়স এখন ৩০। একটা জায়গায় তো সবাইকেই থামতে হবে। জাতীয় দলে হয়তো আমার প্রয়োজন এখনো ফুরায়নি। তাই তো কোচ বারবার আমাকে দলে নেন। আবাহনীর হয়ে এএফসি কাপে আমাকে দেখেছেন তিনটা ম্যাচ পুরো সময় খেলেছি। শেষ মুহূর্তে দূরপাল্লার শটে গোলও করেছি একাধিক। যদি ফিট না থাকি, তবে শেষ মুহূর্তে কীভাবে এই শট নিতে পারি, বলেন। আমি মনে করি এখনো এক বছর জাতীয় দলকে সার্ভিস দেওয়ার সামর্থ্য আমার আছে। সেই সঙ্গে এটাও ভাবি, আমি না সরলে তো আরেকটি নতুন ছেলে সুযোগ পাবে না। তাই এখন থেকেই একটু একটু করে ভাবছি। এমনও হতে পারে বিশ^কাপ বাছাইয়ে দেশের মাটিতে ভারতের বিপক্ষেও অবসর নিতে পারি। আমি এদেশের ফুটবলকে কতটা দিতে পেরেছি সেটা ভক্তরাই বলতে পারবেন। আমার একটাই চাওয়া জাতীয় দলের জার্সিটা যাতে মাথা উঁচু করেই খুলে রাখতে পারি। শেষবেলায় যাতে যোগ্য সম্মানটা পাই। অবসর নিয়ে যখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব, তখন অবশ্যই আপনাদের জানাব।