১৬ শতকের অবিকল, আমাদের ও ইউরোপের ধারার নাগরীর বিখ্যাত গির্জাটি কেমন? কীভাবে চলে? লেখাপড়া শেখানোর কাজ ইত্যাদি সব নিয়ে লিখে ছবি তুলেছেন আমিনুল ইসলাম
সারা দুনিয়ার খ্রিস্টান ধর্মপ্রাণ ও গবেষকরা চেনেন 'সেইন্ট নিকোলাস’স চার্চ' আর বাংলাভাষীদের কাছে 'সাধু নিকোলাসের গির্জা'। আছে আমাদের দেশে। নিকোলাস খ্রিস্টধর্মের একেবারে শুরুর দিকের কিংবদন্তি বিশ্বখ্যাত প্রচারক। ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের অংশ এশিয়ার কম গুরুত্বপূর্ণ, একেবারেই ছোট, সাগর উপকূলের নগররাষ্ট্র মাইরাতে থাকা মানুষ। তখন তারা রোম সম্প্রাজ্যের অংশ। জন্মেছেন ২৭০ সালে, মারা গিয়েছেন ৩৪২ সালে। ধর্মীয় কাজগুলো সম্পাদন ও অমিয় যিশুর বাণী ছড়িয়েছেন। এই ‘খ্রিস্টান বিশপ (উচ্চপদের খ্রিস্টীয় যাজক)’ তখন থেকেই অনুকরণীয়; অনুসরণীয়। তার বাণী ও জীবন পৌঁছেছে দুনিয়ার নানা প্রান্তে। পর্তুগিজরা তাদের এই অঞ্চলটি শাসন করার সময়ে ১৬৬৩ সালে নিকোলাসের আরেক উত্তরসূরি বা পরের ধর্মপ্রচারক ‘নিকোলাস অব টলেন্টিনো’র নামে গির্জাটি তৈরি করেন। তিনি পবিত্র আত্মার পৃষ্ঠপোষক, মরমি মানুষ। সেসব কথা ইতিহাসে তোলা থাক। আসি গির্জার অসাধারণ জীবনে।
এখনো সেই তৈরির সালটি ভেতরে লেখা। ১৬৬৩ সালে তৈরির ১৭ বছর পর পবিত্র এই ধর্মস্থান পাকা ভবন হলো। পর্তুগিজদের স্থাপত্য নিদর্শনের অনন্য বৈশিষ্ট্য হয়ে এখনো আছে পুরনো গির্জাটি। একতলা হলুদ রঙের ভবন। হলুদ রঙের দালানটির টিকে আছে বিরাট মোটা হলুদ থামে। সেগুলো পাঁচটি। ছাদ সামনের দিকে। সামনে বড় বাঁধানো বারান্দা, ভেতরে একসঙ্গে প্রার্থনার জন্য প্রার্থনাঘর, ফাদারের স্থান এবং একান্তভাবে ঈশ্বরকে ডাকার রুম আছে। আজও সাধু নিকোলাসের এই পবিত্র গির্জাতে খ্রিস্টানরা প্রতি রবিবারে প্রার্থনা করেন। হাজার ঝড়, বিপদ, জীবনের সংকট তাদের থামাতে পারেনি। ধীরে ধীরে তারা বেড়েছেন, নানা জায়গা থেকে এসেছেন। আছে তাদের পুরনো দানবাক্স। ১৮৮৮ সালে আরও বড় গির্জাভবন তৈরি করতে হলো সবাইকে মিলে। সেটি বিখ্যাত ভাওয়াল রাজাদের রাজবাড়ির আদলে তৈরি। তত দিনে সন্দীপে চলে গিয়েছেন পর্তুগালের ব্যবসা করতে আসা মানুষগুলো। যাদের শুরু হয়েছিল ভাস্কো দ্য গামা নামের বিশ্বখ্যাত দুঃসাহসী অভিযাত্রীর মাধ্যমে। নতুন এই গির্জাভবনের সামনে এখনো নাম লেখা আছে, ‘টলেন্টিনোর সাধু নিকোলাসের গির্জা’। আলাদা সেই লেখার রীতি। এই রীতিতেই লেখা হয়েছিল বোধহয় আঞ্চলিক বাংলা ভাষায় প্রথম বাইবেল। এটি পবিত্র বাইবেলের অনুবাদ। পরে বাংলায় দুই ভাষার অভিধান ও বাংলায় প্রথম ছাপা বই প্রকাশ করেন তারা। সাধু নিকোলাসের গির্জাগুলোতে যেমন থাকে সারা দুনিয়াতে খ্রিস্টান প্রাচীন স্থাপত্য রীতি ‘নার্দেক্স’ (দেয়ালের বিভিন্ন কোণে পর্তুগিজরীতির নকশা, পুরনো প্রাচীন গির্জার দেয়ালে এখনো অক্ষয় হয়ে আছে) সেগুলো বেশ বদলে ফেলেছেন বাংলার কারিগররা। সেগুলো হয়েছে ভাওয়াল রাজবাড়ির আদলে। কেমন? সামনে থেকেই সাক্ষ্য দেয়, আমাদের গ্রামগঞ্জের বৈঠকখানা, আলাপের স্থান কী আড্ডাঘর বাংলা ঘর (কোথাও কাছারি) আদলেই তার শুরু। সেইন্ট নিকোলাসের গির্জাগুলো সব দেশে এমন। ছাদটি সমান এখানেও। ওপরে ভেতরের বাতাস ও আলো প্রবেশের জন্য অনেকগুলো খোপ আছে। এই ছাদ নিচের ছাদের সামান্য ওপরে। নানা আপদে-বিপদে নিরাপদে থাকার জন্য তৈরি হয়েছে। ১৯৭১ সালে এখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন তারা। ছিলেন বিদেশী ফাদাররা। তার ওপর ছাতা আকারের আরও নিরাপত্তা বেষ্টনী আছে ইউরোপের মসজিদগুলোর মতো। সহকারী পুরোহিত ফাদার ভিনসেন্ট গোমেজ বললেন, 'এই স্থাপত্যকর্ম গবেষণার দাবি রাখে। তবে আমাদের ধারণা, বাংলাদেশের, ইউরোপের গির্জার স্থাপত্যকর্মের অনন্য নিদর্শন। কারিগররা বাংলাদেশের, তারা ইউরোপীয় ধারায় তৈরি করেছেন। বিদেশিদের চাহিদাকে সমন্বয় করে অপূর্বভাবে বানিয়েছেন।' সামনেই ১২টি লোহার তৈরি থাম আছে। বারান্দা থেকে তিন দরজায় ভেতরের বিরাট হলরুমে প্রবেশ করা যায়। স্তম্ভগুলোর ওপরই দাঁড়িয়ে আছে ছাদ। ঢাকার তেজগাঁও গির্জার সঙ্গে অনেক মিল আছে। ওপরের ছাদটি ছয়-আট কোণের মতো করে সেমি-গোথিক (ফ্রান্স থেকে জন্ম নেওয়া ইউরোপের এই স্থাপত্য রীতি উচ্চতাকে মূল্য দিয়ে প্রকাশ করে জটিল অথচ সুন্দর, কোমল সৌন্দর্য; আমাদের দেশের প্রাচীন স্থাপত্যরীতিও এখানে তাতে যুক্ত হয়েছে) রীতির স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেগুলোকে ভিত্তি ধরে ছাদে প্রায় গোল প্রবেশপথ আছে; আপদে-বিপদে বাঁচার জন্য। দেখতে আমাদের কুঁড়েঘরের মতো। উত্তরমুখী তার প্রবেশপথ। মোট চারটি। প্রথম তিনটি দিয়ে বারান্দা হয়ে ঢোকা যায়। আর দক্ষিণের প্রার্থনাঘরে ঢোকা যায় খিলানে মোড়া পথ পেরিয়ে। মানে মাথার ওপরের অংশে অলংকার করা। মোট ১২টি বিরাট খোলা জানালা আছে গির্জায়। পূর্ব ও পশ্চিমের সবগুলো জানালাতে আছে ইউরোপ ও দেশীয় আমেজের স্থাপত্যশৈলী, যেগুলো আমাদের অলংকার। তখন থেকে বংশ পরম্পরায় ধর্মের অনুসারীরা মনে করেন, তখন আমাদের গরম ও জল আবহাওয়া মেনে এই বিরাট পবিত্র স্থান তৈরি। সবকিছুর ওপরে সুন্দর ক্রুশ আছে। আছে ঘণ্টা-সেমি-গোথিক স্টাইলের। বিশ্বখ্যাত এই গির্জাটিতে এখন আর প্রথম বাইবেল, বইটি নেই। ঢাকার মহাখালী বা কাকরাইলের গির্জাতে সংরক্ষিত। তারপরও পবিত্রতা, আবেদন এতটুকু কমেনি বিরাট গির্জা এলাকায়। পুরো গির্জাভবন, দুটি বিদ্যালয় আর আগের গির্জা এবং খ্রিস্টানদের সমাধিসৌধগুলো মিলিয়ে চার থেকে পাঁচ একরের বিরাট এলাকা। মোট ৩৯টি গির্জা আছে কালীগঞ্জে; তার মধ্যে সেরা। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ ব্যস্ত। ঢাকা বিভাগের গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলা, সেখানেই নাগরী ইউনিয়ন। মোট ১৫টি গ্রাম; লাখের বেশি খ্রিস্টানের বাস। বালু আর শীতলক্ষ্যা নদীতীরের এক অসাধারণ ইতিহাসের সাক্ষী শত শত বছর ধরে। খ্রিস্টানরাই এখানে বেশি আছেন। তাদের মিশনারি (সমাজের ভালোর জন্য স্বেচ্ছাশ্রম) কাজ এখানেও চলে। সেই কাজের অংশ হয়ে আছে ১৯১০ সালে চালু হওয়া বিদ্যালয়। তখন নাম ছিল সেইন্ট নিকোলাস বয়েজ প্রাইমারি স্কুল। ব্রিটিশদের ঢাকা জেলা বোর্ড সামান্য যে কটি টাকা অনুদান দিয়েছিল, তার সঙ্গে পর্তুগালের ফাদারের অনুদানে বিদ্যালয়টি আলো ছড়াতে শুরু করে। খুব ভালো লেখাপড়া তখন থেকে। ফলে ১৯২০ সালের ১ সেপ্টেম্বর নিম্নমাধ্যমিক হয়েছে। এখন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা হয়। ইতিহাসের আলো বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের সরকারের অন্যতম শীর্ষ নেতা, স্বাধীনতার সেরা নায়কদের একজন তাজউদ্দীন আহমদ পড়েছেন বিদ্যালয়টিতে। পরে গির্জা চত্বরেই চালু হয়েছে নারীশিক্ষার বিদ্যাপীঠ ‘সেইন্ট নিকোলাস গার্লস হাইস্কুল’। আছে সেটি। পুরো সকাল থেকে বিকেল শিশু-কিশোরের কাকলিতে মুখর থাকে গির্জা প্রাঙ্গণ। বিরাট এক সাদা টাওয়ারের ওপর ঘড়ি সময় জানিয়ে যায় সবাইকে।
এই ঠিকানা ঘিরেই বেঁচে আছেন তারা। নাগরী ইউনিয়নে যে যার কাজে ব্যস্ত খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষরা। ইউনিয়নের রাস্তার মোড়ে ডানপাশে গির্জার প্রবেশপথ। ভেতরে সাদা লম্বা আলখাল্লা (কসাক) পরে ধর্ম ও জীবনের গান গাইছেন ফাদার ও ব্রাদাররা। সিস্টাররা কাজ করছেন তাদের সাদা শাড়িতে। পুরনো প্রথম গির্জাভবনের পেছনে পুরুষ, নারীদের পবিত্র সমাধি। সবগুলোতে প্রভু যিশুর বিখ্যাত ক্রুশ'। মাঝে বিদেশি গাছের সারি। বলে, অনেক বিদেশি নাগরিক শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন এই মাটিতে। পুরনো ভবনের অফিসে এখনো আগের মতোই কাজ হয়। সেখানে এই ধর্মের অফিসার কারও জন্ম, কারও বিয়ে কারও মৃত্যু রেকর্ড করে লিখে রাখেন। আলাদা ফাইলে সাজানো হয়। সব কাজের মতো বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য নতুন দম্পতিরা মা-বাবার সঙ্গে এসে নিবন্ধন করেন। পরে আর সব মানুষের মতো তাদেরও বিয়ে হয় গির্জাতে। ফাদার শান্তি ও সুখের জন্য উপদেশ দেন, প্রার্থনা পরিচালনা করেন। অসাধারণ এই এলাকাতে পর্যটকের আনাগোনা সব সময়। প্রধান ফাদার জয়ন্ত এস গোমেজ; সহকারী ফাদার ভিনসেন্ট গোমেজ পুরো।
নাগরীতে আছে সাধু অ্যান্থনির বিখ্যাত তীর্থ। গির্জা চত্বরের আগে, বামে সামনে পানজোরা গ্রাম। বছরের প্রথম ফেব্রুয়ারির প্রথম শুক্রবার তার অনুসারী ও ভক্তরা নিয়মিত আসেন। দেশের বাইরে থেকেও আসেন অনেক দেশি-বিদেশি। প্রতি বছর নভেনার প্রার্থনা (খ্রিস্টানদের পবিত্র কাজ) শুরু হয় ২৩ থেকে ৩১ জানুয়ারি। ২৮ জানুয়ারি পানজোরার এই তীর্থে সকাল সাড়ে ৬টায় নভেনার খ্রিস্টযোগ (পবিত্রতম মানুষের ধর্ম উপদেশ) আর বিকেল পৌনে ৫টায় দ্বিতীয় খ্রিস্টযোগ হয়। মহাপর্বটিকে হয় পাপ শিকার ও সংস্কার প্রদান। হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন। সাধুর চত্বরে তার পালাগান গাওয়া হয় দিনভর। তিনি ১৭ শতকের একজন ধর্মপ্রচারক। তখনো মানুষের ঠিকানা হয় নাগরীর সেইন্ট নিকোলাসের নামে তৈরি প্রভু যিশুর এই ঘর।