সৌদি আরব সহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নারী গৃহশ্রমিক প্রেরণ বন্ধ এবং অবস্থানরতদের সুরক্ষা প্রদানের ১৬ দফা দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে নিপীড়নের বিরুদ্ধে নাগরিকবৃন্দ।
শনিবার রাজধানীর শাহবাগে এই সমাবেশ করেন তারা। এসময় আইনজীবী, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষক, উন্নয়নকর্মী ও সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার নাগরিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান, সিপিবির এর পক্ষ থেকে লুনা নুর, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম থেকে শম্পা বসু, বাসদ (মার্কসবাদ) এর পক্ষ থেকে রাফিউজ্জামান ফরিদ, এ্যাক্টিভিস্ট শামীম আরা নীপা, নারী নেত্রী ফরিদা আক্তার, সৌদিতে ১০ বছর শ্রমিক হিসেবে কর্মরত দেলোয়ার হোসেন এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে নাগরিকবৃন্দের পক্ষ থেকে বাকি বিল্লাহ বক্তব্য রাখেন।
পররাষ্ট্র নীতির দুর্বলতা তুলে ধরে চুক্তির মাধ্যমে নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, প্রতারক ও দালালগোষ্ঠীকে বিচারের আওতায় আনা, ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়াসহ নানা দাবি তুলে ধরেন। এ ছাড়া বিদেশি দূতাবাসগুলোকে শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিধানে সুস্পষ্ট নীতি মালা তৈরির মাধ্যমে জরুরি সেবা দান ও আইনি সহায়তা প্রদানের দাবি করা হয়। দায়িত্বে অবহেলাকারী এবং প্রবাসীদের হয়রানি ও অবমাননাকারীদের বিচারের আওতায় আনার দাবিও তোলা হয়।
সমাবেশ থেকে ১৬ দফা দাবি তোলা হয়। দাবিগুলো হলোঃ ১. অনতিবিলম্বে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে গৃহকর্মী ও শ্রমিক পাঠানো হয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কাছে তাদের অবস্থান/তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার পাশাপাশি নিয়মিত ফলোআপ নিতে হবে। ২. প্রবাসী শ্রমিক ও গৃহকর্মীদের জন্য দূতাবাসে জরুরি হটলাইন সেবা প্রদান (নিয়ম থাকলেও তা পালন করা হয় না) করতে হবে। ৩. কর্মস্থলে কোন নির্যাতন, দুর্ঘটনা বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখে পড়ে দূতাবাসে সহায়তার চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে আবাসন, খাদ্যসহ আইনি সহায়তা দেওয়ার কথা থাকলেও গৃহকর্মী ও শ্রমিকেরা তা পান না। অবিলম্বে এই সেবাসমূহ কার্যকর করতে হবে।
৪. নির্যাতিত নারী ও পুরুষ শ্রমিকের মামলা করার প্রক্রিয়া সহজ ও মানবিক করতে সৌদি সরকারকে চাপ দিতে হবে। মামলা নিস্পত্তি হওয়া পর্যন্ত শ্রমিককে সৌদিতে থাকতে বাধ্য করার নিয়ম বাতিল করতে হবে। ৫. শারিরীক নির্যাতন,ধর্ষণ, হত্যা এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনা দানকারী হিসেবে অভিযুক্ত সৌদি নাগরিকদের বিচারের আওতায় আনতে সৌদি সরকারের ওপর চাপ দিতে হবে এবং অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৬. দালাল ও রিক্রুটিং এজেন্সির ওপর সমস্ত দায়িত্ব না দিয়ে সরাসরি আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ চুক্তির মাধ্যমে নারী শ্রমিকদের বিদেশে পাঠাতে হবে। এবং চুক্তিতে শ্রমিকের শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তার শর্ত যুক্ত করতে হবে। ৭. অতিরিক্ত মুনাফার জন্য মধ্যস্বত্বভোগী রিক্রুটিং এজেন্সি, যারা নারী শ্রমিকদের অন্যদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ৮. পুরুষ শ্রমিকদের ন্যায় নারী শ্রমিকের দায়দায়িত্ব ৩ মাসের বদলে ২ বছর করতে হবে। ৯. অর্থ লেনদেনের শর্ত না থাকা সত্ত্বেও যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি অর্থের বিনিময়ে নারী শ্রমিক পাঠানোর কাজ করে তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
১০. সৌদি আরবে নির্যাতনকারী মালিককে চিহ্নিত করে পরবর্তীতে তার অধীনে অন্য কোন শ্রমিক বা গৃহকর্মীকে কাজ করানো থেকে বিরত থাকতে হবে। ১১. নির্যাতিত হয়ে নিজ দেশে ফেরার সময় প্রচলিত নিয়মানুসারে সৌদি সরকার কর্তৃক ‘নিয়োগকর্তা তার সঙ্গে কোনো খারাপ আচরণ বা শর্ত ভঙ্গ করেনি’ ধরনের লিখিত বিবৃতি দেওয়ার চুক্তি বাতিল করতে হবে। ১২. নির্যাতিত হয়ে দেশে ফিরে আসা নারীদের পারিবারিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিক নিগ্রহের শিকার হলে, পরিবার গ্রহণ না করলে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
১৩. সৌদি মালিকের নির্যাতনে মৃত্যু এবং আত্মহত্যার শিকার সকল শ্রমিকের পরিবারকে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে ন্যূনতম ২ কোটি টাকা এবং নির্যাতিত হয়ে স্বদেশে ফিরতে বাধ্য হওয়া নারীদের জনপ্রতি ন্যূনতম ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এবং সৌদি আরবে নির্যাতন-নিপীড়নে শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকিতে থাকা শ্রমিককে সরকারের দায়িত্বে দেশে ফেরত আনতে হবে এবং ১ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। ১৪. ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশ সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দেওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র রেমিটেন্সের লোভে সমঝোতার ভিত্তিতে সরকারের যারা বাংলাদেশি নারীদের ধর্ষণ,নির্যাতন ও মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
১৫. নারী শ্রমিকদের উপর নির্যাতন ও ধর্ষণের খবর জানা সত্ত্বেও দূতাবাস ও মন্ত্রণালয়ের যেসব কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে। ১৬. ইতোমধ্যেই যে সকল নারী শ্রমিক নির্যাতিত ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন,তাদের ভয়াবহ ট্রমা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপনের লক্ষ্যে কাউন্সেলিং ও দেশে কর্মসংস্থান এর উদ্যোগ নিতে হবে।