ক্রীড়া সাহিত্যিকদের অনেকেই তাদের লেখায় ক্রিকেটকে জীবনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। জীবনের মতোই কত নাটকীয়তাই না মিশে থাকে ক্রিকেট ম্যাচে। জয়-পরাজয়ের আনন্দ-বেদনার মাঝে এমন কিছুও ঘটে খেলার মাঠে, যা অনেক সময় ট্রাজিক গল্প হয়ে থাকে। তেমনই এক গল্প ঢাকার মাঠে রমন লাম্বার মৃত্যু।
১৯৯৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে মাথায় বলের আগাত লেগে কোমায় চলে যেতে হয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেটার লাম্বাকে। তিন দিন পর ৩৮ বছরের ডাকাবুকো এই ক্রিকেটার সবাইকে কাঁদিয়ে পাড়ি দেন না-ফেরার দেশে। ২১ বছর আগের সেই ঘটনা এখনো বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলটের বুকে ঝড় তোলে। আবাহনী স্পোর্টিং ক্লাবে সেদিন লাম্বা খেলছিলেন পাইলটের নেতৃত্বেই।
শুক্রবার কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে ভারত ও বাংলাদেশ মুখোমুখি হবে দিবারাত্রির টেস্টে। যে ম্যাচে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে থাকছেন বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের অন্যতম সদস্য পাইলট। কলকাতায় পা রাখার আগেই আনন্দবাজার পত্রিকাকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক স্মৃতিচারণা করেছেন লাম্বাকে নিয়ে।
অনেকটা হাহাকার নিয়ে পাইলট বলেন, ‘আমাদের কথা শুনে হেলমেট পরলে রমন লাম্বাকে এ ভাবে চলে যেতে হতো না।’
বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে আবাহনী স্পোর্টিং ক্লাব সেদিন মুখোমুখি হয়েছিল ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের। দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াই মানেই উত্তাপ। এমন ম্যাচেই ঘটে ওই ঘটনা।
স্মৃতির পাতা উল্টে পাইলট বলেন, ‘খেলার মাঠে আবাহনী ও মোহামেডানের লড়াইয়ের কথা সবারই জানা। সেই ম্যাচটা ছিল লো-স্কোরিং। তাই টেনশনও ছিল। আমাদের অধিনায়ক আকরাম ভাই (আকরাম খান) চোটের জন্য মাঠে ছিলেন না। আমি দলটাকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলাম। খুব কম রান করেছিলাম আমরা।’
‘ওই রানের পুঁজি নিয়ে জিততে হলে আমাদের অ্যাটাকিং ফিল্ডিং করতে হতো। সবাইকে ক্লোজে ডেকে নিয়েছিলাম। রমন লাম্বা হেলমেট ছাড়াই দাঁড়িয়ে গেল ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে। আমি বললাম, তুমি হেলমেট নিয়ে নাও। ও পাল্টা বলল, দু-একটা বলের জন্য দরকার নেই হেলমেটের।’
লাম্বা কী আর জানতেন, হেলমেট না পরার জন্যই তাকে মাঠেই জীবন দিতে হবে! পাইলট বলছিলেন, ‘শর্ট বল করেছিল সাইফুল্লাহ খান। অপি (মেহরাব হোসেন) জোরে পুল করে। লাম্বার মাথায় লেগে বলটা এল আমি যেখানে কিপিংয়ের জন্য দাঁড়িয়েছিলাম তার ঠিক পেছনেই। ওয়ালে বল লাগলে যেমন রিটার্ন আসে, লাম্বার মাথায় লেগে ঠিক তেমনটাই হয়েছিল। আমি ধরে ফেলি সেই ক্যাচ।’
আহত লাম্বা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার পরের ঘটনা সবার জানা। ঢাকার একটি হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়। কোমায় চলে যাওয়া লাম্বাকে আর বাঁচানো যায়নি। সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যান ভারতের হয়ে ৪টি টেস্ট ও ৩২টি ওয়ানডে খেলা তারকা।
পাইলট বলেন, ‘রমন লাম্বার কথা খুব মনে পড়ে। যত দিন বেঁচে থাকব, তত দিন ওকে মিস করব। ওর এভাবে চলে যাওয়াটা এখনো মানতে পারি না। অপি আর সাইফুল্লাহ অনেক দিন ভুলতে পারেনি ওই ঘটনা। নিজেদের অপরাধী বলে মনে করত। লাম্বার মাথায় বলটা আছড়ে পড়তেই বুঝেছিলাম খারাপ কিছু একটা হবে। লক্ষণ দেখে সে রকমই মনে হচ্ছিল।’