অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় ধুকে ধুকে মরছে তাজরীনের আহত শ্রমিকরা

সাভারের আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ডের সাত বছর পেরিয়ে গেলেও অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসা ধুকে ধুকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটির আহত শ্রমিকরা। জীবিকার তাগিদে নিজেদেরকে বিভিন্ন পেশায় খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করেও শারীরিক, মানসিক এবং অর্থনৈতিক সমস্যার কারণ বারবার পিছিয়ে পড়ছেন তারা। এছাড়া যারা নিহত হয়েছেন উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসন না পেয়ে পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছেন তাদের স্বজনরা।

সাভারের আশুলিয়ায় নিশ্চিন্তপুর এলাকার তুবা গ্রুপের তাজরীন ফ্যাশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সাত বছর পূর্তি হয়েছে শনিবার। ২০১২ সালের এই দিনে সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার দিকে তাজরীন ফ্যাশনের নিচতলার স্টোর রুম থেকে আগুনে সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে সেই আগুন পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়লে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায় ১১৩ জন শ্রমিক। আগুন থেকে বাঁচতে কারখানা থেকে বিভিন্ন দিক থেকে লাফিয়ে পড়ে এবং অগ্নিদগ্ধ হয়ে আহত প্রায় পাঁচ শতাধিক শ্রমিক। এ ঘটনায় ক্ষতিপূরণ না পেয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়ে বর্তমানে বিনা চিকিৎসায় অনাহারে-অর্ধাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও পরিবারের সদস্যরা।

সরেজমিনে নিশ্চিন্তপুর এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, তাজরীন ট্র্যাজেডিতে আহত অনেক শ্রমিক জীবনের তাগিদে এবং ক্ষতিপূরণের আশায় এখনো ওই এলাকার বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে ভাড়া থেকে মানবেতর জীবন যাপন করছে। আহত শ্রমিকরা অর্থের অভাবে নিজেদের চিকিৎসা করাতে পারছে না। খেয়ে না খেয়ে বর্তমানে অনাহারে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছে নিহতের স্বজন ও আহত শ্রমিকরা। ২৪শে নভেম্বর এলেই সেই দিনের ভয়াবহ আগুনের ঘটনা এখনো তাড়া করে বেড়ায়। গত ৬ বছর ধরে ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছেন তারা।

আহত শ্রমিক রোজিনা আক্তার বলেন, তাজরীনের আগুনে আমরা স্বামী-স্ত্রী উভয়ই আহত হই। বর্তমানে মানসিক ভারসাম্যহীন স্বামীকে নিয়েও অন্যের বাড়িতে কাজ করছি। অর্থাভাবে নিজের চিকিৎসাতো দূরের কথা ঠিকমতো সন্তানদের মুখে দুবেলা খাবারও তুলে দিতে পারি না। 

আহত শ্রমিক শিল্পী বেগম বলেন, তাজরীনের দুর্ঘটনায় আহত হয়ে খুব কষ্টে আছি। কোন সাহায্য সহযোগিতা দুরে থাক নিজের পরিশ্রমের বেতনটুকু পাইনি। আমার স্বামী নাই, বাবা নাই, একটা ভাইও নাই। প্যারালাইজ মাকেও আমার দেখতে হয়। আমার একটি বড় বোন পাগল এবং একটি বাচ্চা আছে। আপনারা যদি আমাকে সাহায্য না করে তাহলে মরে যাওয়া ছাড়া কোন পথ নাই।

তিনি আরও বলেন, জীবিকার তাগিদে প্রথমে পায়ে হেঁটে কাপড় বিক্রি করলেও বর্তমানে বেশি অসুস্থ হওয়ায় তা পারি না। পরে শ্রমিক নেতা সোহাগ দশ হাজার টাকা দিয়ে আমাকে পিঠার দোকানটি করে দিয়েছে। দিনে ২ থেকে ৩ শ টাকা আয় হলেও পিঠা বিক্রির টাকায় ভাড়া বাসায় থেকে জীবন চলে না। মাথা, পা এবং কোমরে ব্যথার জন্য প্রতিদিন ওষুধের দরকার হলেও টাকার অভাবে পারছি না।

তিনি বলেন, আমি চাই আমার মতো যারা আহত আছেন তাদের তাজরীনের ভবনে পুনর্বাসন করা হোক। তাজরীনের শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের টাকা কাদের কাছে গেল, কারা পেল, আমরা কেন পেলাম না সেই বিষয়টি সরকারকে ক্ষতিয়ে দেখার পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানোর ঘটনায় খুনি মালিক দেলোয়ারের ফাঁসি চাই।

অন্যদিকে নিজেদের সব কষ্টকে মেনে নিয়ে জীবিকার তাগিদে তাজরীনে আহত দশ শ্রমিক মিলে একটি টেইলার্সের ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু পুঁজির অভাবে সেটাও বেশি দিন চালাতে পারেনি তারা। টেইলার্সের ব্যবসা শুরু করা আহত শ্রমিক সবিতা রানী বলেন, আমরা অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমাদের দিকে কেউ নজর দেয়নি। পর্যাপ্ত পুঁজি আর অসুস্থতাজনিত কারণে শুরুর কয়েক মাস পরেই টেইলার্সটি বন্ধ করে দিতে হয়ে।

আহত শ্রমিক আলেয়া আক্তার বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আহত হওয়ার পর কিছুদিন আমাকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল কিন্তু সেটাও পরে বন্ধ করে দেয়। তাই পুনরায় নিজের চিকিৎসা চালুর পাশাপাশি সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

অপর শ্রমিক জিয়াউর রহমান বলেন, আগুন লাগার পর কোন সিঁড়ি দিয়ে নামতে না পেরে এক ফ্লোরে প্রায় পাঁচ শ শ্রমিক আটকা পড়ি। পরে স্যাম্পল রুমের জানালা ভেঙে পাশের একটি বিল্ডিংয়ের ওপর লাফিয়ে পড়ি। এ ঘটনায় আমরা অনেকেই আহত হই, আবার মারা যায় অনেকে। পরের দিন ওই স্যাম্পল রুম থেকেই ৭০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। আগুনের ঘটনায় আমরা কোন ক্ষতিপূরণ পাইনি।

গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম আশুলিয়া থানা কমিটির সভাপতি রাকিব হোসেন সোহাগ বলেন, অবিলম্বে সরকারিভাবে আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা, পুনর্বাসনসহ সকলের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং তাজরীনের মালিক দেলোয়ারসহ জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর করা হোক।

উল্লেখ্য, তাজরীন ফ্যাশনে ভয়াবহ আগুনে হতাহতের ঘটনায় আশুলিয়া থানার এসআই খায়রুল ইসলাম অজ্ঞাত পরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় নাশকতার পাশাপাশি অবহেলা জনিত মৃত্যুর ধারা যুক্ত করে ২০১২ সালের ২২ ডিসেম্বর আদালতে চার্জশিট দেন তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক একেএম মহসিনুজ্জামান খান। সেখানে তাজরীন ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন ও চেয়ারম্যান মাহমুদা আক্তার মিতাসহ প্রতিষ্ঠানটির ১৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।