নেতানিয়াহুর বিষাক্ত উত্তরাধিকার

এটা অনেকদিন ধরেই স্পষ্ট যে, মধ্যপ্রাচ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ক্ষুদে প্রতিমূর্তি’ বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী থাকার জন্য প্রায় যে কোনো কিছুই করতে রাজি। আগামী সরকার গঠনের দ¡ন্দ্বে গত সপ্তাহে তিনি যেভাবে চরম বর্ণবাদী আর বিভেদমূলক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন তা কুৎসিত হলেও বিস্মিত করার মতো ছিল না। নেতানিয়াহুর বিশেষ মার্কামারা জঘন্য কট্টর ডানপন্থি রাজনীতি ইসরায়েলি গণতন্ত্রের মুখে এক চেনা ফোঁড়ার মতোই ঠেলে বেরিয়েছে। নেতানিয়াহু এত দীর্ঘ সময় এসব করে কীভাবে পার পেয়ে গেলেন সেটা তুলনামূলকভাবে বড় রহস্য। ক্ষমতার ওপর নিজের রাশকে শক্ত করতে ‘বিবি’ ক্রমেই বেশি করে উগ্র জাতীয়তাবাদী ও ধর্মভিত্তিক ডানপন্থিদের পছন্দসই নীতি আর সংস্কার আঁকড়ে ধরেছেন। ট্রাম্পের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত চুক্তি প্যালেস্টাইনের জন্য শান্তর সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করেছে। তার আগ্রাসী নির্দেশনায় চলা ইসরায়েলকে দেখতে এখন আর বীর ডেভিড নয়, বরং গোলিয়াথ ধরনের আঞ্চলিক ষণ্ডার মতোই লাগে বেশি।

ঘুষ, প্রতারণা আর বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে নেতানিয়াহুর অভিযুক্ত হওয়ার নজিরবিহীন ঘটনা সরে দাঁড়ানোর জন্য তার ওপর চাপ বাড়িয়েছে। চিরপরিচিত হামবড়াইয়ের সঙ্গে তিনি এর নিন্দা করেছেন ‘অভু¨ত্থানচেষ্টা’ বলে। এ বছরের দু’ দুটি নির্বাচনে সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট জিততে ব্যর্থতার পাশে রাখলে নতুন এই অপমান যে কোনো স্বাভাবিক রাজনীতিককে সরে দাঁড়াতে উৎসাহিত করত। কিন্তু নেতানিয়াহু তো স্বাভাবিক নন। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসাফ শ্যারন সম্প্রতি লেখেন, ‘বিভেদমূলক বাগাড়ম্বর, বিলাসী জীবনযাত্রা ও দুর্নীতির কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে যাওয়া’ সত্ত্বেও বলতে হয়, তিনি শক্তভাবে একটি আদর্শের পªতিনিধিত্ব করেন যা তার বিরোধীদের ব্যাপারে সবসময় বলা যায় না। শ্যারন মনে করেন, নেতানিয়াহুর ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী হতে পারার প্রধান কারণ হচ্ছে ১৯৯৫ সালে লেবার দলের নেতা আইজ্যাক রবিনের হত্যাকাণ্ডের পর থেকে জনসমর্থন টানতে সক্ষম একজন মধ্যবাম নেতার অভাব। আসাফ শ্যারন লিখেছেন, ‘ইসরায়েলের উদারপন্থিরা ডানপন্থিদের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনার শিকার হয়ে গুটিয়ে গেছে। তারা দীর্ঘ কয়েক দশকের ব্যর্থতায় ভগ্নমনোরথ। এছাড়া নিমœমানের নেতৃত্ব তাদের দুর্বল করে দিয়েছে। নিজেদের মূল্যবোধকে তুলে ধরা ও নেতানিয়াহুর জাতীয়তাবাদকে চ্যালেঞ্জ করার সাহসের অভাবে বামপন্থিদের অনেকে অর্থহীন মধ্যপন্থা বেছে নিয়েছেন। তারা ধরে নিয়েছেন, নেতানিয়াহুকে পরাস্ত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে তারই ধরনের রাজনীতি করা। তবে তা হবে নেতানিয়াহুর রাজনীতির তুলনায় আরেকটু সভ্য আর দুর্নীতিমুক্ত।’

নেতানিয়াহু তার পªধান প্রতিদ্বন্দ্বী বেনি গান্টজের নেতা হওয়ার সম্ভাবনা গুঁড়িয়ে দিতে গত সপ্তাহে ভীতিপ্রদর্শনমূলক ‘ষণ্ডামির’ একটা নমুনা দেখালেন। গান্টজের মধ্যপন্থি ব্লy অ্যান্ড হোয়াইট পার্টি ইসরায়েলি আরব পার্টিগুলোর জোট ‘জয়েন্ট লিস্ট’-এর সঙ্গে হাত মেলাতে পারে–এমন সম্ভাবনায় ‘বিবিপন্থিদের তরফে বিদ্বেষপূর্ণ গালমন্দের ঝড় শুরু হয়ে যায়। ‘জয়েন্ট লিস্ট’ ইসরায়েলের জনগণের প্রায় ২০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করলেও নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা জোটটিকে আখ্যায়িত করেন ‘সন্ত্রাসবাদকে সমর্থনকারী পঞ্চম বাহিনী’ বলে। তাদের মতে, রাষ্ট্রক্ষমতায় জয়েন্ট লিস্টের অংশগ্রহণ ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করবে। তাদের সঙ্গে চুক্তি করা হবে দেশদ্রোহিতার সমতুল্য। বিশেস্নষক শেমি শালেভ মন্তব্য করেছেন, এ ধরনের ভাষা সোজাসাপ্টাভাবে বর্ণবাদী। তিনি বলেন, ইসরায়েলের শত্রুরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারে। বয়কট বা বিনিয়োগ প্রত্যাহার কর্মসূচি আর লাগবে না। কারণ ইসরায়েলের নেতা নিজের হাতেই সব ক্ষতি করছেন। শালেভ লিখেছেন, ‘নেতানিয়াহু থাকতে জায়নবাদের নিন্দামন্দ করার কোনো দরকার নেই। একে সমর্থন করারও কিছু নেই। কারণ দুর্গন্ধটা ছড়াচ্ছে একেবারে শীর্ষ থেকেই।’

বেনি গান্টজ শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনে কার্যকর জোট করতে পারছেন না জানিয়ে দেওয়ার পর তিনি নেতানিয়াহুকে বর্ণবাদ ও চুক্তিভাঙা জেদের জন্য ধোলাই করেন। নেতানিয়াহু গোঁ ধরেছিলেন, লিকুদ ও ব্লy অ্যান্ড হোয়াইট পার্টির আপসের ঐক্যের সরকারে তার কট্টর ডান, বসতি স্থাপনের সমর্থক ও অতি গোঁড়া মিত্রদের সবাইকে যুক্ত করতে হবে। গান্টজ বলেছেন, নেতানিয়াহু ইসরায়েলি আরবদের দানব হিসেবে তুলে ধরে গৃহযুদ্ধের উসকানি দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমি জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে একটি ক্ষুদ্র উগ্র গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি করার প্রচেষ্টায় সহায়তা করব না।...আর ইসরায়েলি জনগণের কোনো একটি অংশকে অবৈধ প্রতিপন্ন করার চেষ্টাকেও মেনে নেব না।’ বেনি গান্টজ নেতানিয়াহুর একটি সুস্পষ্ট আদর্শিক ও রাজনৈতিক বিকল্প তুলে ধরতে পারলে বারো মাসের মধ্যে
তৃতীয় নির্বাচনের আশঙ্কার ব্যাপারে তার আপত্তি হয়তো জনগণের আরেকটু সহানুভূতি পেত। কিন্তু এই সাবেক বাস্তববাদী জেনারেল চরমপন্থি বা বামপন্থি কোনোটাই নন। গাজা এবং ইসরায়েলি দখলদারিত্বের ব্যাপারে তার অবস্থান কঠোর। নেতানিয়াহুর মতো তিনি গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের করা এ ভ্রান্ত দাবিকে স্বাগত জানান যে, পশ্চিমতীরের ইসরায়েলি বসতিগুলো অবৈধ নয়।

একটি স্বাতন্ত্র্যসূচক ও প্রগতিশীল দূরকল্প তুলে ধরায় ইসরায়েলি বামপন্থিদের সার্বিক ব্যর্থতাকে নেতানিয়াহু নির্মমভাবে কাজে লাগিয়েছেন। ট্রাম্পকে ক্রমশই বেশি করে নাক গলানোর সুযোগও দিয়েছে তা। বামপন্থিদের একসময়ের প্রভাবশালী দল ফিলিস্তনিদের সঙ্গে শান্তচুক্তির সমর্থক লেবার পার্টির আসনসংখ্যা এখন কমে গুটিকতকে নেমে এসেছে। নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প মিলে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে পরপর কয়েকটি পশ্চাৎমুখী, খুবই প্রতীকী পদক্ষেপ নিয়েছেন। একটি ফল হচ্ছে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি। আরেকটি হচ্ছে সিরিয়ার গোলান হাইটস ইসরায়েলের দখল করে নেওয়ার বিষয়টিকে মার্কিন স্বীকৃতি।

পশ্চিমতীরে ইসরায়েলি বসতি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গত সপ্তাহের বিবৃতি শুধু ট্রাম্পের অপ্রকাশিত চুক্তিতে থাকা ‘জমির জন্য অর্থ’ পªস্তাবেরই প্রকাশ্য রূপ। দারুণ দক্ষতার সঙ্গে যার ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’–এই ভুল নামটি দেওয়া হয়েছে। নেতানিয়াহুর মতো ট্রাম্পেরও জাতিসংঘ ও ইইউ-এর সমর্থন করা দুইরাষ্ট্র সমাধানের ব্যাপারে আগ্রহ শূন্যের কোঠায়। তিনি বরং এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে চান যা আর পরিবর্তন করা যাবে না। একই সঙ্গে তিনি বিপজ্জনকভাবে ফিলিস্তনিদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করছেন। ট্রাম্প-নেতানিয়াহু অক্ষের নেতিবাচক প্রভাব ও তাদের কট্টরপন্থি এজেন্ডা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলজুড়ে অব্যাহতভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ইরানকে একঘরে করার যৌথ প্রচেষ্টার মধ্যে। ভোটারদের ভয় দেখাতে ও নিরাপত্তাগত বিষয়ে নিজের নির্ভরযোগ্যতা তুলে ধরতে নেতানিয়াহু ইরানের ঝুঁকিকে প্রায়ই যেভাবে অতিরঞ্জিত করেছেন ট্রাম্প তা-ই নকল করেছেন।

সিরিয়া, লেবানন ও ইরাকে ইরানি বা ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়া বাহিনীগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র-অনুমোদিত ইসরায়েলি সামরিক হামলা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে এমন কিছু যুদ্ধের উপ-ঠিকাদারে পরিণত করেছেন যা ট্রাম্প নিজে লড়তে চান না। অন্যদিকে তিনি ঘনিষ্ঠ হয়েছেন মার্কিন মিত্র সৌদি আরব, মিসর, ও ইউএইর স্বৈরতান্ত্রিক শাসকদের সঙ্গে। বিবির বাঁচার লড়াইয়ে কোনো কিছু করাতেই নিষেধ নেই। সরকারের সংকটের এখনো সমাধান হয়নি। নেতানিয়াহুর বিরোধীরা রক্তের গন্ধ পাচ্ছে। তার দল লিকুদ পার্টি বিদ্রোহের দ্বারপ্রান্তে। তবে একদিক থেকে দেখলে নেতানিয়াহু ইতিমধ্যেই ইতিহাসে পরিণত হয়েছেন। ইসরায়েলিদের জন্য (বিশেষ করে ইসরায়েলি বামদের জন্য) বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আর আসল সমস্যা নন। মনের অন্তস্তলে থাকা গভীর বিভেদ অর্থাৎ কিনা তার বিষাক্ত উত্তরাধিকার কাটিয়ে ওঠাই হবে বড় সমস্যা।

লেখক: আন্তর্জাতিক বিষয়ক ভাষ্যকার এবং যুক্তরাজ্যের

দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার বৈদেশিক বিষয়ক সম্পাদক

দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর: আবু ইউসুফ