তিন বছর আগে হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় করা মামলার রায় আজ। ২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে ভয়াবহ ওই হামলার ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে যায় গোটা দেশ।
ওদিন রাত ৯টা থেকে পরদিন সকালে কমান্ডো অভিযানের আগ পর্যন্ত সেখানে কী ঘটেছিল সেটা উঠে এসেছে বিবিসি বাংলার সঙ্গে ওই রেস্তোরাঁয় খেতে আসা শারমিনা পারভীন আর বেকারির বাবুর্চি দেলোয়ার হোসেনের কথায়।
রাত ৯টার দিকে গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিজান বেকারির চিত্রটা অনেকটা এ রকম- লন আর বসার জায়গাগুলোতে বসে আছেন জাপানি অতিথিদের একটি দল, ইতালিয়ান অতিথিদের বড় একটি দল, ছোট ছোট দলে বিভক্ত আরও কিছু বাংলাদেশি এবং আরও দুটি দেশের নাগরিক। কারও কারও টেবিলে খাবার দেওয়া হয়েছে, কারও জন্য খাবার তৈরি হচ্ছে।
খেতে আসা অতিথিদের একজন শারমিনা পারভীন করিম, তখন তারা সপরিবারে বসে কেবলমাত্র খাবারের অর্ডার দিতে যাচ্ছেন। তার সঙ্গে দুই সন্তান ও স্বামী বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিম।
তিনি বলেন, ‘খাবার অর্ডার করতে যাব। মেন্যু দিয়ে গেছে। সেই মুহূর্তেই গোলাগুলির শব্দ।’
শারমিনা বলেন, ‘কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখি তারা আমাদের সামনে। শব্দ শুনে যেটা বুঝলাম, ওরা বাইরে লনে অ্যাটাক করেই তারপর ভেতরে এসেছিল। আমাদেরকে হেড ডাউন করতে বলল। আমরা মুসলিম কিনা জিজ্ঞেস করল। ওই টেবিলে শুধু আমাদের ফ্যামিলিই ছিলাম।’
তিনি বলেন, ‘তারপর আমাদের সামনে ও পেছনের টেবিলে যারা ছিল তাদের শুট করল এবং চাপাতি দিয়ে কোপানো শুরু করল। আগে গুলি করে তারপর কাছে গিয়ে কুপিয়েছে।’
তার বক্তব্য যদি সঠিক হয়, তাহলে শুক্রবার রাত ৯টার কিছু আগে বা পরেই লাশে পরিণত হয়েছিলেন হতভাগ্য ৭ জন জাপানি, ৯ জন ইতালিয়ান, একজন ভারতীয়, দুজন বাংলাদেশি এবং একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক।
বিবিসি বাংলার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, তারপর প্রায় সারারাত ধরেই একটি টেবিলে করিম পরিবারকে বসিয়ে রাখা হয়। তাদের টেবিলে এনে বসানো হয় আরও দুজন তরুণী এবং দুই ব্যক্তিকে। তবে সকাল নাগাদ কমান্ডো অভিযানের আগেই তাদের বেরিয়ে যেতে দেয় জঙ্গিরা।
এদিকে রাতে যখন গুলি করতে করতে সন্ত্রাসীরা বেকারিতে ঢুকছিল, তখন দোতলার ফ্রিজ থেকে মাছ আনতে গিয়েছিলেন বাবুর্চি দেলোয়ার হোসেন। গুলির শব্দ পেয়ে তিনি আরও কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে দৌড়ে একটি বাথরুমে ঢোকেন। একটি বাথরুমে মোট নয়জন।
হামলাকারীরা সেটা টের পেয়ে বাথরুমটির দরজা বাইরে থেকে লাগিয়ে দেয়। ভোর পর্যন্ত ছোট্ট বাথরুমটিতে ঠাসাঠাসি করে কোনোমতে প্রাণ রক্ষা করেন বেকারির নয় কর্মী।
একপর্যায়ে তারা নিজেদের জামাকাপড় খুলে ফেলেন। তারপর অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হলে ভোরে দরজা ভেঙে বেরিয়ে আসেন, তখনো সন্ত্রাসীদের দখলে বেকারি। বেরিয়ে তারা সামনে পড়েন হামলাকারীদের।
দেলোয়ার হোসেন বলেছেন, ‘নয়জনের মধ্যে তিনজনই ভয়ে দোতলা দিয়ে লাফিয়ে পাশের ভবনে চলে যায়।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের তিনজনকে ভেতরে নিয়ে যায়। ভেতরে দেখলাম অনেক রক্ত আর লাশ। সবাই ফ্লোরে পড়ে আছে।’
বেকারির এই বাবুর্চি বলেন, ‘তাদের হাতে বড় একটা অস্ত্র ছিল। ছোট পিস্তল ছিল একটা। আর একটা করে চাপাতি। তাতে রক্তের দাগ।’
এর কিছুক্ষণ পরেই প্যারা কমান্ডোদের অভিযান শুরু হয়। প্রাণ রক্ষার্থে আবারও লুকিয়ে পড়েন দেলোয়াররা। হামলাকারীদের ভাগ্যে কি ঘটেছে সেটা দেখার সুযোগ আর হয়নি তাদের।
দেলোয়ার হোসেন ও শারমিনা পারভীন দুজনেই বলছেন হামলাকারীরা তাদেরকে ধর্ম সম্পর্কে নানা উপদেশ দিয়েছিল।
ভয়াবহ ওই ঘটনায় দেশি-বিদেশি ২০ জন নাগরিককে নির্মমভাবে হত্যা করে সশস্ত্র জঙ্গিরা। জঙ্গিদের ছোড়া গ্রেনেডে দুই ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা মারা যান। একপর্যায়ে যৌথ বাহিনীর কমান্ডো অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়। এ ছাড়া ওই ঘটনার সময় রেস্তোরাঁর একজন শেফ মারা যান।
এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর তদন্ত শেষে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট গত বছরের ২৩ জুলাই হামলায় জড়িত ২১ জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়।
এর মধ্যে ১৩ জঙ্গি বিভিন্ন সময়ে অভিযানে নিহত হওয়ায় মামলার বিচার থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়। বাকি আটজনের বিরুদ্ধে বিচারকাজ শুরু হয়।