জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য জনগণের শাসন কোথায়

জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন। শুনতে ভালো। কিন্তু আমাদের দেশে এটা ক্রমেই তামাশায় পরিণত হচ্ছে। অনেকে বলছেন : এ সবই হচ্ছে ঘোড়ার আণ্ডা, নামে আছে কাজে নেই! আমাদের দেশে ‘জনগণের শাসন’-এর নামে বাহুবল, বাক্যবল আর বিত্তবলের নির্লজ্জ, নৃশংস তাণ্ডব চলে। তাতে ‘শান্তির ললিতবাণী’ এতটাই ব্যর্থ পরিহাস শোনায় যে তার সামনে আত্মনিন্দুক বাঙালির ‘ডার্ক হিউমার’-ও স্তব্ধ হয়ে থাকে!

আমাদের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতন্ত্রের চর্চা নেই। রাজনৈতিক দলেও নেই। দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ে সম্মেলন চলছে। এসব সম্মেলনে বেশিরভাগ ড়্গেত্রেই হচ্ছে উচ্চতর পদে থাকা নেতাদের পকেট কমিটি। তারা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের নাম ঘোষণা করে দিয়ে আসছেন। কমিটির বাকি সদস্যদের নির্বাচন নিয়ে চলছে কামড়াকামড়ি, তদবির, স্বজনপ্রীতি। যে যার মতো পদ বাগিয়ে নিচ্ছেন। কাউন্সিলে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিদের এক বেলা খাবার আর নেতাদের বক্তৃতা শুনে হাততালি দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো ভূমিকা নেই। মত প্রদানের সুযোগ নেই। অথচ যেকোনো জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে মতদান করা মৌলিক অধিকার এবং নৈতিক কর্তব্য। কিন্তু ঘরে-বাইরে, সভা-সমিতিতে যুক্তিতর্ক-বিচার-আলোচনার দ্বারা আদর্শবৈচিত্র্য ও উপায়ের বিবিধতাকে বজায় রেখে মতামত তৈরি হয়। উৎকোচে প্রলুব্ধ, বা ধমকানিতে সন্ত্রস্ত ভেড়ার পালের মতো নখে কালি মাখিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার যজ্ঞে নেতার ব্যক্তিপূজার আহুতি দিয়ে এলে আর যা-ই হোক, ‘মতদান’ করা হয় না।

আমাদের দলে, প্রতিষ্ঠানে এবং রাষ্ট্রে গণতন্ত্র চর্চা স্রেফ ভাঁওতায় পরিণত হয়েছে। নেতানেত্রীদের বক্তৃতায় ও বাক্যপ্রয়োগে ন্যূনতম ন্যায্যতা, ভদ্রতা, সততা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের দেশের মানুষ এখনো ‘জ্বালাময়ী’ বক্তৃতায় সম্মোহিত হয়। আর তাইতো ‘কথার জাদু’ দেখিয়ে নেতানেত্রীরা এক আজব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রচলন করার চেষ্টা করেছেন। একইসঙ্গে চলছে পারস্পরিক বিদ্বেষ, বাক্যবাণ নিক্ষেপ ও কট‚ সমালোচনা। আমাদের দেশে এক দলের প্রতি অন্য দলের সমালোচনার ভাষা শুনলে যেকোনো সভ্য মানুষের লজ্জা পাওয়ার কথা। যেন এখানে মন্দ ভাষা প্রয়োগের প্রতিযোগিতা চলে সারাক্ষণ!

এ প্রসঙ্গে মহাভারতের কথা উল্লেখ করা যায়। এর শান্তিপর্বে বলা হচ্ছে, ‘মুখ থেকে উৎপন্ন হয়ে বাক্যশলাকা পতিত হয় অপরের হৃদয়ে, যার আঘাতে সে দিবারাত্রি কষ্ট পায়’। মন্দবাক্যের ‘বীভৎস ক্ষত’ নিরাময় হওয়া যে কুঠার বা তীরের আঘাতের চাইতেও কঠিন, তা-ও বলছে অনুশাসন পর্ব। উপনিষদেও দেখা যায়, মর্মভেদী শব্দকে তীক্ষ্ণ বাণের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। জনক রাজার সভায় বিদ্বজ্জন সমাগমে (যাজ্ঞবল্ক্য এক বার দাবড়ে দেওয়া সত্ত্বেও) গার্গী প্রশ্ন করতে উঠে বলছেন, ‘কাশী বা বিদেহরাজের পুত্র যেমন নামিয়ে-রাখা ধনুতে পুনরায় জ্যা রোপণ করে শত্রুর দিকে দুটি তীক্ষ্ণ বাণ নিক্ষেপ করে, তেমনই যাজ্ঞবল্ক্য, আমি আবার উঠে দাঁড়িয়েছি তোমাকে দুটি প্রশ্ন করতে।’ (বৃহদারণ্যক)

মহাভারতের শান্তিপর্বে বলা হচ্ছে, ‘বাক্‌-প্রবদ্ধো হি সংসারঃ।’ এই সংসার বাক্যের দ্বারা সন্নিবদ্ধ, বাক্যই ধরে রেখেছে জগৎকে। মঞ্চের বক্তৃতা থেকে ‘কেমন আছেন?’ ইত্যাদি কুশলজিজ্ঞাসা, বন্ধুদের আড্ডা থেকে জনসমক্ষে বিতর্ক, প্রতিটি ড়্গেত্রে আমাদের বাক্য যেমন ব্যাকরণের নিয়মের অধীন, তেমনই নৈতিক বিধিরও অধীন। কী সেই বিধি, যা নির্ধারণ করে বাক্যের ভালো-মন্দ, তা বোঝা দরকার। বিশেষত আজ, যখন সংবাদমাধ্যম, বিজ্ঞাপন, দলীয় প্রচার, সমাজমাধ্যম কোণঠাসা করে ফেলেছে মুখোমুখি বাক্যালাপকে।

ভর্তৃহরি তার ‘বাক্যপদীয়’ বইটিতে বলছেন, মানুষের যা কিছু ‘ইতি-কর্তব্যতা’ (‘এই হলো কর্তব্য’) তার শিকড় হলো শব্দে। সাধারণত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, ‘শব্দ’ মানে বেদবাক্য। কিন্তু অন্য ভাবে চিন্তা করলে এই সূত্রও মেলে যে, কর্তব্য হলো তা-ই যা করতে বলে নিজের হৃদয় (‘অনুক্রোশ’, বা হৃদয়ের আর্তি), অথবা যা করতে কেউই বলে না– কথকহীন এক কথা। অন্যের সঙ্গে কথা বলা মানে, অন্যের আহ্বানে, বা প্রশ্নে, দাবিতে, সমালোচনায় সাড়া দিয়ে শব্দের বিনিময়। এই যে অপরের প্রতি ‘সাড়া দেওয়া’, তার প্রয়োজন মেটাতে উদ্যোগী হওয়া, এটাই রয়েছে মানুষের নৈতিক জীবনের কেন্দ্রে। এই অর্থে ‘কথা বলা’ মানে হচ্ছে ‘ত্যাগ করা’। যজ্ঞে আহুতি দেওয়ার মতো, নিজের আত্মকেন্দ্রিক, বাক্‌-বিমুখ সত্তাকে অন্যের জন্য অর্পণ করা। আক্ষরিক অর্থে বেদের যজ্ঞ হয়তো নির্দিষ্ট বিধিনিয়মের পালন, কিন্তু গীতাকে অনুসরণ করলে বোঝা যায় যে যজ্ঞের মূল ধারণা হলো, অপরের জন্য ত্যাগ। যজ্ঞতে মহিষ বা অশ্ব বলি দেওয়া হতো, অতএব তার একটা হিংসাত্মক দিক ছিল অবশ্যই। কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হতো আত্মদানের অভ্যাসে (‘আমার নয়’ বা ‘ন মম’, যা থেকে ‘নমঃ’)। বাক্যেও হিংসা পরিহার করে, তাকে ‘অপরের কল্যাণের জন্য ত্যাগ’ বলে দেখা যায়।

বাক্য-ব্যবহারে অহংবোধের বিসর্জন, কলুষমুক্ত ত্যাগের নৈতিকতা আসতে পারে দু’টি উপায়ে।

এক, যখন বক্তা তার ধারণা, অনুভব, জ্ঞানের ওপর তার একক স্বত্ব ত্যাগ করে শব্দ-বাক্যের মাধ্যমে অপরকে জানান সেই কথাটি যা তিনি নিজের অন্তরে কল্যাণকারী সত্য বলে উপলব্ধি করেছেন। এমন বক্তাকে ন্যায়ভাষ্যে ‘আপ্ত’ বলা হয়েছে– যিনি সত্যনিষ্ঠ, আস্থাযোগ্য ও অপরের প্রতি সহমর্মিতা থেকে কথা বলেন। বাক্য যখন অন্যকে আঘাত করতে, সন্দেহ জাগাতে, ভুল বোঝাতে, বিভেদ তৈরি করতে প্রয়োগ হয়, তখন তা অপরকে দান করার থেকে অপরের থেকে কেড়ে নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। শব্দের কল্যাণকামী লক্ষ্য বিকৃত হচ্ছে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষে ভীমকে জড়িয়ে ধরার ছলে পিষে মারতে চেয়েছিলেন ধৃতরাষ্ট্র। সেই বাহুপাশকে যেমন ‘আলিঙ্গন’ বলা চলে না, তেমনই স্বার্থসন্ধানী, অকল্যাণকামী কথাকেও ‘শব্দ’ বলা চলে না।

দ্বিতীয়ত, যখন কেউ বিতর্কে নিরত হচ্ছে, তখন নিজের মতটি অপরের সমক্ষে ব্যক্ত করার অর্থই হলো, তা ভ্রান্ত প্রমাণিত হলে নিজের অবস্থান, নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করায় সম্মতি। এমনকি, কেবল শ্রোতা হিসেবে অন্যের কথা নিবিষ্টভাবে শুনতে চাইলেও নিজের স্বার্থ, মতকে সরিয়ে রাখতে হবে। হয়তো এই কারণেই প্রাচীন কালে যজ্ঞের অন্যতম অঙ্গ ছিল বিতর্ক। অশ্বমেধের মতো দীর্ঘ, জটিল যজ্ঞের শেষে দুই পুরোহিত দাঁড়াতেন দুই ভূমিকায়। এক জন বলতেন, যজ্ঞে কী কী ত্রুটি হয়েছে, অপর জন বলতেন কত মহৎ, সফল হয়েছে যজ্ঞের কাজ। 

মহাভারতে যুধিষ্ঠিরের অশ্বমেধ যজ্ঞের পরে আমরা দেখা পাই সেই নকুল বা নেউলের, যার শরীরের অর্ধেকটা হিরণ্ময়। যুধিষ্ঠিরকে সে বলে, ব্যর্থ হয়েছে তার যজ্ঞের আয়োজন। অতি দরিদ্র এক পরিবারের কুটিরের গর্তে ওই নেউলের বাস ছিল। নিজেরা উপবাসের মুখে দাঁড়িয়েও সেই দরিদ্র পরিবারের সদস্যেরা নিজেদের খাবার দিয়েছিলেন ক্ষুধার্ত অতিথিকে। অতিথির উচ্ছিষ্টে গড়াগড়ি দিয়ে নেউলের অর্ধেক দেহ সুবর্ণময় হয়েছিল। বাকি দেহটা সোনা করতে এসেছিল যুধিষ্ঠিরের যজ্ঞে, কিন্তু বিফল হলো, কারণ কিছুই বাকি ছিল না তার জন্য। সামান্য এক প্রাণীর নির্ভীক, কল্যাণকামী বাক্য সম্রাটকে মনে করাল, কোনো দানই যথেষ্ট নয়। কারণ, অপরের প্রতি আমাদের ঋণ ও দায়বদ্ধতা অসীম।

মহাভারতের সেই কৃষ্ণচক্ষু নকুলের মতো আজ আমাদের দেশে কিছু সাংবাদিক, শিক্ষক, লেখক নিজেদের জীবন বিপন্ন করেও ক্ষমতাবান শাসকের কাজের সমালোচনা করে চলেছেন। সেটা শুধু শাসককে ভণ্ড প্রতিপন্ন করার উদ্দেশে নয়, তাকে আত্মসমালোচনায় মনোযোগী করার উদ্দেশে। কর্তব্যের প্রতি সতর্ক করার জন্য। শান্তিপর্বে ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে শুনিয়েছিলেন জনক-সুলভার কথোপকথন– যুবতী সন্ন্যাসিনীর প্রতি রাজর্ষি জনকের অভব্য উক্তি এবং তার উত্তরে স্থিতধী বিদুষীর ব্যাখ্যা, কেমন হওয়া উচিত জনপরিসরে উচ্চারিত বাক্য। কোন কোন দোষ থেকে মুক্ত হতে হবে, থাকা দরকার কোন গুণাবলি। আজ রাষ্ট্রনায়কদের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের বাক্যের সমালোচনা করবে কে?

বেদ-পুরাণ বা মহাভারতের যুগে হিংসা কিছু কম ছিল না। খরশান, মর্মভেদী বাক্য যে প্রতিহিংসাকে উসকানি দিতে পারে, মহাভারতে তার আশঙ্কা ও সতর্কতা খুবই স্পষ্ট। তবু বৈদিক, বৌদ্ধ এবং জৈন মতাবলম্বী শ্রেষ্ঠ বিদ্বানরা বরাবর চেষ্টা করেছেন, সমবেত হিংসার উন্মত্ততাকে বিধিবদ্ধ বিতর্কের মাধ্যমে প্রবাহিত করতে। সেই বাদ-তর্ক-বিচার একটি দর্শনীয় প্রতিযোগিতা হবে, এবং উভয়পক্ষের গ্রহণযোগ্য কোনো অবস্থানে পৌঁছানোর উপায় হবে। এই প্রচেষ্টার মূলে রয়েছে এই উপলব্ধি যে আমাদের এ ভূখণ্ডের কোনো একটি দর্শন, একটি মাত্র নৈতিক আদর্শ নেই। একতা-হীনতার মধ্যে যে টেনশন, তাকে নিয়ে নিজে বেঁচে থাকা, অন্যকে বাঁচিয়ে রাখাই এখানকার ঐতিহ্য।

কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে আজ কোথায় সেই আদর্শ? কোথায় সে ‘শান্তির ললিত বাণী’? কোথায় সেই বিতর্কের পরিসর? আর কোথায়ই বা ‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন?’

লেখক

লেখক ও কলামনিস্ট

chiros234@gmail.com