ভূমি জরিপ ও ভূমির মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধে ভোগান্তির কথা যুগ যুগ ধরেই সুবিদিত। দেশে ভূমি ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়ম, প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি খাসজমি গ্রাস, মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্লট বরাদ্দ, জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যের জমি দখল– এমন সব ঘটনা অহরহই ঘটছে। ভূমি বা জমিজমা নিয়ে মানুষকে যে কতরকম ভোগান্তি পোহাতে হয় তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এক ব্যক্তির জমি অন্যের নামে নামজারি করা, উত্তরাধিকার সম্পত্তির নামজারিতে জটিলতা, বেঁধে দেওয়া সময়ে নামজারি সম্পন্ন না হওয়া, ভূমি জরিপের ড়্গেত্রে নানারকম নয়-ছয় করা ইত্যাদি সাধারণ ঘটনা। একই সঙ্গে ভূমি অফিসের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালের যোগসাজশে নানা দুর্নীতি, ঘুষ ও আর্থিক কেলেঙ্কারি তো আছেই। সবমিলিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য ভূমির মালিকানা অর্জনের চেয়ে ভূমিরক্ষা করাটাই যেন কঠিন।
ভূমি জরিপ ও ভূমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ সম্পর্কে এসব কথা যে মোটেই অত্যুক্তি নয় তা বোঝা যাবে দেশে এ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা বিবেচনা করলেই। সাধারণ দেওয়ানি আদালতে ভূমি-বিরোধ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি। আর সারা দেশের ৪১টি ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে অন্তত ৩ লাখ ৫ হাজার মামলা এখনো বিচারাধীন। ভূমিবিরোধ সূত্রপাতের সাধারণ উৎস হলো ভূমি জরিপের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও জালিয়াতি। ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তিতে ব্রিটিশ আমলের ‘সিএস’ (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে) এবং পাকিস্তান আমলের ‘আরএস’ (রিভিশনাল সার্ভে) জরিপই দীর্ঘদিন পর্যন্ত ছিল প্রামাণ্য দলিল। স্বাধীনতার প্রায় দেড় দশক পর প্রথমবারের মতো ১৯৮৪ সালে দেশে ‘বিএসআর’ (বাংলাদেশ সার্ভে-রিভাইজড) জরিপ শুরু হয়। তবে সারা দেশে এখনো শেষ হয়নি এই জরিপ। বরং যেসব এলাকায় শেষ হয়েছে সেসব এলাকায় নানা ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দিয়েছে মাঠ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা ও উদাসীনতায়। এই জরিপের পর্চা আর নকশায় ব্যাপক ভুল আছে বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।
উপরোক্ত পরিস্থিতিতে সরকার এখন ভূমি জরিপ সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে গতি আনতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে বিদ্যমান ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনাল বিলুপ্ত করে বেশ কিছু নতুন বিষয় যুক্ত করে ‘স্টেট একুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট-১৯৫০’ সংশোধন করতে যাচ্ছে সরকার। সংশোধিত নতুন আইনের নাম হবে ‘স্টেট একুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট (সংশোধন) ২০১৯’। উল্লেখ্য, ২০০৪ সালে সারা দেশে ১২টি ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে আইন মন্ত্রণালয়। ২০১২ সালে তা বাড়িয়ে ৪১টি করা হয়। ৪১টি জেলায় এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করার পর বাকি ২৩টি জেলাকে ভাগ করে সেগুলো গঠিত ট্রাইব্যুনালগুলোর সঙ্গে একীভূত করা হয়। কিন্তু মূলত বিচারকের স্বল্পতা এবং একটিও আপিল ট্রাইব্যুনাল না থাকায় তিন লাখেরও বেশি মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি না হলে আপিল করতে হয় হাইকোর্ট বিভাগে। কিন্তু ২০০৪ সালের আইনেই সারা দেশে আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান থাকলেও বিস্ময়কর বাস্তবতা হচ্ছে রাষ্ট্র আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করেনি। ফলে ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলো বিগত ১৫ বছর ধরে শুধু পদ্ধতিগত কারণেই অমীমাংসিত থেকে গেছে।
সংশোধিত নতুন আইনে ভূমি জরিপ সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে বর্তমান ট্রাইব্যুনাল বিলুপ্ত করে সাধারণ দেওয়ানি আদালতে মামলাগুলো স্থানান্তর করা হবে। ট্রাইব্যুনালের ৪১ জন যুগ্ম জেলা জজের স্থলে ৩৬১ জন সহকারী জজ ও সিনিয়র সহকারী জজ বিচারকাজ পরিচালনার দায়িত্ব পাবেন। আগে ট্রাইব্যুনালে ‘আবেদন’ করতে হতো, এখন আদালতে নির্দিষ্ট ফি জমা দিয়ে ‘আরজি’ দাখিল করতে হবে। নতুন আইনে বিচারক আরজি পাওয়ার ৭ দিনের মধ্যে রাজস্ব কর্মকর্তাদের তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করবেন। ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদন দাখিল করবেন এবং ‘আরজি’ উত্থাপনকারী তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন। এছাড়া বিচারিক আদালতে কোনো রায় ডিক্রি বা আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলার জজদের কাছে আপিল করার বিধানসহ বেশকিছু নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে আইনটির খসড়ায়। খসড়াটি জাতীয় সংসদের আসন্ন শীতকালীন অধিবেশনেই পাস হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশে ভূমি জরিপ ও ভূমিবিরোধ সংক্রান্ত পাহাড়সম মামলাজটের পরিপ্রেক্ষিতে আইন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে, আইন সংশোধন এবং তা কার্যকরের ড়্গেত্রে আরও কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে সে বিষয়ে সরকার চাইলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে পারে। একইসঙ্গে এই প্রশ্নও ওঠা জরুরি যে, ১৯৮৪ সালে শুরু হওয়া ‘বিএসআর’ জরিপ কেন এখনো শেষ হয়নি? পাশাপাশি নাম-ধাম-বানান ভুলসহ নানা ছোটখাটো ‘করণিক ভুল’ সংশোধনের জন্যও কেন আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে, কেন ভূমি অফিস সেই দায়িত্ব নিতে পারবে না? ভূমি ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি ডিজিটাল করার ড়্গেত্রে সরকারের প্রয়াস কতটা সম্পন্ন হলো সে বিষয়েও মনোযোগ দেওয়া জরুরি। সর্বোপরি যেটা বলা প্রয়োজন, তা হলো ভূমি জরিপ ও বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়টি যেন কেবল কাঠামোগত পরিবর্তন হয়ে না দাঁড়ায়, সেজন্য নতুন আইনের সঙ্গে বিচারব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করাও জরুরি। সরকার ও বিচার বিভাগের আন্তরিকতায় এ প্রয়াস সাফল্য পাবে সেটাই কাম্য।