রেকর্ড স্বর্ণেও ঢাকছে না অন্যদের ব্যর্থতা

এসএ গেমসের ইতিহাসে সোনা জয়ের নতুন রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। দেশ হোক কিংবা বিদেশের মাটিতেÑ অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়ে এবার বাংলাদেশ জিতেছে ১৯টি সোনার পদক। দেশের মাটিতে ২০১০ সালে জেতা ১৮ সোনাকেও এবার পেছনে ফেলেছে অ্যাথলিটরা। এই স্বর্ণগুলো এসেছে ২৫টি ডিসিপ্লিনের ৬টি থেকে। তার মানে ১৯টি ডিসিপ্লিনের কোনোটিতেই সেরা সাফল্য পায়নি বাংলাদেশ। পদকপ্রসবা বেশ ক’টি ডিসিপ্লিনে এবার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরা। অতীতে যারা ধারেকাছেও থাকত না, তাদের কাছেই বাংলাদেশকে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে বেশ কিছু ডিসিপ্লিনে।

৭ দেশের এই ক্রীড়াযজ্ঞে বাংলাদেশ শেষ করেছে পঞ্চম স্থানে থেকে। তাদের নিচে কেবল মালদ্বীপ এবং ভুটান। বাংলাদেশ জিতেছে মোট ১৪২টি পদক। যার মধ্যে ১৯টি স্বর্ণ, ৩৩টি রৌপ্য এবং ৯০টি ব্রোঞ্জপদক। মোট পদক জয়ে তারা পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও সোনা জয়ে পিছিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশটির চেয়ে। পাকিস্তান জিতেছে ৩১টি সোনা। অথচ ২০১০ ঢাকা গেমসে ১৫৮টি সোনার লড়াইয়ে ১৮টি জিতে বাংলাদেশ হয়েছিল তৃতীয়। অতীতের চেয়ে এবার পদক সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। ৩১৭টি সোনা, সমান সংখ্যক রুপা এবং ৪৮১টি  ব্রোঞ্জ মিলিয়ে ১১১৫টি পদকের জন্য লড়াই করেছেন ৭ দেশের ২৭১৫ জন ক্রীড়াবিদ। অংশগ্রহণ সংখ্যায় বাংলাদেশ রয়েছে স্বাগতিক নেপাল এবং শ্রীলঙ্কা ও ভারতের পরেই। ২৬৬  জন ক্রীড়াবিদ নিয়ে এসে পাকিস্তান সাফল্য বিবেচনায় রয়েছে বাংলাদেশের ওপরে। এক আরচারি থেকে ১০টি সোনার পদক না এলে বড় লজ্জা নিয়েই দেশে ফিরতে হতো ৪৭০ জন ক্রীড়াবিদসহ প্রায় ৬০০ জনের বিশাল বহরকে।

এত এত ডিসিপ্লিনে খেলে বাংলাদেশের স্বর্ণপ্রসবা ডিসিপ্লিন হলো- আরচারি (১০ সোনা), কারাতে (৩ সোনা) ক্রিকেট (২ সোনা), ভারোত্তোলন (২ সোনা), তায়কোয়ান্দো (১ সোনা) এবং ফেন্সিং (১ সোনা) । পদক সংখ্যা তিন অঙ্কে যাওয়ায় এটাকে বাংলাদেশের সেরা ফলাফল বিবেচিত হলেও, একটু গভীরে চোখ রাখলেই মিলবে হতাশা। ‘মাদার অব গেমস’ খ্যাত অ্যাথলেটিক্সের ২৩টি ইভেন্টে অংশ নিয়ে তাদের প্রাপ্তি একটি করে রুপা ও ব্রোঞ্জ। হাই জাম্পে মাহফুজুর রহমান রুপা এবং লং জাম্পে আল আমীন ব্রোঞ্জ জিতেছেন। ট্র্যাক ইভেন্টগুলোতে পুরোপুরি হতাশ করেছেন দৌড়বিদরা। গতবার রিলেতে জেতা দু’টি ব্রোঞ্জও এবার হারিয়েছে বাংলাদেশ। দেশের জাতীয় খেলা কাবাডিতে মিলেছে সান্ত¡না পুরস্কার (ছেলে ও মেয়েদের ইভেন্টে চতুর্থ হয়ে ব্রোঞ্জপদক)। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নেপালের কাছেও নতিস্বীকার করতে দেখা গেছে এক সময় বিশে^র দ্বিতীয় শক্তিশালী দেশ বিবেচিত হওয়া বাংলাদেশ।

অতীতের ৮ আসরে ২২টি (সর্বোচ্চ) সোনার পদক জেতা শুটাররা এবার ফিরেছে সোনা ছাড়াই। ১৯৯১ সালে ৩টি সোনার পদক দিয়ে যাত্রা শুরু করা শুটিং শেষবারও দিয়েছে একটি স্বর্ণ। কিন্তু এবার চরমভাবে হতাশ করেছেন আব্দুল্লাহ হেল বাকী, শাকিল আহমেদ খানরা। ২০১৬ গৌহাটি-শিলং গেমসে ২টি সোনার পদক জেতা সাঁতারুরা এবার পারেননি সোনার হাসি হাসতে। গতবারের জেতা রুপার পদক এবার হারিয়েছে হ্যান্ডবলের মেয়েরা। আর ছেলেরা তো ফিরছে একেবারেই শূন্য হাতে। ব্যাডমিন্টনে এবার অর্জন মাত্র ১টি ব্রোঞ্জ।

ভলিবল, বিচ ভলিবল, বাস্কেটবল, বাস্কেটবল থ্রি অন থ্রি, টেনিস, সাইক্লিং এবং স্কোয়াশ  থেকে ফিরছে একেবারে খালি হাতে। ভলিবল ও বাস্কেটবলে ব্রোঞ্জের সুযোগ থাকলেও তারা বাজেভাবে হেরে সে সুযোগ নষ্ট করেছে। ছেলেদের ফুটবলে স্বপ্ন ছিল তৃতীয়বারের মতো স্বর্ণপদক জয়ের। কিন্তু যাচ্ছেতাই ফুটবল খেলে সে সুযোগ হারানো ফুটবলারদের ব্রোঞ্জপদক নিয়ে সন্তু ষ্ট থাকতে হচ্ছে।

আরচারি বলতে গেলে মান বাঁচিয়েছে বাংলাদেশের। আগের চার আসরে সোনা জিততে না পারা তীরন্দাজরা দশে দশ সাফল্য এনে দিয়েছে। সোনা জয়ের হিসেবে কারাতের অবস্থান দ্বিতীয়। আল আমীন ইসলাম, মারজান আক্তার প্রিয়া এবং হুমায়রা আক্তার অন্তরা জিতে নেন সোনার পদক। ক্রিকেটেও এসেছে শতভাগ সাফল্য। ২০১০ সালে জেতা সোনা ধরে রেখেছে ছেলেদের ক্রিকেট দল। আর প্রথমবারের মতো অন্তর্ভুক্ত মেয়েদের ক্রিকেটেও সেরা হয়ে ইতিহাস গড়েছে মেয়েরা। গেল আসরে দেশের প্রথম স্বর্ণপদকজয়ী ভারোত্তোলক মাবিয়া আক্তার সীমান্ত এবারও সেরা হয়েছে ওজন শ্রেণি পাল্টে। তার সোনাজয়ের দিনই জিয়ারুল ইসলাম ভারোত্তোলন থেকে এনে দেন আরেকটি সেরা সাফল্য। এর বাইরে প্রত্যাশার বাইরে থেকেও দেশকে দুটি সোনার পদক এনে দেন তায়কোয়ান্দোকা দীপু চাকমা এবং ফেন্সিংয়ের ফাতেমা মুজীব।

এই কীর্তিমানদের কারণেই মাথা উঁচু করে ফিরতে পারছে বাংলাদেশ। কিন্তু ‘প্রদীপের নিচেই অন্ধকার’-এর মতোই তাদের সঙ্গী হচ্ছেন এক দঙ্গল ব্যর্থ ক্রীড়াবিদ। তারা কেন ব্যর্থ সেই বিশ্লেষণটা ফেডারেশন কর্মকর্তারা করে দেখবেন নিশ্চয়ই।