রাজধানীর বড় মগবাজারে শুক্রবার সন্ধ্যায় দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার কর্যালয় ও ছাপাখানা ভাংচুর করা হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ যুবলীগ কর্মীদের সহযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাকর্মীরা ভাংচুরে অংশ নেন বলে সংগ্রামের সাংবাদিকরা দাবি করেছেন।
তারা জানান, ভাংচুরের পর হাতিরঝিল থানা পুলিশ এসে সংগ্রাম কার্যালয় থেকে সম্পাদক আবুল আসাদকে আটক করে নিয়ে যায়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লাকে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ শুক্রবার তাদের এক প্রতিবেদনে ‘শহীদ’ উল্লেখ করায় এই হামলা চালানো হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব বিজয় তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা খবর পেয়ে সেখানে পুলিশের টিম পাঠিয়েছি। সম্পাদকে আটক করার বিষয়টি আমার জানা নেই।’
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক সংগ্রামের যুগ্মবার্তা সম্পাদক শহীদুল ইসলাম জানান, ‘শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে মুক্তিযোদ্ধ মঞ্চ নামে একটি সংগঠনের শতাধিক কর্মী সংগ্রাম কার্যালয় ঘেরাও করে রাখে। তারা কাউকে প্রবেশ বা বের হতে দেয়নি। পরে এক পর্যায়ে বড়মগবাজারের আল-ফালাহ প্রিন্টিং প্রেসে যায় তারা। তারা ভবনের বার্তা কক্ষ, সম্পাদনা কক্ষ, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন বিভাগসহ বেশ কয়েকটি বিভাগের কম্পিউটার, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন জিনিষ ভাংচুর ও তছনছ করে’।
তিনি আরও জানান, ‘৫৮টি কম্পিউটার ও পত্রিকার ছাপানোর সব উপকরণ আসবাবপত্র ভাংচুর করেছে তারা’।
হাতিরঝিল থানার ওসি আব্দুর রশীদ জানান, ‘কারা ভাংচুর করছে সেটা নিয়ে পরে কথা বলব। সম্পাদককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হয়েছে।’
এ ছাড়া সংগ্রাম কার্যালয় ভাংচুরের পর বেশ কিছু উত্তেজিত জনতা রাতে হাতিরঝিল থানার সামনে অবস্থান নেয়। তারা ‘জয়বাংলা’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেয়।
মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মাহমুদ বলেন, ‘বিজয়ের মাসে রাজাকার কাদের মোল্লাকে সংগ্রাম পত্রিকা ‘শহীদ’ অভিহিত করে সংবাদ প্রকাশ করেছে। আমরা এই ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে এখানে এসেছি। একই কাজের জন্য পত্রিকার সম্পাদককে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।’
এর আগে কাদের মোল্লাকে শহীদ আখ্যা দেওয়ায় সংগ্রাম কার্যালয় ঘেরাও কর্মসুচি ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ।
ভাংচুর ও সম্পাদককে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর সংগ্রামের প্রধান প্রতিবেক রুহুল আমিন গাজী বলেন, ‘এ ধরনের সংবাদ গত ৫ বছর থেকেই ছাপা হচ্ছে। কোনো সংবাদে কেউ সংক্ষুদ্ধ হলে তারা নিয়ম মোতাবেক প্রতিবাদ দিতে পারেন। কিন্তু তা না করে হামলা ভাংচুর ও আইন হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নাই। এটা অন্যান্য গণমাধ্যমের জন্যও হুমকি স্বরুপ’।
এদিকে কাদের মোল্লাকে শহীদ বলায়, তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান।
তিনি বলেন, ‘এটা অবশ্যই গর্হিত এবং রাষ্ট্রবিরোধী সংবাদ। আমরা এ সংবাদ প্রত্যাখ্যান করি, এটি কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এমন সংবাদের তীব্র বিরোধিতা করছি। দৈনিক সংগ্রামকে এর দায় নিতে হবে এবং জবাবদিহির মুখোমুখি করা হবে’।
তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন স্পেন সফররত তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ দেশে ফিরলে সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
জামায়াতের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত দৈনিকে সংগ্রামে প্রকাশিত পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ‘শহীদ কাদের মোল্লার ৬ষ্ঠ শাহাদাত বার্ষিকী আজ’ শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আজ ১২ই ডিসেম্বর শহীদ কাদের মোল্লার ৬ষ্ঠ শাহাদাত বার্ষিকী। ২০১৩ সালের এ দিনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করে সরকার। জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, মানবাধিকার সংগঠনের অনুরোধ উপেক্ষা করেই ফাঁসি কার্যকর করা হয়…।’
যুদ্ধাপরাধের মামলায় প্রথম ফাঁসি কার্যকর করা হয় কাদের মোল্লার। কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাতে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জল্লাদ শাজাহান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি দল সেদিন ফাঁসি কার্যকর করে।
এর আগে ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধে রাজাকার কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন সাজা দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-২। রায়ের পর সাধারণ মানুষ বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা সেদিন বিকাল থেকে রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে জড়ো হতে থাকে। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে শাহবাগ চত্বরে গড়ে ওঠে গণজাগরণ মঞ্চ।
গণদাবির মুখে সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিটি) আইন সংশোধন করার উদ্যোগ নেয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) সংশোধন বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়। এই সংশোধনের ফলে ট্রাইবুনালের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল করার সুযোগ তৈরি হয়।