ব্রেক্সিট নিয়ে অচলাবস্থা নিরসনের নির্বাচনে ব্রিটেনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল দল। সরকার গঠনে ৩২৬টি আসন দরকার হলেও পেয়েছে ৩৬৫টি। গতবারের চেয়ে ৪৭টি আসন বেশি পেয়ে বরিস জনসনের নেতৃত্বে টরি পার্টি রীতিমতো বাজিমাত করেছে। ১৯৮৭ সালে মার্গারেট থ্যাচারের নেতৃত্বে নির্বাচনের পর থেকে এটাই তাদের সবচেয়ে বড় জয়। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে লেবার পার্টি এবারই সবচেয়ে খারাপ, ২০৩ আসন পেয়েছে। ব্রিটেনের সঙ্গে থাকতে চায় এমন জাতীয়তাবাদী দলগুলো এবার বেশি আসন পেয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ জয়ের ফলে বরিস জনসনের জন্য ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ব্রেক্সিট কার্যকর করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বক্তব্যেও তিনি সেটি পষ্ট করেছেন, এ জয় ‘যদি কিন্তু’ ছাড়া আগামী মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনকে বের করে আনার ম্যান্ডেট। ভোটারদের আস্থা পূরণে রাত-দিন চেষ্টা করব। মানুষ আসলে পরিবর্তন চায়। তাদের হতাশ করা উচিত হবে না।
দ্য গার্ডিয়ান নির্বাচনে মোটাদাগে বরিস জনসনের বাজিমাতের পেছনে ৫টি বিষয়কে সামনে এনেছে। এর প্রথমেই রয়েছে ব্রেক্সিট ইস্যু। কারণ শুরু থেকেই জনসন এটি কার্যকরে অনড়। পার্লামেন্ট ও বাইরে কোণঠাসা হলেও তিনি ব্রেক্সিট হবেই বলে গেছেন। এ আত্মবিশ্বাস জনমতে প্রভাব ফেলেছে। অবশ্য বিবিসি বলছে, ব্রেক্সিট কার্যকরের পর ২০২০ সাল শেষ হওয়ার আগেই ইইউর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে জনসনকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। কারণ ব্রেক্সিট-পরবর্তী বাণিজ্য চুক্তির অন্তর্বর্তী সময়ের মেয়াদ তিনি বাড়াতে রাজি নন।
দুই. এবার রক্ষণশীলরা ব্রেক্সিট, পুলিশ ও নার্সদের স্বার্থ-সংক্রান্ত তাদের বার্তা জনগণের কাছে সহজে পৌঁছে দিতে পেরেছে, বিশেষ করে মধ্যবিত্তদের কাছে। কিন্তু লেবার পার্টি জাতীয়করণ ও পঞ্চাশোর্ধ্ব নারীর পেনশন নিয়ে জটিলতা তৈরি করেছে। তিন. জনসনের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রাধান্য পেয়েছিল দেশটির নীতিগত নানা বিষয়। থেরেসা মে’র ‘ডেথ ট্যাক্স’ নীতি বাতিলের ঘোষণা দিয়ে জনসন জনমনে দারুণ ধাক্কা দেন। ‘নিরাপত্তায় প্রথম’ নীতির অনুসরণও তাকে বিরোধীদের থেকে এগিয়ে রেখেছে। চার. নির্বাচনে বরিস জনসনের বাজিমাতে বিরোধী লেবার পার্টির দুর্বলতাও কাজ করেছে। বহু বছর ধরেই দলটির ভোট পড়তির দিকে। লেবারের ভোটব্যাংক ধরে জনসনের প্রার্থীরা এবার প্রচুর কাজ করেন। কিন্তু জিতেই যাচ্ছি ধরে নিয়ে লেবাররা ঘরে বসেছিল অথবা ব্রেক্সিট পার্টিকে সমর্থন দিয়েছে। অবশ্য পরাজয়ের জন্য লেবার পার্টির প্রার্থীরা দলের ব্রেক্সিটবিরোধী অবস্থান ও জেরেমি করবিনের দুর্বল নেতৃত্বকে দায়ী করেছেন। পাঁচ. সর্বোপরি নির্বাচনে ভূমিধস জয় এসেছে বরিস জনসনের একক ক্যারিশমায়। প্রার্থীদের ভাষ্যে, নির্বাচন নিয়ে করবিন বারবার মত বদলে জনপ্রিয়তার তলানিতে গেছেন। বিপরীতে শুরুতে আলোচনায় না থাকলেও পরে সব আলো কেড়ে নিয়েছেন জনসন। অবশ্য ২০১৭ সালের মে থেকেই তিনি এজন্য নিজেকে তৈরি করছেন। বিভিন্ন টিভি শো থেকে শুরু করে হাসপাতালে গিয়ে অসুস্থ বাচ্চাকে কোলে নিয়ে করবিনের চেয়ে নিজেকে জনদরদি হিসেবে তুলে ধরেছেন।
এমন বিজয়ের পরও এ ফলাফল অখণ্ড যুক্তরাজ্যের টিকে থাকার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। অর্থাৎ ইংল্যান্ড, উত্তর আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের অখণ্ডতা টিকিয়ে রাখার চাপটা ক্রমেই বাস্তব হয়ে দেখা দেবে। যদিও ব্রিটিশ পার্লামেন্টে স্কটল্যান্ডের নির্ধারিত ৫৯টি আসনের ৮১ শতাংশই ব্রেক্সিট অনুসারী এসএনপি জিতেছে।