শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণীয় অবদান

পরাজয় নিশ্চিত জেনেই ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা বাঙালি জাতির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাতটি করে। এদিন তারা একে একে হত্যা করে দেশের সবচেয়ে মেধাবী সূর্যসন্তানদের। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতি ও অবদান নিয়ে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা

শহীদুল্লা কায়সার

‘প্রিয়তমেষু পান্না কায়সার, আমার ছেলেমেয়েগুলোকে তুমি যত্নে রেখো। আমি জানি, তুমি পারবে। তুমি ভালো থেকো। আমি কখনো কোথাও তোমার কাছ থেকে হারিয়ে যাবো না।’ একটি সিগারেটের প্যাকেটের উল্টোপাশে শহীদুল্লা কায়সারের লেখা একটি চিরকুট ছিল এটি। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন ছিলেন তিনি। ছিলেন বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।

রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকায় যুদ্ধের ময়দানেও তিনি ছিলেন সক্রিয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীদের অনেকে দেশ ছেড়ে গেলেও তিনি যাননি। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার জন্য তিনি দেশেই রয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার আগে অনেকেই কবি সুফিয়া কামালের কাছে রেশন কার্ড রেখে গেলে সেসব রেশন কার্ড দিয়ে তিনি চাল, ডাল, ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক জিনিস তুলে এনে বাসায় জড়ো করতেন এবং সেসব জিনিস মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। এছাড়াও তাদের নানাভাবে সহযোগিতা করতেন তিনি। তার বাসা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এই বাসা থেকে প্রতিদিন মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার তৈরি করে দেওয়া হতো।

‘সংশপ্তক’ তার অনন্য রচনা। সংশপ্তক অর্থ ‘নিশ্চিত পরাজয় জেনেও যে বীর মৃত্যুর আগপর্যন্ত লড়ে যায়’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা এ উপন্যাসের নৈপুণ্য আমাদের দেশে একান্তই দুর্লভ। ১৯৫৯-৬২ সালের বিপ্লবী জীবন-দর্শনের প্রতিচ্ছবি স্বরূপ ‘সংশপ্তক’ উপন্যাসটি রচনা করেন তিনি। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে এটি প্রকাশিত হয়। সাম্যবাদী রাজনীতি করার কারণে তাকে জেলে যেতে হয়েছিল বহুবার। ১৯৫৬ সালে জেল থেকে বের হয়ে আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাক’ দিয়ে সাংবাদিক জীবন শুরু করেন। সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি তার সাংবাদিক জীবন ছিল অনন্য। ১৯৫৮ সালের ১৪ অক্টোবর তাকে গ্রেফতার করে জননিরাপত্তা আইনে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত আটক রাখা হয়। ১৯৬২ সালে শিক্ষানীতি নিয়ে পূর্ববাংলায় প্রবল ছাত্র-আন্দোলনের ফলে অন্যদের সঙ্গে শহীদুল্লা কায়সারও কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে ‘দৈনিক সংবাদ’-এর সম্পাদকীয় বিভাগে যুক্ত হন। ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাক’ পত্রিকায় সাংবাদিক জীবনের হাতেখড়ি হলেও তার সাংবাদিক জীবনের সমস্ত কৃতিত্ব ও পরিচিতি ‘দৈনিক সংবাদ’কে কেন্দ্র করে। পরে এ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চের মধ্য রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা বংশালে অবস্থিত ‘সংবাদ’-এর অফিস ভবনটি পুড়িয়ে দেওয়ার পরও তিনি তা পুনঃপ্রকাশের চেষ্টা করেন। দেশের মানুষকে নিভ…তে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো জানাতে তিনি সে সময়ও পিছপা হননি।

১৯৫২-৫৫ সালে জেলখানায় রাজবন্দি থাকা অবস্থাতেও তিনি নাটক লিখেছেন। চট্টগ্রাম জেলে বসে ১৯৫২ সালে ‘নাম নেই’ এবং ১৯৫৪ সালে ‘যাদু-ই-হালূয়া’ রচনা করেন। সাহিত্যকে অন্তর দিয়ে ধারণ করা এ মানুষটি কারাগারে বন্দি থেকেও দেশের মানুষের জন্য লেখা চালিয়ে গেছেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন শহীদুল্লা কায়সার। মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান বাহিনীর অত্যাচার ও ধ্বংসলীলার চিত্র নিয়ে তিনি রচনা করা শুরু করেছিলেন ‘কবে পোহাবে বিভাবরী’ উপন্যাসটি। চার খণ্ডে বইটি লিখতে চাইলেও দুই খণ্ড লেখার পরই সবার মাঝ থেকে হারিয়ে যান তিনি। এটিই ছিল শহীদুল্লার শেষ রচনা। ১৯৬৯ সালে পান্না কায়সারের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন শহীদুল্লা কায়সার। মাত্র ২ বছর ১০ মাস একত্রে সংসার করেন তারা। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র দুদিন আগে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর আর কোনোদিন ফিরে আসেননি তিনি।

মুনীর চৌধুরী

শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামান বলেছেন, ‘ছেচল্লিশ বছর বয়সে দেশদ্রোহী ঘাতকের হাতে নিহত একজন অসাধারণ প্রতিভাধর মানুষের নাম মুনীর চৌধুরী।’ অসাধারণ প্রতিভাধর বলতে তিনি বুঝিয়েছিলেন আদর্শ শিক্ষক ও কুশলী বক্তা, সফল নাট্যপ্রতিভা ও ক্ষুরধার সাহিত্য-সমালোচক, জীবনের নিষ্ঠাবান রূপকার ও সমাজচেতনায় দীপ্ত পুরুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উভয় ড়্গেত্রে দ্বিতীয় শ্রেণি নিয়ে ১৯৪৬ সালে ইংরেজিতে অনার্স এবং ১৯৪৭ সালে মাস্টার্স পাস করেন। ১৯৪৯ সালে খুলনার ব্রজলাল কলেজে ইংরেজিতে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে পেশাজীবন শুরু। ১৯৫০ সালে যোগ দেন ঢাকার জগন্নাথ কলেজে। এরপরই যোগদান করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রম্নয়ারি ভাষা আন্দোলনে তিনি সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। ২৬ ফেব্রম্নয়ারি শিক্ষকদের প্রতিবাদী সভায় আহ্বান করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে দুই বছর কারাগারে বন্দি থাকাকালীন রচিত হয় তার কালজয়ী নাটক ‘কবর’। একুশে ফেব্রম্নয়ারি ৫২-তে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে সরকারি নির্দেশে মিছিলে যে গুলি চালানো হয়েছিল; ‘কবর’ নাটকে সে কথা নেতার সংলাপে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে : ‘জীবিত থাকতে তুমি দেশের আইন মানতে চাওনি! মরে গিয়ে তুমি এখন পরপারের কানুনকেও অবজ্ঞা করতে চাও। কমু¨নিজমের প্রেতাত্মা তোমাকে ভর করেছে, তাই মরে গিয়েও এখন তুমি কবরে যেতে চাও না। তোমার মত ছেলেরা দেশের মরণ ডেকে আনবে।’

মূলত ‘কবর’ ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত একটি সফল নাটক, যা বাঙালি জাতির বিবেকের প্রতিনিধিত্ব করেছে সমকালে। আজও নাটকটির প্রাসঙ্গিকতা হচ্ছে এখানে ভাষার প্রতি মানুষের যে মমত্ববোধ ও সংগ্রামী চেতনার প্রকাশ ঘটেছে, তা কোনো কালেই মস্নান হবে না। ভাষা-শহীদদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে
মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার চেতনায় উজ্জীবিত হয় মানুষ। জেলখানার ভেতরেই এ নাটকের মঞ্চায়ন হয়। আর এতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন কারাবন্দিরাই।

‘কবর’ ছাড়াও বাংলা সাহিত্যে মুনীর চৌধুরীর আরও কিছু অবিস্মরণীয় অবদানের মধ্যে আছে রক্তাক্ত প্রান্তর (১৯৬২), চিঠি (১৯৬৬), দণ্ডকারণ্য (১৯৬৬), পলাশী ব্যারাক ও অন্যান্য (১৯৬৯)। অনুবাদেও বেশ চৌকস লেখনীর হাত ছিল মুনীর চৌধুরীর। বিখ্যাত অনুবাদ নাটকের মধ্যে তিনি লিখেছেন, জর্জ বার্নার্ড শ’র ‘ইউ নেভার ক্যান টেল’-এর অনূদিত নাটক কেউ কিছু বলতে পারে না (১৯৬৯)। শুধু পড়াশোনা আর লেখালেখিতেই তার কর্মজীবন ছিল না। দেশবাসীর জন্য তিনি উদ্ভাবন করেছিলেন বাংলা টাইপরাইটারের জন্য উন্নত মানের কী বোর্ড। যা ‘মুনীর অপটিমা’ নামে পরিচিত।

পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে বেছে নিলেও ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির মাঠে সক্রিয় ছিলেন মুনীর চৌধুরী। তার প্রতিটি রচনাতেই সমসাময়িক বিষয়গুলো খুব সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন কারাগারের চার দেয়াল কখনই
মুক্তচিন্তার পথে বাধা নয়। রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও তার প্রতিবাদের ভাষা ছিল লেখা। তার এ প্রতিবাদ সহজে মেনে নিতে পারেনি পাকিস্তানি হানাদারদের দল। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আলবদরদের সহায়তায় বাড়ি থেকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় মুনীর চৌধুরীকে। এরপর থেকে আর কোনোদিন তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। দেশ হারায় একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র।

আনোয়ার পাশা

একটি দেশের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের গল্প এক কলমে লিখে কখনো শেষ করা যায় না। নিজের চোখে ভয়াবহ যে সময়গুলো সবাই প্রত্যক্ষ করেছেন তার দুঃসহ স্মৃতি কাউকে বলে বোঝানো সহজ নয়। কষ্ট বয়ে বেড়ানো মানুষগুলো পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেলেই কঠিন সেই সময়গুলোর স্মৃতি হারিয়ে যায়। এদের মাঝেই কিছু মানুষ চান তারা চলে গেলেও যেন দুঃসহ সময়গুলোর ঘটনা হারিয়ে না যায়। তাই তারা তুলে নেন কলম। তাদের লেখনীতেই আমরা জানতে পারি যুদ্ধের সময় কত কঠিন মুহূর্ত পার করতে হয়েছে মানুষকে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ৯ মাস পর্যন্ত প্রতিটি দিন প্রতিটি রাত বাংলাদেশের মানুষকেও পার করতে হয়েছে ভয়াবহ কিছু সময়ের মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে যুদ্ধ, রক্ত, লাশ, মানুষের হাহাকার, কান্না এ বিষয়গুলো যেন পরের প্রজন্ম ভুলে না যায় তাদের জন্য সেই সময়ের প্রতিচ্ছবি নিয়ে আনোয়ার পাশা লিখেছিলেন ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ উপন্যাসটি। এই উপন্যাসটি যেন একাত্তরের দিনলিপি। লেখক ২৫ মার্চের ভয়াবহ কালরাত পেরিয়ে আরও কিছুদিন বেঁচে থাকলেও ১৪ ডিসেম্বরের হত্যাযজ্ঞের হাত থেকে বেঁচে ফিরতে পারেননি লেখক। একাত্তরের অমর উপাখ্যান তার হাতে রচিত হবে বলেই হয়তো তিনি বেঁচে ছিলেন আরও কিছুদিন। ‘বাংলাদেশে নামল ভোর’ বাক্য দিয়ে যেই লেখনীর শুরু, তার শেষ হয় অমোঘ আশার বাণী ‘মা ভৈঃ’ দিয়ে। এক সকাল থেকে আরেক সকালের এই গল্প লেখা শুরু হয় একাত্তরের এপ্রিল মাসে আর শেষ হয় জুনে। উপন্যাসের পটভূমি ঢাকা থেকে বাংলাদেশের নিভ…ত এক গ্রাম। নিজের এবং পরিবারের অন্যদের জীবন নিয়ে যখন মানুষকে পালিয়ে বাঁচতে হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জায়গায় তখন আনোয়ার পাশা লিখছেন দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক কিন্তু গৌরবময় সময়ের দলিল ‘রাইফেল রোটি আওরাত’। এটি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম উপন্যাস।

পৃথিবীতে খুব বেশি লেখক নিজের জীবন নিয়ে করুণ অধ্যায় লেখেননি। আনোয়ার পাশা লিখেছিলেন। যেই চিত্র তিনি চাক্ষুষ দেখেছিলেন তাই তিনি পরের প্রজন্মের জন্য তুলে ধরেছেন। একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি দোসররা যখন তাকে ধরে নিয়ে যায় তখনো তার পরিবার হয়তো তার বেঁচে ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু তিনি ফিরে আসেননি। মার্চ মাসে যুদ্ধ শুরু হলেও এপ্রিলেই তিনি বুঝতে পারেন এ দেশ স্বাধীন হবেই। তার এ উপন্যাস পড়লে বোঝা যায় এই লেখনী থেকে কয়েক প্রজন্ম পরেও যখন কেউ এই বই পড়বে তখনো তারা যুদ্ধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারবে।

ডা. ফজলে রাব্বী ও ডা. আবদুল আলীম চৌধুরী

পেশাগত জীবনে মানুষকে সহায়তা করা তো বটেই, মুক্তিযুদ্ধের সময় চিকিৎসক, মেডিকেল কলেজের ছাত্র, কলেজ ও হাসপাতালের নানা শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী নানাভাবে অবদান রেখেছেন। অস্ত্র হাতে যুদ্ধে অংশ নেওয়া, হাসপাতালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া, মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সরবরাহে সাহায্য করা, যুদ্ধ সংক্রান্ত নানা তথ্য আদান-প্রদানে তাদের অবদান ছিল। শুধু তাই নয়, চিকিৎসকদের গাড়িতে করে পার হয়েছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা, আনা-নেওয়া করা হয়েছে অস্ত্র, ওষুধসহ অনেক কিছু। চিকিৎসকদের অবদানের কথা বললে কয়েকজন মানুষের কথা না বললেই নয়। তাদের মধ্যে একজন হলেন মুক্তিযুদ্ধে চিকিৎসকদের নেতৃত্বের গোড়াপত্তনকারী ঢাকা মেডিকেলের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রফেসর ডা. ফজলে রাব্বী। ২৫ মার্চ রাতেই সম্ভাব্য এক আঘাতের আশঙ্কায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে নয়টি উইংয়ে ভাগ করা হয়েছিল যেন ঢাকার ভেতরে মুক্তিযোদ্ধারা চিকিৎসাসেবা পায় এবং সাধারণ জনগণের কোনো ক্ষতি না হয়। ঢাকা মেডিকেলে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দিতে যে টিম গঠন করা হয়েছিল তার নেতৃত্বে তিনিই ছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে চক্ষুবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আলীম চৌধুরী। তবে তিনি সেবার স্বার্থে বেশিরভাগ সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই থাকতেন। এছাড়াও সীমান্তের ওপারে যে ক্যাম্প ছিল সেখানে ডা. আলীমের গাড়ির বনেটভর্তি করে ওষুধ যেত। টাকা উঠিয়ে দেওয়া, তথ্য আদান-প্রদান এবং অস্ত্র এদিক-সেদিক যাই হতো তার সবটাই হতো তার ডাক্তারির চিহ্ন দেওয়া গাড়িতে করে। এছাড়াও ছিলেন সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সামসুদ্দীন আহমেদ। তার দায়িত্ব ছিল যুদ্ধে আহত রোগীদের অপারেশন সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে লক্ষ রাখা। তার সহযোগী হিসেবে সহকারী সার্জন ছিলেন ডা. আজহারুল হক ও ডা. এবিএম হুমায়ুন কবির। ডা. আজহারুল হক কিছু রোগীর চিকিৎসা করতেন হাতিরপুলে বানানো তার নিজস্ব ডিসপেনসারি ‘সাঈদা ফার্মেসী’তে। এছাড়া তিনি বহির্বিভাগ দিয়ে নানা কৌশলে হাসপাতালে ঢোকাতেন আহত মুক্তিযোদ্ধাদের।

ডা. ফজলে রাব্বী এবং চক্ষু বিশেষজ্ঞ আলীম চৌধুরীকে ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর তাদের নিজ নিজ বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনী। ১৮ ডিসেম্বর তাদের ক্ষত-বিক্ষত লাশ পাওয়া যায় রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। শুধু ডা. ফজলে রাব্বী ও ডা. আলীম চৌধুরীই নয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান হানাদার বাহিনী হত্যা করে অধ্যাপক ডা. শামসুদ্দীন আহমেদ, অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবীর, ডা. আজহারুল হক, ডা. সোলায়মান খান, ডা. আয়েশা বদেরা চৌধুরী, ডা. কসিরউদ্দিন তালুকদার, ডা. মনসুর আলী, ডা. মোহাম্মদ মোর্তজা, ডা. মফিজউদ্দীন খান, ডা. জাহাঙ্গীর, ডা. নুরুল ইমাম, ডা. এস কে লালা, ডা. হেমচন্দ্র বসাক, ডা. ওবায়দুল হক, ডা. আসাদুল হক, ডা. মোসাব্বের আহমেদ, ডা. আজহারুল হক (সহকারী সার্জন), ডা. মোহাম্মদ শফীকেও।