১৬ বছর বয়স থেকে সুন্দরবনের গভীরে ঘুরে নৌকায় তুলে এনেছেন জল থেকে যে সম্পদরাজি, সেগুলো ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের চমকে দিয়েছে। তারা বিশ্বজিৎ সাহুর নিদর্শনের মাধ্যমে সুন্দরবনমালায় মানুষের ইতিহাস গবেষণা শুরু করেছেন। বলছেন ওমর শাহেদ
বিশ্বজিৎ সাহুর মাঝারি ধরনের বাড়িটি অন্য অনেকের মতো, গোবর্ধন দ্বীপের নির্জন স্থানে, আস্তে আস্তে দেখা যায় সাগরের বেলাভূমি থেকে। ভারতের বঙ্গোপসাগরের সুন্দরবনমালার ব-দ্বীপের উত্তর-পশ্চিমের এ অংশের সুচালো তীর সাগরের সাধারণ উচ্চতা বাড়তে থাকায় ক্ষয় হচ্ছে। তিনি জেলে, তার বাড়িতে ফলফলাদি ফলে। সার্টিফিকেট, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নায়ক, কবিদের ছবি; কাপড়-চোপড় শুকানোর দড়ি ঝুলে আছে ভেতরের আস্তরমাখা দেয়ালে। অথচ আশপাশের প্রতিবেশীদের চেয়ে বাড়িটি আলাদা, বিশিষ্ট। অনেকগুলো তাক, নিচেও থরে থরে সাজানো হাড়; নানা ধরনের, আকারের ভাঙা আসবাবপত্র; শত শত নানা ধরনের মূর্তি। শত শত দ্রব্য, মূর্তির ভাঙা অংশ আছে। সবই উদ্ধার করেছেন সাগর থেকে। মহামূল্যবান ঐতিহাসিক অনন্য সম্পদগুলো ভারত ও বিশ্ব ইতিহাসের অংশ। ইতিহাসবিদদের মধ্যে অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে ভারতের পশ্চিমের ব-দ্বীপ সুন্দরবনের ইতিহাস নিয়ে। তীব্র, রসময় আগ্রহ তৈরি করেছে প্রত্নতাত্ত্বিকদের। ৩০ বছরেরও বেশি হলো বিশ্বজিৎ সাহু সংগ্রহ করে চলেছেন ১০ হাজারেরও বেশি নৃতাত্ত্বিক সম্পদরাজি। মানুষের তৈরি, অসাধারণ শিল্পকলারও আদর্শ উদাহরণ গড়ে তুলেছেন একা। জলমগ্ন এ বনের ধারালো প্রান্ত- সাগরে, নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে; গোলপাতায় ঘেরা বনের আশপাশ ও ভেতরে ঘুরে ঘুরে মাছ ধরার সময় মনোযোগ অন্যদিকে নিয়ে, নিজে ও পরিবারকে না খাইয়ে গড়া তার অমূল্য সংগ্রহরাজি এখন সবার সম্পদ। আছে অনেক কিছু- খোদাই মূর্তি বা প্রতিমা (আমরা এখন বলি ভাস্কর্য), পাথরের নানা ধরনের ও আকারের হাতিয়ার, টেরাকোটার দ্রব্য, প্রাচীন আমলগুলোর কুমোরের সৃজনশীল, অসামান্য শিল্পনিদর্শন- সবই পাওয়া গিয়েছে এখানে। গুপ্ত (প্রাচীন ভারতের ৩২০ থেকে ৫৪০ সালের রাজকীয় শাসনামল- ২২০ বছরের মানবেতিহাস) আমল থেকে তাদের পরের আমলগুলোও রেখেছেন নিজের কাছে। দুর্লভ সম্পদরাজির মধ্যে আরও আছে- ব্রাহ্মণ ও তাদের ভাস্কর্য তৈরির শুরুর দিকের নিদর্শন মৌর্য (চন্দ্রগুপ্তের হাতে প্রতিষ্ঠিত রাজবংশটি ভারতের বিরাট অংশজুড়ে শাসন শুরু করেন; শাসনামল শুরু ৩২১ থেকে ১৮৫ খ্রিস্ট জন্মের আগে); কুষাণ (প্রথম থেকে তৃতীয় শতাব্দী ধরে টানা ৩০০ বছর শাসন করা বংশের বিখ্যাত রাজা কানিষ্ক-বৌদ্ধ ধর্ম তার পৃষ্ঠপোষকতায় গান্ধার থেকে চীন পর্যন্ত ছড়ায়) ও শুঙ্গ (১৮৫ থেকে ৭৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন রাজা; বিখ্যাত রাজা ভগভদ্র, এখন ভারতের মধ্য প্রদেশের বিখ্যাত হিলিডোরাস পিলারের জন্য বিখ্যাত) সময়কালের নিদর্শন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী ও প্রাচীন শহর কলকাতা এবং আশপাশে খননকাজের সঙ্গে তুলনা করে সাহুর এই নিদর্শনরাজি অমূল্য গুরুত্ব লাভ করেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদরা জানিয়েছেন, তাদের জানা ইতিহাসেরও অনেক আগে এই অঞ্চলের ইতিহাসের আলোচনা শুরু করতে হচ্ছে সাহুর আবিষ্কারগুলোর মাধ্যমে। ভারতের সেন্টার ফর আর্কিওলজিক্যাল স্টাডিজ অ্যান্ড ট্রেনিং, ইস্টার্ন ইন্ডিয়া, কলকাতার অন্যতম ফেলো বা বিদ্বৎসমিতির বিশিষ্ট সভ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক শর্মী চক্রবর্তী বললেন, ‘সাহুর কাজ আমাদের জানায়, সুন্দরবনমালার ভেতরে মানবজাতির ইতিহাস খ্রিস্ট জন্মের ১ অথবা ২ শতাব্দী আগে থেকে। সে অঞ্চলে ইতিহাসগুলো লুকিয়ে আছে, যেগুলো এখনো বনে ভরা।’ অথচ এত দিন তাদের সবার জানা ছিল, সেখানে মুঘল সম্রাট আলমগীর-২-এর ১৭০০ শতকের মাঝামাঝি আমল পর্যন্ত ইতিহাসের বেশি নিদর্শন নেই। এরপর বনের কিছু অংশ পরিষ্কার করে বসবাসের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ‘সাহুর এই কাজ অনন্য কাঠামোবদ্ধ, বনের মতোই প্রাকৃতিক সংগ্রহরাজি; মানববসতির ইতিহাসের দিক থেকে সম্ভাবনাময়; কেবল খুঁজে পাওয়ার কোনো বিষয় নেই। কিছু নিদর্শন খুবই দুষ্প্রাপ্য, হতে পারে গুপ্তযুগের ও খ্রিস্টানদের জন্মের আগের সময়ের। সম্পদগুলো আকর্ষণীয় তথ্যের ভাণ্ডার। নৃ-তাত্ত্বিক সম্পদগুলো সংগ্রহের মাধ্যমে নতুন গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডার জোগাড় হয়েছে, যেগুলো জানা জরুরি’-বললেন রুপেন্দ্র কুমার চট্টোপাধ্যায়, কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ‘পরেশ চন্দ্র চ্যাটার্জি প্রফেসর’। গোবিন্দপুরে এক হাজার হেক্টর জমিতে ছড়িয়ে থাকা একটি বন থেকে সাহুর সংগ্রহ অভিযানের শুরু। বিরাট জমিটি একসময় সাগরের বুকে ডুবে ছিল। তিনি অবিরাম ও বিস্তৃতভাবে খোঁজার কারণে অনেক পরে এখন ‘ধানচি’ নামের সাগরের পাশের বন এলাকাটি থেকে কাজের শুরু আঁকতে পারেন। ধানচি ও তেমন ধরনের আরও অনেক সাইট (প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা) থেকে, যেখানে সাগর সোয়ালোদের বাস; পানিতে সেগুলো ধুয়ে যাচ্ছিল অবিরাম; কোনো দিন না জানা ইতিহাসের এই কেন্দ্রগুলো সম্পর্কে প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলছেন, গুরুতর মনোযোগ দিয়ে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, যাতে নতুন এক ইতিহাসের জন্ম হয়। তাতে উঠে আসবে মানববসতি ও তাকে প্রকৃতির বন বিস্তারের মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়ার কাহিনী। শর্মী চক্রবর্তী বললেন, ‘এ অঞ্চলে সুন্দরবনের ভেতরে সত্যিকারের প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন এখনো বাকি। নির্দিষ্ট এক সময়ে উৎখননের কথা এসেছে, যখন পরিবেশের পরিবর্তন নিয়ে আমরা গভীরভাবে ভাবছি; সুন্দরবনে এভাবে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা গুরুত্বপূর্ণ হবে।’ ২০১৪ সালে সুন্দরবনের ওপর বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্ট বলে- ‘নানা ধরনের প্রাকৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক পরিবর্তনের মাধ্যমে বনটি এই অঞ্চলে সাগরের পানির উচ্চতা বছরে তিন থেকে আট মিলিমিটার বাড়ার সাক্ষী হতে পারে। তুলনামূলকভাবে সমতল ভূমি, ঝঁকিপূর্ণভাবে মানচিত্রে সেগুলোর অবস্থান থাকায় সাগরের উচ্চতা ৪৫ সেন্টিমিটার বাড়লে ভারত ও বাংলাদেশের সুন্দরবনমালার মোট ৭৫ ভাগ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।’ বিশ্বজিৎ সাহু বেড়ে উঠেছেন সাগরের এমন এক প্রান্তে, যেখানে জীবন ও বাড়িগুলোর ওপর পানির ফোঁটা সর্বক্ষণ তার স্বীকৃতি জানায়। ৫০ বছর আগে তার জন্ম। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত ৩০টি বন্যার সাক্ষী ও শিকার। একেবারেই গরিব হিসেবে বনে যাওয়া ও সেভাবে বসবাস করা জনপদের মানুষ। ১৪ বছর বয়সে লেখাপড়ার খুব আগ্রহ থাকলেও অভাবে, সুযোগ না থাকায় ছাড়তে বাধ্য হলেন। নদীতে বেড়িবাঁধ দেওয়ার কাজ করতেন, নয়তো আশপাশের এলাকাগুলোতে নৌকায় মাছ আনা-নেওয়ার কাজ করে জীবন চালাতেন। সেই মানুষটি সুনাম লাভ করেছেন। স্থানীয় পর্যায়ে ইতিহাস ও নিদর্শন সংগ্রহের দিকে তার মনোযোগের জন্য তিনি, তার সংগ্রহগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক সেমিনারগুলোতে অংশগ্রহণ করছেন। ১৮৬১ সালে আলেক্সান্ডার কানিংহামের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা, তেমন সাংস্কৃতিক নিদর্শন সংরক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত ‘দি আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এএসআই)’ তাকে সুন্দরবনমালায় কাজের জন্য স্বীকৃতিপত্র প্রদান করেছে। তার বাড়িতে ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের আগমন ১০ পাতার খাতা ভরে তালিকাভুক্ত আছে। এর বাইরে তার, তাদের জীবন কঠিন। গেল বছর গোবিন্দপুর দ্বীপে বিদ্যুতের আলো পৌঁছেছে। এখনো তার বাড়িতে পৌঁছায়নি। তিনি ও তার পরিবার এখনো না খেয়ে দিন কাটানোর মতো জীবনযাপন করেন। ‘বিপর্যয়ের সময়গুলোতে (বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি ইত্যাদি) সাগর এত উত্তাল থাকে যে, সাহায্যও আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারে না’, বললেন। সেই মানুষটির প্রাচীন নিদর্শনের প্রতি ভালোবাসার শুরু ১৬ বছর বয়সে। তখন অ্যাপেন্ডিসাইটিস রোগের চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যেতে হলো। সরকারি হাসপাতালে পুরো একটি দিন অপেক্ষা করতে হলো রোগী হয়ে। সময় কাটাতে পাশের ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম দেখতে গেলেন। তাকে বিস্মিত, চমকে দিল জাদুঘরে এমন কিছু মহামূল্যবান নিদর্শন, যেগুলো একই রকমের, সুন্দরবনমালার প্রান্ত ঢালু হয়ে সাগরের মাধ্যমে ক্ষয় হওয়ার পর তিনি দেখেছেন। বনমালাতে ফিরে এসে সেগুলো খুঁজতে লাগলেন। অন্য জেলেরা সারাবেলা মাছ ধরে যখন ফিরতেন বাড়িতে, কিশোর জেলে প্রতিদিন নিদর্শনগুলোর খোঁজে বনের গভীরে তার বিপজ্জনক, আরও ভয়ংকর অভিযান পরিচালনা করতেন। তবে এখনো জেলে তিনি। তার এই আবিষ্কার এতই মূল্যবান ও চমক লাগানো যে, নামকরা প্রত্নতাত্ত্বিকরা কোন সময় থেকে কোন সময়ের সুন্দরবনের নিদর্শন তুলে নিয়ে আসছেন, বিচার করতে গিয়ে ভাগ হয়ে গিয়েছেন। তারা তাদের গবেষণা ও জ্ঞান এখানে তার আবিষ্কারের ভিত্তিতে করতে বাধ্য হচ্ছেন। এএসআইয়ের সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক (পশ্চিম) পি কে মিশ্র তার প্রতিষ্ঠানে সেগুলোতে মৌর্য আমলের বলে ৩৫ পাতার এক গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। পাশাপাশি সেখানে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় স্বাধীনভাবে একটি অনুসন্ধান পরিচালনার জন্য অনুমতির আবেদন চেয়েছেন। জানিয়েছেন, তিনি সাতটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান সুন্দরবনমালাতে শনাক্ত করেছেন, সেগুলোর প্রতিটিতেই অঞ্চলটির ইতিহাসে মৌর্য এবং গুপ্ত আমলের চিহ্ন আছে। শর্মী বলেছেন, ‘অনেক আগের মৌর্য আমলের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া গিয়েছে সেই সময়ের নিদর্শনরাজির মাধ্যমে, কিন্তু সেগুলো শুঙ্গ আমলের দিকে আমাদের নিয়ে যেতে পারে।’ তপন কুমার দাসও আছেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ভারত ইতিহাস এবং সংস্কৃতির অধ্যাপক, তিনি বিশ্বাস করেন, সাহুর সংগ্রহের এই মানব ব্যবহার্য বস্তুরাজি এবং অন্য প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান (প্রত্নতত্ত্ব বিজ্ঞানের ভাষার সাইট) নির্দেশ করে, এই সুন্দরবনমালাতে মানববসতি প্রস্তর যুগ মানে যখন থেকে পাথরের ব্যবহার করা শিখল এবং ছোট কুঠির বানানোর শুরু করলো- সেই আমলের। সাহুর খুঁজে পাওয়া নিদর্শনগুলোর পাশাপাশি আরও কটি প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটের কথা বলছেন ইতিহাসবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিকরা। পশ্চিম বাংলার ২৪ পরগনার চন্দ্রকেতুগড়ের দম দম ঢিবি, রাজধানী কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের মেট্রো রেলস্টেশন এবং এশিয়ার সবচেয়ে পুরনো নারী শিক্ষা মহাবিদ্যালয় বিখ্যাত বেথুন কলেজের নির্মাণকাজের সময় যে সাইটগুলো আবিষ্কার হয়েছে; সেগুলোও সরলভাবে মানববসতি এবং এই অঞ্চলের রোমাঞ্চকর সমুদ্রযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্যের চিহ্ন তুলে ধরে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনেক আগের এই ইতিহাস। ‘আমরা অনুমান করতে পারি, সুন্দরবনমালাতে সমৃদ্ধভাবে বেড়ে উঠতে থাকা ও ছড়ানো একটি মানববসতি ছিল। জাহাজ বা বড় নৌকাগুলো তাদের তাম্রলিপ্তি (এখন সেটি হালদা বন্দরের কাছের তামলুক) হয়তো এই এলাকা ব্যবহার করে ইন্দোনেশিয়ার জাভা, সুমাত্রা; মালয়েশিয়া এবং শ্রীলঙ্কার দিকে যেতেন’- বললেন শান্তনু মিত্র, সুপারিনটেনডেন্ট (তত্ত্বাবধায়ক) হিসেবে এএসআই থেকে অবসর নিয়েছেন। জানালেন তার দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ও সেসব স্থান পরিদর্শনে, ‘সম্ভবত চন্দ্রকেতুগড় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হতো এবং অন্য সবগুলো এলাকার মধ্যে সুন্দরবনও একটি নৌ-কেন্দ্র ছিল। উপ-নগর হিসেবে সেখানে বসতি ছিল।’ সুন্দরবনমালার সেই সমৃদ্ধ বসতিগুলো বছরের পর বছরে নানা কারণে (প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট) বিরাট গঙ্গা নদীর গতিপথ টানা পরিবর্তন এবং সে কারণে অন্য জায়গাগুলোতে সরে যেতে বাধ্য হলো। ‘সেখানে ভূতাত্ত্বিক গবেষণা কর্মগুলোর মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি, এই ব-দ্বীপটির নির্মাণ বা তার তৈরি সে কারণে পূর্বদিকে সরে গিয়েছে’-বললেন শর্মী। তার অনুমান- ‘পর্তুগাল ও মিয়ানমারের জলদস্যুরা (যাদের লুণ্ঠনই ছিল প্রধান কাজ) বিরাট আকারের ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়েছেন উপকূলের মানব এই বসতিগুলোতে। তবে এখানে সত্যিকারের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণাকর্ম পরিচালনা এখনো বাকি। তাতে অনেক সত্য উঠে আসবে।’ এএসআইয়ের পশ্চিম অঞ্চলের পরিচালক নন্দিনী ভট্টাচার্য বললেন, ‘বৈজ্ঞানিক, বিস্তৃত এবং এএসআই (দি জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া) ও জেডএসআই (দি জুওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া)-র যৌথ উৎখননের মাধ্যমে অনুমানগুলো নিশ্চয়তা পাবে। ফলে অামাদের আরও বিস্তৃত উৎখনন কার্য বিরাট ও বিস্তৃত এই মানববসতি এলাকার উপস্থিতি, তার চরিত্র এবং আরও সব নিদর্শনের জন্য পরিচালনা করা প্রয়োজন।’ তাদের প্রতিষ্ঠান অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মাধ্যমে সুন্দরবনমালার ২০টি সাইট উৎখননের জন্য চিহ্নিত করেছে। বিরাট এই কর্মযজ্ঞ এবং মানব ইতিহাসের অনন্য নজিরের জন্মদাতা গরিব জেলেটি তার নিদর্শন ও আবিষ্কারগুলো বাঁচিয়ে রেখেছেন অভাব ও জীবনের সঙ্গে সংগ্রামে। গোবর্ধনপুরে ‘সুন্দরবন জাদুঘর’-এ ১২ জন ট্রাস্টির পরিচালনায় তার বাড়িতে সম্পদরাজি আছে। ভারতের এন্টিক ও শিল্প নিদর্শন আইন ১৯৭২-এ, কোনো প্রাচীন নিদর্শন ব্যক্তিগত সংগ্রহে রাখা যায় না। সে জন্য সরকারি সত্যতা প্রতিবেদন পেতে হয় ও রেজিস্ট্রেশন লাগে। তবে এএসআইয়ের সাহুর সংগ্রহশালা ঘুরে সত্যতা প্রতিবেদন করা বাকি। তার বিরাট সংগ্রহের সুবিন্যস্ত তালিকা ও সংরক্ষণ প্রয়োজন। সেই কাজ তাকে করতে হলে গরিব জেলেকে আরও গরিব হতে হবে। (দি বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড থেকে)