মরছে কেন হাতি?

কদিন পর পরই চট্টগ্রামের নানা এলাকায় বন, পাহাড় ছেড়ে লোকালয়ে নেমে আসছে বনের হাতি পড়ে থেকে রোগে ভুগে মরছে মানুষের সম্পদ নষ্ট করছে অথচ ওরা একেবারেই বিলুপ্ত প্রাণী ছবি তুলে আনোয়ারা উপজেলা ঘিরে পুরো চট্টগ্রামের চিত্র বলেছেন জাহেদুল হক

n পৃথিবীতে হাতির দুই প্রজাতি বেঁচে আছে–এশীয় ও আফ্রিকান। বাংলাদেশে এশিয়ান হাতি জন্ম নেয়।

n পূর্ণ বয়স্ক হাতির দাঁত প্রায় ১.৮ মিটার (৫. ৯ ফিটের বেশি) পর্যন্ত লম্বা; এক জোড়া দাঁতের ওজন প্রায় ৭০ কেজি।

n দাঁতের খুব বাজে চাহিদার কারণে এই দেশ ও বিশ্ব থেকে সবচেয়ে বড় স্থলচর বন্যপ্রাণীটি বিলুপ্ত হয়ে চলেছে।

n অথচ পুরো বিশ্বে হাতির দাঁত কাটা ও তার দেহের ব্যবসা অবৈধ ও মারাত্মক দণ্ডনীয় অপরাধ। তারপরও শিকারিরা লোভে, লালসায়, প্রতিহিংসায় লুকিয়ে প্রতিক্ষণ হাতির শিকার ও বন্দি করে দাঁত কেটে প্রাণীটিকে মেরে ফেলছেন।

n তাদের দাঁত বা গজদন্ত দিয়ে যিশুর জন্মের আগে থেকে প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক সময়েও শিল্পকর্ম তৈরি হয়েছে।

n তৈরি হয়েছে রাজসিংহাসনের পায়া, নানা ধরনের মূল্যবান আসবাব।

n বহুমূল্য মন্দির সাজানোতেও মানুষ হাতির দাঁত ব্যবহার করেছে।

n এখনো গজদন্ত শৌখিনতার প্রতীক হয়ে আছে। অলংকারে ও নানা দ্রব্য তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে।   

n মানুষের এমন বিলাসিতার অকাতর ও অকারণ বলি হচ্ছে প্রকৃতির এই অপূর্ব সৃষ্টি।

n তারাই তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্থলচর বন্যপ্রাণী। একইসঙ্গে বিশ্বপ্রজাতির অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।

n দেহটি তাদের বিশাল। পূর্ণবয়স্ক হাতির ওজন ৩ টন পর্যন্ত হয়। তবে এখন তারা খাবার ও জায়গার অভাবে দিনে দিনে ছোট হয়ে চলেছে।

n  চওড়ায় একটি হাতি ২১.৩২ ফিটের বেশি বা ৬৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়।

n কান দুটি খুব চওড়া ও বিরাট হয়। দেহের তুলনায় চোখের আকার খুব ছোট। বয়স্কদের চামড়া কোঁচকানো ও ধূসর।

n দেহের সবচেয়ে বিচিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ– শুঁড়। হাতির নাক বেড়ে শুঁড়ে পরিণত হয়।

n তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ইন্দ্রিয় ও বেঁচে থাকার প্রধান এই অবলম্বনটি খাবার তুলে মুখে দেওয়া, ধরা, ঘ্রাণ নেওয়া, দেহ পরিষ্কার করা, শরীরের পানি ধরে রাখা ইত্যাদি কাজে ব্যবহার হয়।

n অঙ্গটি দিয়ে পূর্ণ বয়সী হাতি অনায়াসে ২৭০ কেজি পর্যন্ত ওজনদার জিনিস তুলতে পারে।

n পোকামাকড় থেকে নিজেকে বাঁচানো ও শরীরের তাপমাত্রার ভারসাম্য–খুব গরম, শীত ইত্যাদি ধরে রাখতে ওরা বেশিরভাগ সময় দেহে মাটি মাখায়।

n দল বেঁধে চলা প্রাণীটি পানি ও মাটি নিয়ে খেলতে ভালোবাসে। কদাচ দলছুট পুরুষ হাতির দেখা মেলে।

n পূর্ণবয়স্ক এক হাতি দিনে প্রায় ১৫০ কেজি খাবার খায় ও ৮০ থেকে ১২০ লিটার পানি পান করে।

n তারা তৃণভোজী। গাছের পাতা, কলা, বাঁশ, কাঁঠাল, লম্বা ঘাস, ফুল, নারকেল গাছের কচিপাতা ইত্যাদি নানা ধরনের খাবার খেয়ে বেঁচে থাকে।

n রাত-দিন বিরাট দেহ বাঁচাতে খাবারের খোঁজে স্থান থেকে অন্য স্থানে দলে দলে ঘোরে। তবে এখন বন্য দল দুই-তিনজনেরও হয়ে গিয়েছে।

n খাবারের অভাবে প্রায়ই মানুষের প্রতিরোধ এড়িয়ে ফসলের মাঠে ঢুকে ওরা ফসল খেতে বাধ্য হচ্ছে।

n হাতির প্রজননকাল মার্চ থেকে জুন। গর্ভধারণ করে মা হাতি প্রায় ২২ মাস ধরে।

n সাধারণত দুই থেকে চার বছর পর শাবকের জন্ম দেয়।

n বাংলাদেশের পাবর্ত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল, কক্সবাজারের পাহাড়ি বনাঞ্চল, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান, টেকনাফের বন, হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান, জলদি ও চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে এখনো অল্প কটি বন্যহাতি বিচরণ করছে।

n অথচ এক সময় বাংলাদেশে প্রচুর বন্যহাতি ছিল। প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে চিড়িয়াখানার কটি ছাড়া।

n কারণ হাতির বেঁচে থাকার জন্য বিশাল বিচরণক্ষেত্র, বন, প্রয়োজনীয় খাবারের জোগান, পর্যাপ্ত পানি ও বিশ্রামের জায়গা দরকার।

n  হাতির বাসস্থান ধ্বংস করে, বন উজাড়ে, জনসংখ্যার চাপে, সংরক্ষণের অভাবে, খাদ্যাভাব ও চলাফেরার পথে (একই পথে এই প্রাণীটি বারবার চলাফেরা করে) বাধা তৈরি এই দেশে হাতি বিপন্ন প্রাণী হয়ে গিয়েছে।

n হাতির বনাঞ্চল কেটে (ওরা তো আর বাঘের মতো হিংস্র নয়, নিরীহ প্রাণী) মানুষের একের পর বাসভূমি, রাস্তা, ফসলি জমি তৈরি; বনজ সম্পদের খুব বেশি আহরণ, তাদের ভুবনে মানুষের সংখ্যা বাড়ানো, অপরিকল্পিত ও নির্বিচারে পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিতভাবে তাদের পানির জোগান, বনের নদীতে বাঁধ তৈরি বাংলাদেশি হাতিকে বিলুপ্ত করে দিচ্ছে।

n বনের পরিবেশে বেঁচে থাকা হাতির জন্য এখন সবচেয়ে প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ, প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক চারণভূমি ও হাতিবান্ধব বনাঞ্চল গড়ে তোলা; বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্রমাগত অবক্ষয়ের কারণে মানুষ ও হাতির মধ্যে চলমান বিরোধ সম্পূর্ণ নিরসন করা সম্ভব নয়। শুধু উপযুক্ত কৌশলের যথাযথ প্রয়োগ করে সমস্যাটির ব্যাপকতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। মানুষ হিসেবে আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই জীববৈচিত্র্য এবং প্রাণিকুল রক্ষায় আরও মনোযোগী হওয়া জরুরি, আন্তরিক প্রেম বাড়ানো প্রয়োজন। এবং জনসচেতনতা।

n বনজসম্পদ উজাড় করে, পাহাড় খালি করে বন্যপ্রাণীসহ হাতির খাবারের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। পাহাড়ে খাবার সংকট হচ্ছে সব প্রাণীর, বন উজাড় ও নিরাপদ আশ্রয় না থাকায় হাতির পাল লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। ফলে চট্টগ্রামসহ সারা দেশের পাহাড়ি এলাকার পাশের উপজেলাগুলোতে বন্যহাতির পাল খাবারের খোঁজে, জীবন বাঁচাতে আসতে বাধ্য হচ্ছে।

n অপরিচিত পরিবেশে, অচেনা প্রাণিকুলের কাছে তাদের কাজগুলো হয়ে যাচ্ছে তাণ্ডবের মতো। অথচ তারা খুব শান্ত। খাবার খুঁজতে গিয়ে মানুষের হাতে মারা পড়ছে। মানুষও তাদের মাধ্যমে খেয়াল না রেখে চলায় মারা যাচ্ছেন। মানবসম্পদের অনেক ক্ষতিও হচ্ছে।

n চট্টগ্রাম বিভাগের দক্ষিণের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে যেখানে একসময় পরিচিত ও প্রিয় ভুবন ছিল, হারিয়ে যাওয়ায় লোকালয়ে চলে এসে হাতির উপদ্রব ভয়াবহভাবে বাড়ছে।

n মানুষের হাতে অনেক হাতি মারা যাচ্ছে।

n বন বিভাগের বাহিনীগুলো শত চেষ্টা করে হাতির দলগুলোকে বনে খাবারের জোগান দিতে না পেরে ওখানে ওদের তাড়াতে হিমশিম খাচ্ছে।

n বন বিভাগ জানিয়েছে, দক্ষিণ চট্টগ্রামে সরকারিভাবে দুটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রয়েছে। একটি চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, অন্যটি হলো বাঁশখালী উপজেলার জলদি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য।

n এ দুটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য থেকে দলছুট হাতির পাল জেলার লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, কর্ণফুলী ও আনোয়ারা উপজেলার লোকালয়ে নেমে আসছে।

n কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বোয়ালখালী ও পটিয়া উপজেলার লোকালয়েও ঢুকে পড়ছে বন্যহাতির পাল। তারা খাবারের খোঁজে অন্য জায়গাগুলোর মতো এসব স্থানের লোকালয়ে আসে। কদিন পরে থাকতে না পেরে আবার পুরনো বনে ফিরে যাচ্ছে।

n বন্যহাতির পালও যে পথে আসছে, সে পথেই ফিরে যাচ্ছে। দলছুট হাতির পাল কখনো দুটি আবার তার বেশি সংখ্যাও দেখা যাচ্ছে। এতই কমে গিয়েছে তাদের সংখ্যা। অথচ কারোরই কোনো নজর নেই। হাতিগুলো চলাচলের পথে বাধা পেয়ে বা মানুষের আঘাতের শিকার হয়ে অসহায় হয়ে ছোটাছুটি বা এদিক সেদিকে গিয়ে পৌঁছে। তখন তাণ্ডব শুরু হয়।

n ফলে বসতবাড়ি ভাঙচুর, ধানসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল নষ্ট হচ্ছে। মানুষ মারাও পড়ছেন।

n চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলার লোকালয়ে এখন প্রায়ই নেমে আসছে হাতির দল। খাবারের খোঁজে তছনছ করছে মানুষের আবাস।

n হাতির আক্রমণে গত ১৬ বছরে সারা দেশে প্রাণ গিয়েছে ৬৪ জন মানুষের।

n হাতি ও বন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের থাকার জন্য নির্বিচারে বন কাটা, চট্টগ্রামের সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন তৈরি, হাতির অভয়ারণ্যে মানুষের আক্রমণ বেড়ে যাওয়ায়ও তারা লোকালয়ে না বুঝে ঢুকে পড়ছে।

n সরাসরি মানুষের আক্রমণের শিকার হচ্ছে অবলা প্রাণী হাতি। গত ১৬ বছরে নানা কারণে মারা গেছে এমন ৬১টি বন্যহাতি। প্রাকৃতিক ও বার্ধক্যে ৩০টি, দুর্ঘটনায় ২২টি এবং মানুষের হাতে নয়টি হাতি মারা গিয়েছে।

n ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)’র তথ্য মতে, মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব যত বাড়বে, তত ঘটবে তাদের প্রাণহানি। মানুষের ওপর আশ্রয় করে বেঁচে থাকে বলে হাতিই চলে যাবে দুনিয়া ছেড়ে। বিলুপ্ত হয়ে যাবে ‘ফরেস্ট ইঞ্জিনিয়ার’।

n দীর্ঘদিন হাতি নিয়ে গবেষণা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক এ এইচ এম রায়হান সরকার। তার গবেষণা বলে, ‘হাতি দলে ঘুরতে ভালোবাসে। বন নেই বলে তারা এখন সংরক্ষিত বনে থাকে। এই বনও কেটে নানা ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, তাদের রুটে (হাতির চলাফেরার পথ) মিয়ানমার সরকারের মাইন পুঁতে রাখা, খাবারের সংকট তৈরি করা ও নানাভাবে প্রবল খেপিয়ে মানুষ তাদের মেরে ফেলছে। মানুষ তাড়িয়ে নিয়ে আসছে লোকালয়ে। এরপর হাতি ও মানুষের সংঘাত; প্রাণ যাচ্ছে।’

n তার মতে, ‘চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে মানুষ হাতির আবাসের ক্ষতি করছে। ফলে তারা এখন চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী, আনোয়ারা, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, এমনকি পাহাড়ি পথ ধরে পটিয়া, বোয়ালখালী উপজেলা পর্যন্ত চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে।’

n লোহাগাড়া উপজেলায় এখন হাতি আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন চুনতি, কলা উজান ও চরম্বা ইউনিয়নের ৫০ হাজারের বেশি মানুষ।

n ২০১৯ সালের ৮ নভেম্বর লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের চুনতি অভয়ারণ্যের পাশের পানত্রিশা গ্রামের পাকা আমন ধান খেতে কাদায় আটকে যায় একটি বন্যহাতি। ফলে দল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। হাতিটি পা গ্যাংগ্রিনে (পচনশীল ঘা) আক্রান্ত ছিল। দুদিন পর ১০ নভেম্বর ওভাবে পড়ে থেকে থেকে হাতিটি অবহেলা ও বিনাচিকিৎসা এবং উদ্ধারের অভাবে মারা গিয়েছে। 

n হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের বন বিভাগের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উপজেলার হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তদের। মৃত প্রতি ব্যক্তির পরিবারকে এক লাখ, আহতদের ৫০ হাজার করে এবং বাড়িঘর হারানো পরিবারপ্রতি ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়।

n বিভাগীয় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ, চট্টগ্রাম’র বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াসিন নেওয়াজ বলেছেন, ‘‘ফরেস্ট ইঞ্জিনিয়ার’ হাতি যেখানে থাকে, সেখানে বনভূমি ভালো থাকে। হাতি কমে গেলে বন ও পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়।’’

n তার মতে, ‘১০ বছর আগে হাতি লোকালয়ে আসত বছরে হাতেগোনা দুই, তিনবার। কিন্তু গত দুই বছর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন লোকালয় এলাকায় হাতি এসেছে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ বার। নানা কারণে বন্যহাতির অবাধ বিচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইদানীং আরও বেড়েছে। অবাধে বনজসম্পদ ধ্বংসসহ বন ও পাহাড় দখল করে বসতবাড়ি, শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হচ্ছে। বন্যহাতির অবাধ বিচরণের যে ১২টি করিডোর রয়েছে তাতে হাতি চলাচলে নানাভাবে বাধা পাচ্ছে। তাই তারা লোকালয়ে আসছে। হাতির আবাস নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের বনায়ন করা হচ্ছে। লোকালয় হাতির আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে ‘এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম’ করা হয়েছে। বনকর্মী ও গ্রামবাসীদের নিয়ে ৩০ থেকে ৫০ জনের টিম যেখানে হাতি নামে সেখানে তারা হাতি যেন মানুষের ক্ষতি না করে সেজন্য রাতে পাহারা দেন।

n তিনি বলেন,  ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের ফলে যাতে বন্য হাতির চলার পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি না হয়, সেজন্য চট্টগ্রাম রেলওয়েকে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। তারপরও হুমকির মুখে হাতির আবাস। কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের জন্য নির্বিচারে বন কাটা হাতির স্বাভাবিক চলাফেরায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।’

n তার হিসেবে, ‘দেশে ২৮০ থেকে ২৯০টি বন্যহাতি আছে। প্রতিটি হাতির বাঁচতে দিনে গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ কেজি খাবার লাগে। বনসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় হাতির খাদ্য সংকট খুব বেশি। হাতি এক বন থেকে অন্য বনে যেতে এখন পদে পদে বাধা পাচ্ছে। ফলে এসব লোকালয়ে চলে আসছে।’

n ২০১৭ সাল থেকে এই পর্যন্ত চট্টগ্রাম বনাঞ্চলের হাতিগুলো বারবার পাহাড় ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসছে।

n বন্যপ্রাণী গবেষকদের মতে, তিনটি কারণে বন ছেড়ে হাতি লোকালয়ে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে। সেগুলো হলো– মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আবাস তৈরির জন্য কক্সবাজারের ‘হাতির অভয়ারণ্য টেকনাফ’র  বন ও জঙ্গল কেটে সাফ করা হয়েছে। ফলে হাতির আবাস ও চলার পথ হারিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ায় ও মিয়ানমারে সেখানে স্থলমাইন স্থাপনে হাতির পাল মিয়ানমারে যেতে পারছে না। সেসব বন-জঙ্গলে খাদ্যের প্রচণ্ড অভাব দেখা দিয়েছে।

n ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজার্ভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) বলে, দেশে হাতির সংখ্যা ১৯৬ থেকে ২২৭টি।

n ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ডের গবেষণায় বাংলাদেশে বন্যহাতির সংখ্যা ২৩৯টি। পরিচিত বনের পথ ধরে খাবার খেতে খেতে বছরে ৮০ থেকে ১০০টি হাতি ভারতের আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা রাজ্য থেকে বাংলাদেশে বিচরণ করতে আসছে।

n চট্টগ্রামের চুনতি ও জলদি অভয়ারণ্যের হাতিও চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমারে চলাফেরা করে, কিন্তু সীমান্তে নানা কড়াকড়ি তাদের স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে দিচ্ছে না। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আবাস তৈরি করতেও তাদের পথ নষ্ট করা হয়েছে।

n প্রাণিবিদদের মতে, হাতিদের পাহাড়ে থাকার পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারলে, খাবার ও জীবনের চাহিদা মেটাতে না পারলে ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ের আশপাশের উপজেলাগুলোর এলাকাগুলোতে তারা ও মানুষ মারা যাবেন আরও বেশি। এমন সব জায়গায় তারা চলে আসবে যেগুলো তাদের অচেনা।

n হাতির আক্রমণে মানুষের মৃত্যুর জন্য সনাতন পদ্ধতিতে (ঢোল পিটিয়ে) হাতি তাড়ানো, কৌতূহলীদের অতি উৎসাহী আচরণ ও মানুষের সচেতনতার অভাবকে দায়ী করেছেন পটিয়া বন রেঞ্জের কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম।

[প্রচ্ছদের ছবিটি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বটতলি গ্রামের জ্ঞান পাহাড় থেকে তোলা]