দাউ দাউ আগুনে পুড়ে গেল বাউনিয়া বস্তি

তীব্র শীতে খোলা আকাশের নিচে দুই শতাধিক মানুষ

রাজধানীর মিরপুরের কালশীর বাউনিয়া বস্তিতে আগুনে অন্তত ৪০টি বসত ঘর ও ২০টি দোকানঘর সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। তবে এতে কোন প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত একটায় আগুন লাগার পর রাত দুইটায় নিয়ন্ত্রণে আসে এবং শুক্রবার ভোর ছয়টায় আগুন সম্পূর্ণ নেভানো সম্ভব হয়। ঘরবাড়ি হারিয়ে তীব্র শীতে দুই শতাধিক মানুষ এখন খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন।

ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণকক্ষের কর্মকর্তা রাসেল শিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাত একটা ফায়ার সার্ভিসের ১১টি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে এবং রাত ১ টা ৫০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের গোলযোগ বা শর্টসার্কিট থেকে লাগা আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে প্রায় ১২ লাখ টাকার ক্ষতি ও ২০ লাখ টাকার সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। আগুনে ৪০টি বসত ঘর ও ২০ ভাঙারি দোকান পুড়েছে।

ঘটনাস্থলে স্থলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, ধোঁয়ায় এক ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। আগুনে কোন প্রাণ হানি হয়নি। আগুন লাগার পরই বস্তিবাসীরা দৌড়ে বেরিয়ে যায়। কয়েকটি গরু ও হাঁস-মুরগি আগুনে মারা গেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের পুলিশের উপকমিশনার মোস্তাক আহমেদ বলেন, আগুন লাগার খবর পেয়ে পুলিশও ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। তারা ফায়ার সার্ভিসকে সহায়তা করে। আগুন লেগে বস্তিবাসীদের দুটি গরু মারা গেছে।

বস্তির এক বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, বেড়িবাঁধের কাছে গড়ে ওঠা বস্তিটিতে আগুন লাগার পর যে যার মতো ছুটে বের হয়ে গেছে। এখন এসব মানুষ খোলা আকাশের নিচে। অনেকের গরম কাপড় নেই। এই শীত আর বৃষ্টির মধ্যে শিশুদের কষ্ট সবচেয়ে বেশি। তার দাবি বস্তিতে বিদ্যুতের সংযোগটি ছিল অবৈধ।

সুমন নামে এক বাসিন্দা বলেন, কে কখন কীভাবে বের হইছে ঠিক নাই। সব হারায়ে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির রাতেই এখন খোলা আকাশে নিচে থাকতে হচ্ছে। রবিউল নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, সামনেই ছিলাম, আগুন দেখার পর বাইরে আসছি। কিন্তু কিচ্ছু আনতে পারি নাই। শুধু জানডা নিয়া দৌড় দিছি। নান্নু মিয়া নামে আরেকজন বলেন, রাতে ঘুমাইছিলাম। হঠাৎ দোকানদার আকতার মিয়ার চিৎকার শুনে বাইরে এসে আগুন আর ধোঁয়া দেইখা দৌড় দিছি। আগুনে পুড়ে সব শ্যাষ। এখন কোথায় যাব, কই থাকব কিচ্ছু জানি না।

বাবা-মার সঙ্গে ধ্বংসস্তুপ থেকে পুড়ে যাওয়া কয়লার ভেতর নিজেদের পোড়া হাঁড়িপাতিলসহ বিভিন্ন জিনিস খুঁজছে ৫ বছরের জুম্মান। পুড়ে কালো হওয়া কয়লার স্তূপ থেকে একটি চামচ টেনে তুলছিল জুম্মান। এতেই যে যেন অনেক খুশি। জুম্মানের মা জানান, ‘তারা বরিশালের নদী শিকস্তির শিকার হয়ে ঢাকায় এসেছেন। স্বামী ভাঙারির ব্যবসা করতেন। তার দোকান পুড়েছে, ঘর পুড়েছে। ঘরের টিভি, খাট, কাঠের আলমারি সবই পুড়েছে। এমনকি ছেলে মেয়েদের শীতের পোশাকও পুড়েছে। আগুন তাদের একেবারে নিঃস্ব করে দিয়েছে। এখন কোথায় যাবেন কি করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। এই অবস্থায় তারা সরকারের কাছে সাহায্যের আবেদন করেছেন। জুম্মানদের মতো একই অবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত বাকি বস্তিবাসীর। এক রাতের ব্যবধানেই খোলা আকাশের নিচে ঠাঁই হয়েছে হতভাগ্য এসব মানুষের।

বস্তির বাসিন্দা এনায়েত বলেন, বস্তিটিতে ৮০টির মতো দোকানসহ তিন শতাধিক ঘর রয়েছে। নিচে খাল। খালের ওপর অধিকাংশই কাঠের টং ঘর ও টিনের ঘর বানানো। ছোট ছোট প্রতিটি ঘরে বসবাস ছিল দুই থেকে পাঁচজন করে মানুষ। বাসিন্দাদের অধিকাংশই রিকশা-ভ্যানচালক। কেউবা ভাঙারির ব্যবসা করেন, ফেরি করে প্লাস্টিক সামগ্রী ও পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করেন। আগুনে দোকানসহ ঘর পুড়েছে দুই শতাধিক।

সেলিম নামে বস্তির এক বাসিন্দা বলেন, একটি ভাঙারির দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত। আশপাশের একাধিক দোকানে রয়েছে প্লাস্টিক সামগ্রী। যে কারণে দ্রুতই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু দুঃখজনক হলো প্রায় এক ঘণ্টা দেরিতে আগুন নির্বাপণে আসে ফায়ার সার্ভিস। আবার আধা ঘণ্টা পরই পানি শেষ হয়ে গেলে আগুন বেড়ে যায়।

রাত সোয়া ২টার দিকে ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক সালেহ উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, সর্বোচ্চ চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।

শুক্রবার সকালে স্থানীয় সংসদ সদস্য (ঢাকা-১৬ আসন) আলহাজ মো. ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। সেখানে তিনি বলেন, আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হবে। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, রাতে থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে স্থানীয় আরমান স্কুলে। গরম কাপড়ের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। সকালের খাবারের ব্যবস্থাও করা হবে। যত দিন পর্যন্ত তাদের পুনর্বাসন না হয় তত দিন তাদের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি।