বঞ্চিতের পড়ায় ভালোবাসা জাগিয়েছেন

আনুষ্ঠানিক, ঝরেপড়া, বাড়িতে কাজ করা, আদিবাসী, ভঙ্গুর, বিদেশি, যুদ্ধে আক্রান্ত, অন্ধকার– সবখানেই শিক্ষার আলো নিয়ে গিয়েছেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। তার শিক্ষায় অসাধারণ অবদানকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ওমর শাহেদ 

স্যার ফজলে হাসান আবেদের অবদান লেখাপড়ায়, এ ক্ষেত্রে ব্র্যাকের পথপ্রদর্শক হয়ে তাদের কাজে। বেসরকারি একটি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান; যেটি নিজে প্রতিষ্ঠা করেছেন, ধারাবাহিক নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৭২ সালের শুরুর দিকে ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করেন, সাহায্য ও পুনর্বাসন প্রকল্প হিসেবে বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামে, যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভের বছরখানেকে; তখন সাক্ষরতার হার শতকরা ২০ জনেরও কম। পরে দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে, বাংলাদেশ শিক্ষাসুবিধা, সাক্ষরতা এবং লেখাপড়ার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্য উন্নতি করেছে। প্রায় সব শিশুই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। গরিব দেশগুলোর মতো লিঙ্গবৈষম্যও এই সমাজে দারুণ; লেখাপড়ায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র ও ছাত্রী হিসেবে ছেলে-মেয়েদের লিঙ্গবৈষম্য উচ্ছেদ হয়েছে। সরকারি, বেসরকারি পাশাপাশি প্রচেষ্টায় সেখানে ব্র্যাকের অবিশ্বাস্য, প্রধান ভূমিকা আছে। প্রতিষ্ঠানের মাটিসংলগ্ন শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে, যেগুলো স্যার ফজলে হাসান আবেদের মস্তিষ্কপ্রসূত ও দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় ফলবান হয়েছে; তার মাধ্যমেই প্রধানত এ উন্নয়ন ঘটেছে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে হঠাৎ তার হানা দেওয়ার শুরু থেকেই শিক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানবজীবন ও সমাজের পরিবর্তনকারী অনুঘটক হিসেবে যৌবনকাল থেকে বিবেচনা করেছেন, কর্মে প্রকাশ ঘটিয়েছেন। নানার কাছ থেকে লেখাপড়া শিখেছিলেন, সে শিক্ষা আজীবন তাকে আলো ও পথ দেখিয়েছে। জীবনব্যাপী উদ্দীপনাও তার কাছে নিয়েছেন। তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রী। নাতি আরও শিক্ষিত হয়েছেন। আলোকিত কর্মবীর নিজের শিক্ষা ধারণায় প্রভাবিত হয়ে সেই জ্ঞান বাস্তবায়ন করেছেন, পেয়েছিলেন যা ব্রাজিলের শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরির কাছে। ব্র্যাকের ত্রাণ ও পুনর্বাসন পরিচালনা কার্যক্রমের মাধ্যমে জন্মলগ্নের পর পরই উপলব্ধি করলেন, দেশের চিত্র দেখে মনে হলো, এই দেশে স্থায়ী ও টেকসই উন্নয়ন চেষ্টা প্রয়োজন। ১৯৭২ সালেই ব্র্যাক তাদের পুরনো কাজ থেকে সরে এলো, দীর্ঘদিনের জন্য সামাজিক উন্নয়নকর্ম শুরু করল। স্বাভাবিকভাবেই কাজের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হলো ‘শিক্ষা’। তার একেবারে প্রথম উন্নয়ন পরিকল্পনায় ব্র্যাক চেয়েছিল, লক্ষ্য স্থির করেছিলেন, দেশের সব গ্রামের বয়স্ক মানুষকে সাক্ষরতা দেবেন। এই খাতে কাজ করবেন বলে ঠিক করলেন। পরে বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো থেকে ঝরেপড়া সব ছাত্র-ছাত্রীকে আবার বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনতে তারা কাজ শুরু করলেন, কিন্তু স্যার ফজলে হাসান আবেদ এরপর বুঝতে পারলেন, শিক্ষা বা লেখাপড়া বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা বা সেখানে পড়ার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। বইয়ের চেয়েও বেশি ক্ষমতা জীবনের, মানুষের শেখার। ফলে নিশ্চিত করলেন, আনুষ্ঠানিক বা কার্যকর শিক্ষার জন্য মানুষগুলোকে নিচের দিক থেকে ঘিরে ফেলা হবে ব্র্যাকের নামের সংগঠনের মূলনীতি। সেভাবেই মাঠে নামলেন। শুরুতে বয়স্ক মানুষের মধ্যে লেখাপড়ার জন্য সচেতনতা তৈরি এবং তাদের সাক্ষরতা জ্ঞান দান করা ও অংক বা সংখ্যা শেখানোর জন্য ফজলে হাসান আবেদের ব্র্যাক নিজেদের শিক্ষা উন্নয়ন উপকরণ তৈরি শুরু করল। তখন পোস্টার আকারেই ছিল। ফ্লিপ চার্টও ছিল। আরও নানা কিছুও যুক্ত হলো দিনে দিনে। ১৯৭০ দশকে ব্র্যাক ধারাবাহিক কার্যক্রমের মাধ্যমে নিজেরাই সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে পারল। সেখানে যুক্ত ছিল লেখাপড়ার মাধ্যমেই সমাজের উন্নয়ন কর্মসূচি, তাদের সাক্ষরতা প্রদান ও সংখ্যাভিত্তিক পূর্ণ পাঠ্যক্রম। তারা পাঠ্যক্রম, শিক্ষক ও মাঠকর্মী এবং কর্মকর্তা সবার জন্য ধাপে ধাপে কাজের মাঝে প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও প্রকাশনার ব্যবস্থা শুরু থেকে রেখেছেন। তবে বয়স্কদের জন্য যে কার্যকর ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা কার্যক্রম তাদের আছে– সেটি ‘উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা’; পুরো দেশের মধ্যে ছড়িয়ে যাওয়া ও ঝরেপড়া, লেখাপড়ার বাইরে থাকা ছাত্র-ছাত্রী ও মানুষদের বিরাট সংখ্যাকে কার্যকর ও স্থায়ীভাবে শিক্ষা প্রদান করতে পারছিল না স্বাভাবিকভাবেই। ফলে আবেদ নামের অসাধারণ ও বিশ্বসেরা উন্নয়নকর্মীর বিশ্বাস জন্মাল, প্রাথমিক শিক্ষা নেওয়ার উপযুক্ত সব শিশুর লেখাপড়া শেখানো নিশ্চিত করতে হবে।

১৯৭৪ সালে ব্র্যাক শুরু করল এ ক্ষেত্রে কাজ। প্রথমে তারা মাসিক ম্যাগাজিন চালু করলেন; তাদেরই শিক্ষাকর্মীদের লেখা– যেটি বাংলাদেশের মোট ৪৫ হাজার বিদ্যালয়ের সবগুলোতে বিক্রি হতো, কিন্তু দারিদ্র্য, দূরত্ব, দুর্গমতা, দুর্নীতি এবং দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থা বিরাট এক অংশ ছেলেমেয়েকে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে দূরে সরিয়ে রাখল। তবে সে-সবের বিপক্ষেও লড়াই করেছেন ব্র্যাকের প্রাণপুরুষ ও কর্মীরা। ১৯৮৫ সালে ধারাবাহিকতায়– ফজলে হাসান আবেদ অনানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু করলেন। চেয়েছিলেন, হাতে-কলমে কাজ করে দেখাবেন, লেখাপড়া মানুষের জীবনের সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ, খরচ কমানোর জন্য, মান থাকে সুউচ্চ; ছাত্র-ছাত্রী ধারণ ক্ষমতা দিনে দিনে বাড়ে; উন্নয়ন ঘটে সবার। লিঙ্গবৈষম্যের বিপক্ষে কার্যকর লেখাপড়াটির মাধ্যমে দেশের নানা দুর্দশার চিত্রও উঠে আসে। পরীক্ষাগুলো আলোতে নিয়ে এসেছে তার শিক্ষা প্রকল্পটি। এজন্য ও পরেও তিনি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষাবিদদের খুঁজে বের করে কাজে যুক্ত করেছেন। তাদের সবার প্রচেষ্টায় বৈপ্লবিক মডেল হয়ে গেল সেই ক্লাসরুম। এক রুমের ক্লাসরুম ৩৩ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে এক শিক্ষকের অধীনে একটানা পাঁচ বছর প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করল। বিদ্যালয়ে আছে বিক্রয়যোগ্য শিক্ষা উপকরণ এবং শিক্ষাক্রম অসাধারণ। দেশের নানা জ্ঞানে ভরা, সেগুলোতে মা-বাবা দুজনেরই শক্তিশালী ও কার্যকর উপস্থিতি আছে। ফলে পরিবারের বন্ধন ও শিক্ষা আরও দৃঢ় হয়।

তিনি সবসময় নারীর মর্যাদা ও শক্তিতে বিশ্বাস করেছেন। একেবারে গরিব অবস্থায় বাস করা নারীর প্রতিও তার পূর্ণ আস্থা অবিচল সারা জীবন; ব্র্যাকের কার্যক্রমেও ছড়িয়েছেন দেশে, দেশে। জানতেন তারা এই শিক্ষা পরিবর্তনেও বৃত্তাকার বা ঘুরে আসা পরিবর্তনকারী হতে পারেন। বুঝতে পেরেছিলেন, বালিকাদের শিক্ষিত করা কেবল তাদের সক্ষম করে তোলাই নয়, অবস্থার উন্নতিতে ভূমিকা রাখাও। তাদের পরিবারগুলোকে সমাজে আরও ভালো থাকা নিশ্চিত করা, সমাজেরও উন্নয়ন করা। শিক্ষা তাদের ভবিষ্যৎ পরিবার, তারা সেটির প্রধান সূচনাকারী ও ধারক, শিক্ষায় সবার কল্যাণ হয়। শিক্ষিত নারী আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। পরিবার পরিকল্পনা, সন্তান শিক্ষিত করার ক্ষেত্রেও মায়ের ভূমিকা অসীম। নিজের সন্তানের স্বাস্থ্যযত্নেও ভালো ভূমিকা রাখেন। ফলে ব্র্যাকের সব উদ্যোগে, লিঙ্গ প্রয়োজনীয় উপাদান; তাদের শিক্ষা কার্যক্রমেও লিঙ্গসমতা আছে প্রথম থেকে।

ব্যাপক ও ধারাবাহিক পড়ুয়া ছিলেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। এই শিক্ষা ও জীবনভর জ্ঞান আহরণই তাকে উন্নয়নের ক্ষেত্রগুলোতে নতুন সব ধারণার প্রবর্তন ও সাম্প্রতিক বিষয়গুলোতে কার্যকর করে তুলেছে। নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড এবং ইংল্যান্ডের শিক্ষাবিদদের কাছেও তার শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বেগবান এবং কার্যকর করতে পৌঁছেছিলেন। তাদের মাধ্যমেও ব্র্যাকের বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা উপকরণ তৈরি করেছেন। সারা দেশে, পৃথিবীতে ছড়িয়েছেন। ব্যাপ্তির বড় ও শক্তিশালী সমর্থক ছিলেন। বলতেনও, ‘ছোট হলো সুন্দর, কিন্তু বড় হলো প্রয়োজনীয়।’ ফলে পাইলট বিদ্যালয়গুলো, যেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেল ১৯৮৭ সালে; সেগুলোকে এবার তাদের সফল করতে হবে। তিনি ও তার দল সংখ্যা বাড়ানোর কাজে নামলেন। মাত্র পাঁচ বছর পরেই, ব্র্যাক প্রায় ২০ হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে নিজের শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত করে ফেলল। সবাই আনুষ্ঠানিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়েছিল। ১৯৯০ দশকের মাঝে ব্র্যাকের ছিল ১৯ হাজার বিদ্যালয়। সেগুলো থেকে তার বিখ্যাত ‘গ্রাজুয়েশন’ লাভ করেছে বাংলাদেশের ৫ লাখেরও বেশি ছাত্র-ছাত্রী। এরপর এই স্কুল কার্যক্রম হুবহু নকল করা হলো আফ্রিকাতে। পিছিয়ে থাকা মহাদেশও আলো লাভ করতে লাগল ফজলে হাসান আবেদের আলোয়। ব্র্যাকের গ্রাজুয়েটদের মূল অংশ বা বেশিরভাগ গ্রাজুয়েট এরপর উচ্চ লেখাপড়ার জন্য দেশের উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে প্রবেশ করতে লাগলেন। সরকারি লেখাপড়ার আওতায় এলেন। তবে তাদের কিছু অংশ, বেশিরভাগ মেয়ে–কিছু সামাজিক বাধায় লেখাপড়ায় আর থাকতে পারলেন না। প্রধান সমস্যা ‘বিয়ে’। এই কিশোরীদের জন্য, ফজলে হাসান আবেদ ধারাবাহিক শিক্ষা কার্যক্রম আবিষ্কার করলেন। যেটি চারদিক থেকে আবার সেই ঘিরে ফেলার কাজে নামল। এবার তাদের লক্ষ্য সামাজিক বা পাড়ায় পাড়ায় স্থাপিত গ্রন্থাগার। সেগুলোতেও পৌঁছালেন তারা সফলভাবে। তাতে ‘কিশোর-কিশোরী পড়ার ঘর’ গড়ে তুললেন। মেয়েরা পড়ার সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ পেলেন। বই ও শিক্ষা উপকরণ কাছে থাকল। পরে সেগুলো হয়ে গেল তাদের আনুষ্ঠানিক পড়ালেখার কেন্দ্রভূমি, ব্র্যাকের মাধ্যমে। তাদের ক্ষমতায়নও করা হলো নানা কার্যক্রমে।

তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তরুণদের শক্তিকে উৎপাদন, কার্যকারিতায় ব্যবহার করতে হবে। কেবল পিছিয়ে পড়া বা বঞ্চিত পরিবারগুলো থেকেই নয়, উচ্চ শ্রেণির ছেলেমেয়েদেরও এ কর্মে যুক্ত করতে হবে। ফলে তার নির্দেশনায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করল। তাদের লক্ষ্য, জাতীয় পর্যায়ে ‘কার্যকর উচ্চ শ্রেণি’ তৈরি। পরে এ কাজের প্রয়োজনীয়তায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় পোস্ট-গ্রাজুয়েট গবেষণা কেন্দ্র ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং আরও কটি ইনস্টিটিউট জাতীয় উন্নয়নের নানা ক্ষেত্রে অবদানে সক্ষম মানব সম্পদ সৃষ্টিতে বানিয়েছে। সবসময়ই স্যার ফজলে হাসান আবেদের লক্ষ্য ছিল, ব্র্যাকের বিদ্যালয়গুলো শিক্ষালাভের অস্থায়ী কেন্দ্র হবে। পরে শিক্ষার্থীরা সরকারি লেখাপড়ায় যুক্ত হবেন। তার প্রকাশ্য ও লিখিত অঙ্গীকারই গভীরভাবে ছিল আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি। এজন্য ১৯৯৭ সালে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুললেন, যাতে শিক্ষিত পরিবারগুলোর বাড়ির কাজের ছেলে-মেয়েরা পড়ালেখা শিখে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় যেতে পারেন। এর আগে প্রাক-প্রাথমিক লেখাপড়া ধারণা বাংলাদেশের উচ্চ শ্রেণির জন্য আলাদা করা ছিল। তারপর থেকে দেশের সরকার ব্র্যাকের শিক্ষা উন্নয়ন কার্যক্রমে জোরালভাবে যুক্ত হলো। ১৯৯৭ সালে ব্র্যাক সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসকদের মানোন্নয়নে শিক্ষা এবং ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম শুরু করল। অস্বাভাবিক, বিপর্যয়ে থাকা সমাজের ছেলে-মেয়েদের জন্য তাদের সমাজেই প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু করল ১৯৯৯ সালে। ২০০২ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে একাগ্র চিত্তে ব্র্যাকের পুনর্বাসন কাজ করতে থাকা ফজলে হাসান আবেদ প্রথম কার্যকর আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্র ছড়ালেন আফগানিস্তানে। সেখানেও তাদের কর্মের অন্যতম ছিল শিক্ষা, বিশেষত মেয়েদের। এখন ৭০ হাজারের বেশি ছাত্র-ছাত্রী আফগানিস্তানে ব্র্যাকের স্কুলগুলোতে পড়ছেন। ৮৫ ভাগই মেয়েশিশু। খরচ কমিয়ে আগের সফল প্রকল্পকে আরও কার্যকর করতে তিনি নামতেন। তাতে নব উদ্ভাবনা যুক্ত হতো। শিক্ষা ব্যবস্থায় তারা দুই ভাষা (মাতৃভাষা ও ইংরেজি) শিক্ষায় জোর দিয়েছেন সবসময়, আদিবাসী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য তাদের ভাষার শিক্ষা উপকরণ তৈরি করেছেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছেলেমেয়েদের তাদের বিদ্যালয়ে এনেছেন। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। সমাজের বিশেষ সমস্যাগুলোতে তুলে এনে সমাধান করেছেন। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও জ্ঞান যুক্ত করেছেন। সবসময় উদ্ভাবন যেকোনো ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য যুক্ত করেছে ব্র্যাক শিক্ষা ব্যবস্থায়। তাদের কম্পিউটার নির্ভর শিক্ষা আছে, নানা ভাষায় পড়ান, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন ও তত্ত্বাবধান হয়। পুরো ব্যবস্থাটি নিজেদের ও সহযোগীদের শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। ফলে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের মতো ব্যাপকহারে, মানসম্পন্নভাবে, কার্যকর উপায়ে শিক্ষাদান প্রকল্প করতে পারে না। এশিয়া, আফ্রিকা এবং প্রশান্ত-মহাসাগরের ১০টি দেশে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম বাইরে ছড়িয়েছে। ফলে ব্র্যাক হয়েছে সারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেগুলোতে ৩৫ হাজারের বেশি স্কুল আছে প্রাথমিক শিক্ষার। ১০ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর, ৬৫ ভাগের বেশি মেয়ে। প্রায় ৫০ লাখ ছাত্র-ছাত্রী গ্রাজুয়েট হয়েছেন ব্র্যাকের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ৬৫ ভাগ নারী। মোট শিক্ষার্থীর ৯৫ ভাগের বেশি আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নিতে উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন। বাংলাদেশে ২০১০ সালে সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রাথমিক শিক্ষা পরীক্ষায় ব্র্যাকের ৯৯ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রী পাস করেছেন। সরকারি বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের ১৫ শতাংশ বেশি। তবে অন্য সব শিক্ষাব্যবস্থা– যেখানেই আছে, তাদের সঙ্গে ব্র্যাকের পার্থক্য– তারা পড়ার খরচ কমান। দেশে তাদের চার বছরের প্রাথমিক শিক্ষায় প্রতি শিশুর পেছনে খরচ হয় ২, ৫, ৪৬ টাকা (৩০ ইউএস ডলার)। তারা শিশুর জীবনের শুরু, কিশোর-কিশোরীদেরও পড়ায় যুক্ত করেন। প্রায় ১ কোটি মানুষ ব্র্যাকের নানা ধরনের শিক্ষা কার্যক্রমে উপকার পেয়েছেন, জীবন বদলেছেন। সবই তার দূরদর্শিতা ও নির্দেশনায়। স্যার ফজলে হাসান আবেদ সব সাফল্য সম্ভব করেছেন। তাদের বেশিরভাগ কাজের উৎস, দুর্দান্ত নির্দেশনা, নিজের ও দলের মতো নিষ্ঠাবান সহযোগী প্রতিষ্ঠান নিয়ে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করেছেন অনেকটাই একা। সবচেয়ে খুশি হয়েছেন, যখন বিশ্বের লাখ লাখ বঞ্চিত ছেলে-মেয়ের বুকে লেখাপড়ার প্রতি ভালোবাসা জাগাতে পেরে; পরের জীবনে ও সারা জীবনে তারা এই ভালোবাসা বয়ে চলেন ও সফল হন সর্বক্ষেত্রে।

(ব্র্যাক.নেট থেকে