২০১২ সালে এশিয়া ফাউন্ডেশন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে সফররত ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। আলমা ফ্রিম্যানের সেই সাক্ষাৎকারের প্রাসঙ্গিক অংশ–অনুবাদ করেছেন রানা মিত্র
বাংলাদেশ অন্যতম ঘনবসতিময়, জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন একটি মাতৃভূমির জন্য উদ্বিগ্ন হন?
অবশ্যই। বাংলাদেশ খুব নিচু, সমতল মাটির দেশ। সাগরের জলের উচ্চতা কয়েক মিটার বাড়লেই আমার দেশের তিনভাগের একভাগ প্লাবিত হবে। মানে দেশটি আরও ছোট হয়ে যেতে পারে। এখন যে অবস্থায় আছে তার চেয়ে আরও ঘনবসতি হয়ে যাবে। এখনই অবস্থা এমন– দেশের এমন কোনো জায়গায় যেতে পারবেন না, যেখানে মানুষ দেখতে পারবেন না। এই দেশের জনসংখ্যা এখনো বাড়ছে। মনে করি, ২০১৬ সাল পর্যন্ত জনসংখ্যার দিক থেকে বাড়তে থাকব। জনসংখ্যা যখন ২০ কোটি হবে, তখন জনশক্তির কারণে সম্ভবত জনসংখ্যার দিক থেকে আমরা স্থিতিশীল হব। ফলে আগামী কয়েক বছর দেশটি তার আরও জনসংখ্যা বাইরে রপ্তানি করবে। এখন প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি কাজ করছেন বিদেশে– মধ্যপ্রাচ্য, কোরিয়া, সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য দেশে। যদি পুরো বিশ্বের দিকে তাকান, ইউরোপ নিজের জনসংখ্যা হারাচ্ছে। জাপান সংকোচন হচ্ছে মানুষ নেই বলে; তাদের ৯ কোটি মানুষ ৩০ বছরে ৭ কোটি ৬০ লাখ হয়ে যাবেন। সেসব হিসাব আরও অর্থ বহন করে– সেই সমাজগুলোকে তাদের প্রবীণদের সেবা করতে নতুন জীবিকা খাত ‘সেবাকর্ম’ শুরু করতে হবে। ধনী দেশগুলোর সেবাটির প্রয়োজন হবে। দরিদ্র দেশগুলোর লোকবল এই কাজ সরবরাহ করবেন। শেষ পর্যন্ত মনে করি, জনসংখ্যা পুরো বিশ্বেরই একটি সমস্যা হয়ে উঠছে। এখন আমরা বিশ্বের মোট ৭শ কোটি, সম্ভবত ১ হাজার থেকে ১১শ কোটিতে স্থিতিশীল হব। সেই ১১শ কোটি মানুষ যখন আজকের হারে সম্পদ ব্যবহার বা গ্রাস করবেন, সম্ভবত সেটি টেকসই হবে; কিন্তু যদি আমাদের সম্পদ ব্যবহার বা গ্রাস করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হারে বেড়ে যায়, তবে সেক্ষেত্রে এটি একটি বড় সমস্যা হতে যাচ্ছে। তাই কিছু সমন্বয় করতে হবে এই ক্ষেত্রে এ কারণে যে, কী আইন বা নিয়মের মাধ্যমে তা সম্ভব করা যাবে– প্রতিটি পয়সা, সম্পদের ব্যবহার এই পৃথিবীকে সমর্থন বা সহযোগিতা করতে; যার মাধ্যমে বিশ্ব আমাদের সহযোগিতা করতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এ অভিঘাতের প্রচণ্ডতা কমাতে বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কী ভূমিকা বা কাজ করতে পারে?
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়টি সতিই সাহায্য করতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশেরও ধারাবাহিকভাবে নিজের দেশকে সাহায্য করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে আমাদের প্রয়োজন আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূভাবে নিজের প্রয়োজনে একত্র হওয়া। জলবায়ু পরিবর্তনের সুবিধাগুলো, ব্যক্তিগত ও দেশের সম্পদগুলোকে এজন্য কাজে লাগাতে হবে। যেগুলো এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে, সহজে পাওয়া সম্ভব হয়ে গিয়েছে। আমরা কী জলবায়ু পরিবর্তনের তহবিলকে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হয়েছি (এই তহবিল জলবায়ু পরিবর্তনের সু-উদ্যোগ), যেটি সহজ করা হয়েছে? আমাকে বলতে হয় ‘এখনো না’। আমাদের নিজেদের পরিকল্পনাগুলো থাকতে হবে যে, কীভাবে তহবিলগুলোকে বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে ভবিষ্যতের জন্য ব্যবহার করতে হবে, কীভাবে এ অভিঘাতের তীব্রতা কমাতে হবে নানাভাবে, কীভাবে আমাদের সমাজের সেই ফলাফলগুলোর সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারব। বাংলাদেশকে আরও অনেক কাজ করতে হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। কী কী কাজ করতে হবে আগে, সেগুলো সম্পাদনের সময়, আমরা এখনো করিনি। এই মুহূর্তে ব্র্যাকের দুটি জলবায়ু পরিবর্তন কেন্দ্র আছে, যেগুলো বন্যা, ভূমিকম্পের মতো এই পরিবর্তনের বিপর্যয়গুলো নিয়েই কাজ করছে। সেখানে আমরা পরিবেশকে একটি বিষয় হিসেবে কর্মী ও সহযোগীদের শিক্ষা দিই। নিজেদের সক্ষমতা এই বিষয়গুলোকে মোকাবিলা ও সেগুলো নিয়ে কাজ করার জন্য বাড়াতে হবে।
আপনার বিচারে আপনার কাজের সবচেয়ে সফল ও ব্যর্থ জায়গা কোনটি?
একসময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, আমাকে চেষ্টা করতে, সেভাবে কাজ করতে যেতে হবে এবং রেশমি কৃষিক্ষেত্রে সৃষ্টি করব ৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান। ফলে বিপুল সংখ্যার কর্মসংস্থানের জন্য আমাকে ২৫ লাখ তুঁত গাছ রোপণ করতে হবে। তাই আমরা ১৩ হাজার কিলোমিটার বা ৮ হাজার ৭৭ মাইল সড়কের ধার ব্যবহার করলাম এবং ২৫ লাখ গাছ রোপণ করলাম। বিশ্ব খাদ্য প্রকল্প আমাদের প্রতি মাসে ৯০ কেজি গম দিয়েছেন যাতে যে ১৩ হাজার ৮শ নারী গাছগুলোর যত্ন ও দেখাশোনা করেন, তাদের বাড়ান, অর্থ হিসেবে দিতে পারি। ভেবেছিলাম, গাছগুলো বেড়ে উঠবে এবং ভরা যৌবনে আমরা রেশম গুটিগুলোর সবগুলোই পাব, তৈরি করব সেই পরিমাণের চাকরি, কিন্তু ১৯৯৪ সালে যখন আমাদের বড় একটি বন্যা হলো, তাতে বৃহত্তম পরিমাণ গাছ মারা গেল। তুঁত গাছের পানিতে প্লাবিত বা ডুবে থাকার সহ্য ক্ষমতা নেই। এটি ছিল আমার একটি ব্যর্থতা। উঁচু জমিতে আমি তুঁত গাছ রোপণ করতে যাচ্ছি। ‘শিক্ষা’ হলো আমার জন্য সবচেয়ে সম্মানজনক ও পুরস্কৃত প্রকল্প। হাজার হাজার, লাখ লাখ শিশু লেখাপড়া শিখছে আমাদের সবার মাধ্যমে। এই অর্জন লাভ ও নিজের চোখে দেখা বিস্ময়কর আনন্দের। তাদের অসংখ্যজন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছেন, যাচ্ছেন। জীবনে অসাধারণ ভালো করছেন। দেখি, আমাদের দেশের ও বিশ্বের সেরা এনজিও ব্র্যাক নাটকীয়ভাবে, তুমুল ও রক্তমাখা অর্জনে মানুষের জীবন এভাবে বদলে দিয়েছে। নির্দিষ্টভাবে সেই শিশুদের, যারা তাদের জীবনে সুবিধাটি লাভ করতে পেরেছে।
(১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১২ প্রকাশিত হয়েছিল)