হাশিম আমলা। দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। ৩৬ বছর বয়সী ‘ধ্রুপদী ক্রিকেটার’ গত আগস্টে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নিয়েছেন। প্রথমবার খেলতে এসেছেন বিপিএলে। গতকাল সিলেটে দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক অধিনায়ক জানালেন, জীবনের নতুন এক অধ্যায় উপভোগ করছেন। পেছনের ১২৪ টেস্ট, ১৮১ ওয়ানডে এবং ৪৪ টি-টোয়েন্টির অধ্যায় একদম মিস করেন না। লম্বা দাড়ি তাকে মাঠে দিয়েছিল ভিন্ন পরিচয়। চরিত্র হিসেবে শ্রদ্ধার। ধর্মপরায়ণ মুসলিম। জার্সিতে বিয়ারের অফিশিয়াল লোগো কখনো ব্যবহার করতে রাজি হননি। আমলার বিশ্বাস ধর্ম ঠিকঠাকভাবে পালন করলে বাকি সব আপনা আপনি ভালো হবে। গতকাল তার সঙ্গে আলাপচারিতা ‘দেশ রূপান্তর’ পাঠকদের জন্য সিলেট থেকে তুলে ধরেছেন মোহাম্মদ খাইরুল আমিন
বিপিএলে খেলতে আসা কীভাবে সম্ভব হলো?
হাশিম আমলা : অবশ্যই খুব ভালো লাগছে বাংলাদেশে এসে। আগে এখানে বেশ কয়েকবার এসেছি। এখানকার আবহ পছন্দ করি। বিশেষ করে ক্রিকেট সংস্কৃতিটা দুর্দান্ত। মাঠে বিদ্যুৎতাড়িত অনুভূতি থাকে। অবসরের পর সময়টা আমার ভালো কাটছে। এখানে ওখানে কয়েকটি টি-টেন লিগ খেললাম। এরপর একদিন খুলনা টাইগার্সের কল পেলাম। তাদের বললাম, খেলব। সৌভাগ্যের ব্যাপার, সময়টা ফাঁকা ছিল।
বিপিএলের মাঝপথে খুলনার সঙ্গে যোগ দিলেন। এটা কেমন চ্যালেঞ্জিং?
একদম চ্যালেঞ্জিং নয়। আমরা একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং দলের প্রতি শতভাগ নিবেদন নিয়ে মাঠে নামছি। এ রকমটা যখন ঘটে তখন দ্রুত সবকিছু ভালোভাবে মানিয়ে যায়।
আপনার দলের অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম; বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান। তার সঙ্গে এবার কিছু অভিজ্ঞতা বা টেকনিক ভাগাভাগি করতে চাইবেন?
এটা এমনিতে হয়ে যায়। কারণ, একে অন্যের সঙ্গে লম্বা সময় কাটানো হয়। আমরা একে অন্যের বিপক্ষে প্রায় বছর দশেক খেলেছি। মুশফিক অধিনায়ক হিসেবে, ব্যাটসম্যান হিসেবে ব্যতিক্রমী রকমের ভালো করেছে। বিশ্বের অন্যতম সেরা উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যানও সে। এখনকার দুনিয়ায় সে-ই সবচেয়ে লম্বা সময় ধরে আছে। সবচেয়ে অভিজ্ঞ। খুবই চমৎকার একজন খেলোয়াড় মুশি। তার সঙ্গে আলোচনা করা, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করা তো চমৎকার ব্যাপার। আমি নিশ্চিত, দুজনেই এর অপেক্ষায় আছি।
অনেক বাংলাদেশি ক্রিকেটার আপনার গুণমুগ্ধ। বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেটারে কি আপনি মুগ্ধ?
মুশি, সাকিবের (আল হাসান) কথা বলতে পারি। (মাশরাফী বিন) মোর্ত্তজার কথাও আসে। আমাদের ক্যারিয়ারে আমরা অনূর্ধ্ব-১৯ এবং তারপর থেকে একে অন্যের বিপক্ষে খেলে গেছি।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলার পরের জীবনটা কেমন?
উপভোগ করছি। জীবনের প্রত্যেকটা অধ্যায় রোমাঞ্চকর। আমি ভাগ্যবান যে যতটা চেয়েছি ততটা সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে পেরেছি। এটা ভিন্ন অধ্যায়। আন্তর্জাতিক সূচির জন্য আগে বিপিএলে খেলতে আসতে পারিনি। এবার পারলাম বলে ভাগ্য মানছি। ভালো একটা সময় এখন। বিপিএলে খেলতে খুব আগ্রহী ছিলাম। বিশ্বের ভিন্ন একটা দিক আবিষ্কার করার জন্য বিপিএল চমৎকার জায়গা। প্রত্যেক দেশের একেবারে স্বতন্ত্র ধরন থাকে। তাই বিপিএলের অভিজ্ঞতার অপেক্ষায় আমি।
অবসরের সিদ্ধান্তে কীভাবে পৌঁছেছিলেন?
বিশ্বকাপের পর কিছুটা সময় নিলাম। এরপর কাছের মানুষদের সঙ্গে শলাপরামর্শ করলাম। যদিও আমি হয়তো আরও কয়েক বছর খেলতে পারতাম, শারীরিক দিক দিয়ে সতেজ আছি, খেলার মতো অবস্থায়। কিন্তু সব কিছুর একটা সঠিক সময় থাকে। চলতে চলতে একটা জায়গায় এসে থামতে হয়।
টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম একজন সেরা ব্যাটসম্যান ধরা হয় আপনাকে। টেস্ট খেলা মিস করেন?
না, আমি টেস্ট মিস করি না। কারণ, একটা পর্যায়ে পৌঁছালে মনে হয় যথেষ্ট খেলেছি। আমি তাতেই সুখী। কৃতজ্ঞ। এখন আমার অল্পবিস্তর অভিজ্ঞতার ভা-ার থেকে যা কিছু ভাগাভাগি করা যায় তা করতে উপভোগ করি। এটা আসলে পরের একটা অধ্যায়। (ফেলে আসা) আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে আমি একফোঁটাও মিস করি না।
আপনার কাছে ক্রিকেট খেলার মূল্য কতটা?
৬ বছর বয়স থেকে খেলছি। ৬ বছরের একটা শিশুকে জিজ্ঞেস করলে জানবেন সে খেলাটা ভালোবাসে এবং উপভোগ করে। আমি সৌভাগ্যবান। এই খেলাটা খেলতে পারছি। ক্রিকেটকে ভালোবাসি। যেটা ভালোবাসেন সেটা করতে এবং সেটির জন্য দুনিয়া ঘুরতে পারা সত্যি ভাগ্যের ব্যাপার।
বাংলাদেশে আগের কোনো মজার বা ভালো স্মৃতি যদি থাকে...
(হাসি)। এখানে আমাদের দুটি টেস্ট বৃষ্টিতে ভেসে গিয়েছিল। ১০ দিনের খেলার ৯ দিন বা এ রকম বৃষ্টি ভাসিয়ে নেয়। এখানে আমাদের সেই টেস্ট সিরিজটা তাই সত্যি খুব বিস্ময়কর ছিল। ২০০৮ সালে এখানে প্রথমবার আসি। ওয়ানডে অভিষেক হয়েছিল। টেস্ট সিরিজে গ্রায়েম স্মিথ ও নিল ম্যাকেঞ্জি বিশ্বরেকর্ড গড়া জুটি গড়তে শুরু করল। আমার তিন নম্বরে ব্যাট করতে যাওয়ার কথা। আমি প্যাড পরে বসেই ছিলাম। দীর্ঘ সময় প্যাড পরে অপেক্ষায় থাকতে হয়েছিল।
আপনি তো খুব ধর্মপরায়ণ একজন মুসলিম। ধর্ম পালন আপনাকে ক্রিকেটে কীভাবে সাহায্য করে?
এই প্রশ্ন আমাকে অনেকবার করা হয়েছে। আমার মতে, ইসলামের নীতি খুব সরল। এটা আপনাদের বেশিরভাগই জানেন। আসলে (ইসলাম পালনের সঙ্গে ক্রিকেট খেলায় ভালো করার সম্পর্ক) ব্যাখ্যা করাটা কঠিন এই কারণে যে, সব একসঙ্গে মিলেমিশে আছে। ভাগ ভাগ হয়ে নয়। কেউ জানতে চায়, ইসলাম বা ধর্ম কীভাবে তোমার ক্রিকেটে সাহায্য করে? সত্যি বলতে, এই প্রশ্ন আমার কাছে বেশ অদ্ভুত লাগে। কারণ, যতটা ভালোভাবে সম্ভব আপনি জীবনযাপন করবেন। সবকিছু ঠিকঠাক জায়গায়
থাকবে। তাতে ক্রিকেটে সাহায্য হলো কি না তা ব্যাপার নয়। আসলে বিশ্বাস নিয়ে সম্ভাব্য সেরাভাবে সবকিছু প্রয়োগ করতে পারছেন কি না সেটাই মূল কথা। যার যে ক্যারিয়ার সেখানে সে সেরাটা করুক। আমার মনে এটা আসে না যে ‘ও, ক্রিকেটে সাহায্য পাব তাই ইসলাম পালন করা দরকার।’ ওটা বড় কপটতা। আপনার পালনীয় যা তা ভালোভাবে পালন করুন। বাকি সব আপনা আপনি হবে।