প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতিতে কালুরঘাট সেতু

চট্টগ্রাম নগরের ৫টি ওয়ার্ড এবং বোয়ালখালী পৌরসভা ও উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে চট্টগ্রাম-৮ সংসদীয় আসন। এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৯৯৬ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ৫ ওয়ার্ডে (চান্দগাঁও, মোহরা, পাঁচলাইশ, পূর্ব ও পশ্চিম ষোলশহর) ভোটার ৩ লাখ ১১ হাজার ৮৬ জন। বাকি বোয়ালখালী অংশে ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৬৪ হাজার ১৩১ জন। অর্থাৎ বোয়ালখালীর চেয়ে নগরের ৫ ওয়ার্ডে প্রায় দ্বিগুণ ভোটার। নগরের এই দ্বিগুণ ভোটারই এই আসনের জয়-পরাজয়ের মূল ফ্যাক্টর।

চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে এই আসনটির অবস্থান ভিন্ন। প্রবহমান কর্ণফুলী নদীর এপারে চট্টগ্রাম নগর, ওপারে বোয়ালখালী উপজেলা এবং মাঝখানে দণ্ডায়মান প্রায় শত বছরের পুরনো কালুরঘাট সেতু। নির্বাচন এলে জরাজীর্ণ এই কালুরঘাট সেতু নির্মাণের বিষয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতি হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন প্রার্থীরা।

স্থানীয় ভোটারদের অভিযোগ, নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি দিলেও কালুরঘাট সেতু নির্মাণে কেউ কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেননি। এবারের উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই প্রভাবশালী প্রার্থীও যথারীতি কালুরঘাট সেতু নির্মাণকে ভোট আদায়ের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছেন।

এর আগে গত ৭ নভেম্বর ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জাসদের কার্যকরী সভাপতি ও চট্টগ্রাম-৮ আসনের সাংসদ মঈনউদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুর পর আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশন আসনটিতে উপনির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করে। আগামী ১৩ জানুয়ারি আসনটিতে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১৭০টি কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে ভোট। এর মধ্যে নগরীর ৫ ওয়ার্ডে ১০১টি এবং বোয়ালখালীতে ৬৯টি ভোটকেন্দ্র। ভোটকক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৫০টি।

তফসিল অনুযায়ী বর্তমানে এই আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদ (নৌকা প্রতীক), বিএনপির একক প্রার্থী আবু সুফিয়ান (ধানের শীষ), বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) চেয়ারম্যান এসএম আবুল কালাম আজাদ (টেলিভিশন প্রতীক), ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের সৈয়দ মোহাম্মদ ফরিদ আহমদ (চেয়ার প্রতীক), স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. এমদাদুল হক (আপেল প্রতীক) ও ন্যাপের বাপন দাশগুপ্ত (কুঁড়েঘর প্রতীক)।

প্রতীক পাওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৩, ৪, ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ড এবং বোয়ালখালী উপজেলার শাকপুরা ইউনিয়ন, সারোয়াতলী ইউনিয়ন, পোপাদিয়া ইউনিয়ন, চরণদ্বীপ ইউনিয়ন, আমুচিয়া ইউনিয়ন, আহলা করলডেঙ্গা ইউনিয়ন, পশ্চিম গোমদী ইউনিয়ন, পূর্ব গোমদী ইউনিয়ন ও কধুরখীল ইউনিয়নের ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ভোট প্রার্থনা করে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রচারের সময় ভোটারদের দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। এলাকায় এলাকায় প্রতীক সংবলিত পোস্টার ও ব্যানারে ছেয়ে গেছে। নির্বাচনে প্রভাবশালী দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে সম্প্রতি দুয়েকটা স্থানে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপির দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন ভোটাররা।

নাজিম উদ্দিন নামে বোয়ালখালী উপজেলার শাকপুরা ইউনিয়নের এক বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার দেখেশুনে ভোট দিতে হবে আমাদের। কেননা, নির্বাচন আসে, নির্বাচন যায়। এতে নতুন নতুন এমপি আসেন। কিন্তু আমাদের ভাঙাচোরা কালুরঘাট সেতুটি নির্মাণে কেউ এগিয়ে আসেন না। যেটি নিয়ে আমাদের দুর্ভোগের শেষ নেই।

আহমেদ লোকমান নামে নগরের পুরান চান্দগাঁও থানা এলাকার এক বাসিন্দা জানান, চট্টগ্রাম-৮ আসনের নির্বাচন মূলত শহরকেন্দ্রিক। কেননা, এই আসনের ৩ ভাগের দুইভাগ ভোটার নগরের। নগরের ৫ ওয়ার্ডের ভোট যিনি বেশি পাবেন, তিনিই এমপি হয়ে থাকেন। তাই প্রার্থীরা নগরের ভোটারদের কাছেই বেশি আসছেন। গত সাত দিনে একই দলের ৪-৫টি গ্রুপ আমাদের এলাকায় ভোট চাইতে এসেছেন। জানি না কেমন ভোট হবে। মারামারি শুনলে নারী ভোটাররা কেন্দ্রে যেতে চান না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা গত বুধবার চট্টগ্রামে এসে সাংবাদিকদের বলেন, ইভিএমের মাধ্যমে আগামী ১৩ জানুয়ারি চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠু হবে। আশঙ্কার কোনো কারণ নেই। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে নির্বাচনে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। একাধিকবার মিটিং হয়েছে। আসনটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ইভিএম ব্যবহারের বিভিন্ন নিয়ম সংবলিত প্রচার চালানো হচ্ছে। আগামী ১১ জানুয়ারি আসনটির ১৭০টি কেন্দ্রে মক ভোটের আয়োজন করা হচ্ছে।