দীর্ঘ মার্কিন-ইসরায়েল পরিকল্পনায় যে অস্ত্রে যেভাবে ঘায়েল সোলেইমানি

বিশ্ব রাজনীতির আলোচনায় এখন ইরানি জেনারেল কাসেম সোলেইমানি হত্যাকাণ্ড। শুক্রবার ভোরে ইরাকে ইরানের এই প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তাকে ড্রোন হামলায় হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ব্যক্তিকে কীভাবে শিকার বানাল যুক্তরাষ্ট্র, এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছিল শুরু থেকে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল জানাচ্ছে, অত্যাধুনিক মার্কিন ড্রোন ‘এম কিউ-নাইন র‌িপার’ এর মাধ্যমে ইরাকে সোলেইমানির গাড়িবহরে এই হামলা চালানো হয়।

শুক্রবার ভোরে বাগদাদে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে নামেন ইরানের সেনাবাহিনী ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের প্রধান মেজর জেনারেল কাসেম সোলেইমানি।

ইরাকি মিলিশিয়া বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তায় তার গাড়িবহর বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার অল্প মুহূর্তের মধ্যে মার্কিন হামলার শিকার হয়।

হামলায় সোলেইমানিসহ ১০ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ইরাকি মিলিশিয়া কমান্ডার আবু মাহদি আল-মুহান্দিসও।

জানা যায়, বিমানবন্দর থেকে বের হওয়া দুটি গাড়ির একটিতে ছিলেন সোলাইমানি। মার্কিন ড্রোনের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি তার গাড়িকে আঘাত হানে।

আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটি প্রবল বিস্ফোরণে দুমড়ে মুচড়ে যায়। মূহুর্তে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ইরানি জেনারেলের।

দীর্ঘদিন ধরে সোলেইমানির ওপরে কড়া নজরে রেখেছিলেন মার্কিন ও ইসরায়েলের গোয়েন্দারা। একপর্যায়ে তারা সোলেইমানির ফোনের কথোপকথনেও হানা দিতে সক্ষম হয়।

প্রয়োজনে ড্রোন উড়িয়ে সোলেইমানিকে ধাওয়া করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। তবে বিমানবন্দর এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করতে সক্ষম হয় মার্কিন বাহিনী।

সোলেইমানির জন্য কয়েকটি দেশে ওত পেতে ছিল মার্কিন-ইহুদি গোয়েন্দারা। ইরান বা সিরিয়া থেকে বাগদাদের উদ্দেশ্যে তার বিমান ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনো মার্কিন গোয়েন্দা সেই খবর পৌঁছে দিয়েছিল উপরস্থ কর্তৃপক্ষের কাছে। 

২৩০ কিলোমিটার দূর থেকে বাগদাদ বিমানবন্দর লক্ষ্য করে অন্তত চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে এই হামলা চালানো হয়। 

একবার জ্বালানি ভরলে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত হামলা চলতে পারে মার্কিন ড্রোন এম কিউ-নাইন র‌িপার।

চালকবিহীন ড্রোনটির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৪৮২ কিলোমিটার পর্যন্ত। যুদ্ধযানটিতে রয়েছে অত্যাধুনিক ইনফ্রারেড ক্যামেরা।

এই ক্যামেরায় মাধ্যমে দূরের কোনো সামরিক ঘাঁটিতে বসে থাকা ড্রোন চালক তার মনিটরে যুদ্ধক্ষেত্রের ছবি পরিষ্কার দেখতে পায়।

মধ্যপ্রাচ্যে যে কোনো শক্তির জন্য আতঙ্ক ধরানো কুদস বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিলেন কাসেম সোলেইমানি । আইআরজিসি'র একজন সাধারণ কমান্ডার থেকে দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী ও দুর্ধর্ষ সেনা কর্মকর্তা হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

অলিখিতভাবে তার মর্যাদা ছিল ইরানের সেনাবাহিনীর যে কোনো সামরিক কর্মকর্তার ওপরে।  ইরান বিপ্লবের পর সোলেইমানিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ‘অর্ডার অব জুলফিকার’ পদকে ভূষিত হন।

মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে অনেকগুলো মিলিশিয়া বাহিনী নিয়ন্ত্রিত হতো তার মাধ্যমে। জঙ্গী সংগঠন আইএস দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। অঞ্চলটিতে মার্কিন শক্তির ভীতও কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন সোলেইমানি। ওয়াশিংটনের হিটলিস্টের অন্যতম ছিলেন তিনি। 

ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া বাহিনীর ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ২৫ যোদ্ধা নিহত হওয়া এবং এর জের ধরে বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে বিক্ষোভকারীদের হামলার ঘটনার জেরে হত্যা করা হয় সোলেইমানিকে।

গত বছর হরমুজ প্রণালিতে বিদেশি তেলের ট্যাঙ্কার ও সৌদি আরবে তেলক্ষেত্রে বড় ধরনের হামলা চালিয়ে বিশ্বের জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা তৈরির পেছনে ইরানের বিরুদ্ধে আঙুল উঠে। সিরিয়ার গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিয়মিত হামলা তো আছেই। এমন সব ঘটনার পেছনে কলকাঠি মনে করা হয়ে থাকে সোলেইমানি ও তার কুদস বাহিনীকেই।

এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ইরাকে বিক্ষোভ দমন ও গুপ্তহত্যার পেছনেও কুদস নিয়ন্ত্রিত মিলিশিয়া বাহিনীকেই দায়ী করা হয়ে থাকে।  

স্বাভাবিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় টার্গেটে পরিণত হন সোলেইমানি। গুপ্তঘাতকের মাধ্যমে বেশ কয়েকবার তাকে হত্যাচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

গত বছরও ইরানি এই জেনারেলকে গুপ্তহত্যার জন্য ইহুদি ও আরবদের পাঠানো একটি দলকে আটক করা করে ইরান। তবে সর্বশেষ প্রচেষ্টায় ওয়াশিংটনের শিকার হলেন হলেন সুলেইমানি।