গত কয়েক বছরে ইউরো ক্লাব ফুটবলে শিরোপা লড়াইয়ে পরিচিত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল দুই মাদ্রিদ জায়ান্ট রিয়াল ও আতলেতিকো। ২০১৩-১৪ থেকে পাঁচ মৌসুমে তিনবার শিরোপা নির্ধারণীর লড়াইয়ে মুখোমুখি হয় তারা। ২০১৩-১৪ এবং ২০১৫-১৬, তিন মৌসুমে দুবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে। ২০১৮-তে উয়েফা সুপার কাপের ফাইনালে। মাঝে ২০১৮’র বাকিটা সময় এবং ২০১৯ এ ছন্দপতন হয় দু’দলেরই। সেই ব্যর্থতার দিনকে পেছনে ফেলেছে তারা। নতুন বছরে দুই জায়ান্টই নিজেদের খুঁজে পেয়েছে। তাই আবারও ফাইনালের মঞ্চে তারা। ২০১৪’র পর এই প্রথম সুপারকোপার ফাইনালে লড়তে যাচ্ছে মাদ্রিদের দুই দল। আবারও ইউরোপিয়ান ফুটবলে ফিরছে ‘মাদ্রিদ ডার্বির’ উত্তেজনা।
গত বছর থেকে সুপারকোপার লড়াই হচ্ছে স্পেনের বাইরে। গতবার হয়েছিল মরক্কোতে। সেবার শিরোপা জিতেছিল বার্সেলোনা। এবার টুর্নামেন্টের ফরম্যাটও পাল্টে ফেলেছে স্প্যানিশ কর্র্তৃপক্ষ। আগে ফাইনাল হতো দুই লেগে। এবার টুর্নামেন্ট করা হয়েছে চার দলের। লা লিগা ও লিগ কাপের সেরা চার দল খেলছে দুই সেমিফাইনালে। সেই সেমিফাইনালেরই একটি বার্সেলোনাকে অপ্রত্যাশিতভাবে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করে আতলেতিকো। তার একদিন আগে ভ্যালেন্সিয়াকে হারিয়ে শিরোপা লড়াইয়ে আসে রিয়াল। সৌদি আরবের কিং আবদুল্লাহ স্পোর্টস সিটিতে সেদিন লিওনেল মেসিদের হার সৌদির সমর্থকদের জন্য হৃদয়ভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এক মেসিকে দেখতেই গত বৃহস্পতিবার গ্যালারি ভরে গিয়েছিল। আর্জেন্টিনা তারকার ওয়ার্মআপ থেকেই মেসির পায়ে যতবার বল যাচ্ছিল ততবারই উল্লাসে ফেটে পড়ছিল স্টেডিয়াম। সমর্থকদের আশা ছিল স্প্যানিশ কাপের ফাইনালেও মেসিকে দেখবেন। প্রিয় ফুটবলারের পায়ের গোল দেখবেন। সঙ্গে শিরোপা হাতে উল্লাসরত মেসিকে। তারওপর বোনাস হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে একটি এল ক্লাসিকো। কিন্তু সেসব কিছুই হচ্ছে না। সব ভেস্তে দিয়েছে আতলেতিকো।
অবশ্য আরব মেসিভক্তদের একদম হতাশ হওয়ার কিছু নেই। স্প্যানিশ সুপার কাপ আগামী দুই (মোট তিন বছর) বছরের জন্য এখানেই হচ্ছে। এজন্য ১২০ মিলিয়ন ইউরো পেয়েছে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন। তাই আগামী বছর মেসিকে শিরোপা হাতে দেখার স্বপ্ন দেখতেই পারে সৌদির সমর্থকরা। এবার মাদ্রিদ ডার্বির উত্তেজনা উপভোগ করা যাক। এই দ্বৈরথের ভার হয়তো এল ক্লাসিকোর মতো না, কিন্তু জম্পেশ ফুটবলে ভরা এক রাতের জন্য যথেষ্ট। এর আগেও ফাইনালগুলোতে তার প্রমাণ রেখেছে দু’দলের লড়াই। ২০১৩-১৪ মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালটি ছিল সবচেয়ে আলোচিত। সেবার সার্জিও রামোসের শেষ মুহূর্তের গোলে ম্যাচে ফেরে রিয়াল। আর অতিরিক্ত সময়ে গিয়ে আরও তিন গোলে আতলেতিকোর প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের স্বপ্ন ভেস্তে দেয় নগর প্রতিদ্বন্দ্বীরা। এক মৌসুম পর আবারও চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে রিয়ালের কাছে হতাশার ইতিহাস নিয়ে থামতে হয় আতলেতিকোকে। সেবারও নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা অমীমাংসিত থাকলে খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। ৫-৩ গোলে সেই টাইব্রেকার জিতে শ্রেষ্ঠত্ব পায় রিয়াল। ২০১৮ সালে চিত্র বদলে যায়। ততদিনে রিয়াল ছেড়েছেন জিনেদিন জিদান। সঙ্গে নিয়ে যান দলটির সৌভাগ্য। আর তাই উয়েফা সুপার কাপ ফাইনালে রিয়ালের ওপর চরম প্রতিশোধ নেয় আতলেতিকো মাদ্রিদ। ৪-২ ব্যবধানে জিতে তৃতীয় সুপার কাপ জেতে তারা।
প্রায় দেড় বছর পর এবারও বদলেছে দৃশ্যপট। রিয়ালের সৌভাগ্যের প্রতীক সাবেক ফরাসি লিজেন্ড জিদান ফিরেছেন। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোহীন দলকে রাতারাতি বদলে যদিও দিতে পারেননি। কিন্তু নিজের পরিকল্পনা দিয়ে ঠিকই নিয়ে এসেছেন একটি শিরোপার সামনে। শেষবার এই জিদান-ই এ শিরোপা এনে দিয়েছিলেন রিয়ালকে। ২০১৭ সালের ফাইনালে দুই লেগেই বার্সেলোনাকে উড়িয়ে দিয়েছিল জিদানের রিয়াল। প্রথম লেগে বার্সার মাঠে ৩-১ এবং দ্বিতীয় লেগে নিজেদের মাঠে ২-০ তে জিতেছিল মাদ্রিদ জায়ান্টরা। তিন বছর পর আবারও যখন রিয়ালকে এই পর্যন্ত তুলে আনার নায়ক জিদান; কোচকে সঠিক গুরু দক্ষিণা দিতে পারবেন তো শিষ্যরা! ১৫ ম্যাচ অপরাজিত থাকার আত্মবিশ্বাস সঙ্গে আছে তাদের।
এদিকে আতলেতিকোর জন্য এই ফাইনালে ওঠা অনেক কিছুই টেনে আনছে। লিগে মৌসুমের শুরু থেকেই খুঁড়িয়ে চলছিল তারা। সম্প্রতি গতি ফিরে পেয়েছে ডিয়েগো সিমিওনির দল। যা তাদের তুলে দিয়েছে লিগ টেবিলের তিন নম্বরে। এছাড়া বার্সার বিপক্ষে সেমিফাইনালের দ্বিতীয়ার্ধটি আতলেতিকোর বর্তমান সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়েছে। তাই রিয়ালের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও পুরোপুরি ডার্কহর্স প্যাকেজ তারা। এর পাশাপাশি দলটির জন্য আজকের জয় গুরুত্বপূর্ণ আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর দিক থেকে। সামনে লিগে বার্সা ও রিয়ালের বিপক্ষে অ্যাওয়ে ম্যাচ তাদের। আগামী মাসে এই মুহূর্তে ইউরোপের সবচেয়ে ভয়ংকর দল লিভারপুলের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচও আছে। আজকের শিরোপা ওই লড়াইগুলোর জন্য আতলেতিকোর আত্মবিশ্বাস সপ্তম স্তরে তুলে দিতে পারে নিশ্চিত।
ও, আরেকটি দিক থেকেও দুই দলের শিরোপা জেতা খুবই লাভজনক। লিগ তালিকার দুইয়ে থাকায় এই শিরোপা জিতলে ১০ মিলিয়ন ইউরো পাবে রিয়াল মাদ্রিদ। অন্যদিকে তালিকার তিনে থাকা আতলেতিকো জিতলে পাবে ৬ মিলিয়ন। অর্থের গন্ধে হলেও মরণপণ লড়াইয়ে নামবে দুই মাদ্রিদ জায়ান্ট।