শুক্লাম্বর দিঘিতে স্নান উৎসবে লাখো পুণ্যার্থীর ভিড়

চট্টগ্রামে চন্দনাইশ উপজেলায় লাখ লাখ নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে শেষ হলো ঐতিহাসিক শুক্লাম্বর দিঘির স্নান উৎসব।

উপজেলার বরমার বাইজুরী গ্রামে সনাতন সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান শ্রী শ্রী শুক্লাম্বর দিঘিতে বুধবার যথাযথ মর্যাদায় প্রাচীনতম এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে দিঘি ও তৎসংলগ্ন প্রায় ১৫ একর বিশাল এলাকা জুড়ে মেলা বসে।

উৎসবের আগের দিন বিকেল হতে আত্মশুদ্ধি, পাপমুক্তি ও মনোবাসনা পূরণের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থী, পুণ্যার্থী, তীর্থযাত্রী, দোকানি ও পূজারিদের আগমন ঘটে। সকালে দেখা যায়, মেলাতে উপচেপড়া মানুষের ভীড়। কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। 

মনোবাসনা পূরণের জন্য মেলায় আসা পুণ্যার্থীদের অনেকে অশ্বত্থ গাছের নিচে কবুতর উড়িয়ে দেন। আবার কেউ কেউ দিঘিতে তীব্র শীত উপেক্ষা করে স্নান করেন। অনেকে দিঘির জলে ঢেলে দেন তরল দুধ।

মনের ইচ্ছে পূরণের জন্য অশ্বত্থ গাছের ডালে সুতা বাঁধছিলেন মেলায় আগত নবদম্পতি শ্রাবণী ধর ও তার স্বামী ও রতন ধর। অনেকের কাছে এই মেলার কথা অনেক শুনে এবার আসতে পেরে ভীষণ খুশি বলে জানালেন তারা।

রাউজান থেকে জয় ধর, অরূপ চক্রবর্তী ও সাতকানিয়া থেকে মেলায় এসেছেন মিলন বিশ্বাস। তারা জানান, এই মেলায় এলে মনোবাসনা পূরণ হয়। এখানে এলে কেউ খালি হাতে ফেরে না।

কনকনে শীত উপেক্ষা করে পাপমুক্ত নতুন জীবন লাভের আশায় দিঘির জলে স্নান করতে নেমেছিলেন নানা বয়সের নারী-পুরুষ।

সনাতন বা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনুষ্ঠান হলেও মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানদেরও সমাবেশ ঘটে। উৎসবে নারীদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।

মেলায় নাগরদোলাসহ বিভিন্ন ধরনের বেতের তৈরি টুকরি, বড় ঝুড়ি, চালুনি, কুলা, মোড়া, দা-বটি-ছোরা, জাঁতা, মাটির ঘটি-বাটি, শীতের সবজি, মানকচু, শাপলা মাছ, ইলিশ, দেশি পুকুরের মাছ, চটপটি, বিনি ধানের খই, যব ধানের খই, বাতাসা, গস্যার টফি, বাদামের টফি, নিমকি বিস্কুট, নকুল দানা, কদমা, গজা, নারকেলের চিড়া, রংবেরঙের ঘুড়ি নিয়ে মেলায় এসেছেন দূর-দূরান্তের বিক্রেতারা।

প্রতি বছরের মতো এবারও পৌষ সংক্রান্তির এই মেলায় পার্শ্ববতী ভারত, নেপাল, ভুটানসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন বিভিন্ন মানত নিয়ে এ মন্দিরে আসে। সারা বছর প্রতিদিন বিভিন্ন মানস নিয়ে পূর্ণের লক্ষ্যে দিঘিতে দুধ উৎসর্গ, ছাগল ও কবুতর, ফল-ফলাদি ইত্যাদি দেয় বলে জানা যায়। তাদের মতে দিঘির পানিতে উৎসর্গকৃত দুধ পানির সঙ্গে না মিশে তলদেশে চলে যায়। এ রকম নানা উপাখ্যান আছে দিঘিকে ঘিরে।

এশিয়ার হিন্দুদের জন্য অন্যতম তীর্থস্থান হয়েছে পরিচিত শুক্লাম্বর পীঠ মন্দির। শুক্লাম্বর ভট্টাচার্য ভারতের নবদ্বীপ নদীয়া থেকে চন্দনাইশের বরমার বাইনজুরীতে আগমন করেছিলেন। তিনি ১১ একর জায়গায় শিবমন্দির সৃষ্টির মাধ্যমে সাধনা শুরু করেছিলেন। বছরের পর বছর ধর্মীয় সাধনার মাধ্যমে সিদ্ধি লাভ করেন। তৎকালীন সময়ে এলাকায় নারী-পুরুষের বিবাহ অনুষ্ঠানের যাবতীয় সরঞ্জামাদি স্বর্ণ, রৌপ্য, হিরা ও মূল্যবান ধাতুর তালিকা মহাসাধক শুক্লাম্বর এর হাতে দিলে বিবাহের দিন উক্ত দিঘিতে তালিকাভুক্ত সকল মালামাল ভেসে উঠত বলে বিশ্বাস ভক্তদের।