ছেলের মুখে খাবার তুলে দিতে নিজের চুল বিক্রি করে দিয়েছিলেন ভারতের এক নারী। প্রেমা সেলভাম নামে এই মা তামিলনাড়ুর সালেম জেলার বাসিন্দা। তার জীবনের করুণ গল্প উঠেছে বিদেশি মিডিয়ায়।
বিবিসি বাংলা জানায়, অভাব অনটনের দায়ে প্রেমার স্বামী আত্মহত্যা করেন। এতে আরও বেশি করুণ পরিস্থিতিতে পড়ে যাওয়া প্রেমা নিজেও বেছে নিতে চেয়েছিলেন আত্মহননের পথ।
প্রেমা জানান, তিন সন্তানকে খাওয়ানোর জন্য তার কাছে কিছুই ছিল না। বিক্রি করে অর্থ আয় করার মতো ছিলো না কোনো সম্পদ, গয়না, মূল্যবান জিনিস কিংবা রান্নাঘরের তৈজসপত্রও। শেষপর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছিলেন নিজের মাথা চুল।
এমন বেদনাদায়ক জীবনে প্রেমা তার সহ্যের চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। ফলে এমন পদক্ষেপ নিতে তাকে বাধ্য করে যা স্থানীয়ভাবে চাঞ্চল্য তৈরি করে।
প্রেমা সেলভাম বলেন, ‘আমার সাত বছর বয়সী ছেলে কালিয়াপ্পান স্কুল থেকে ফিরে খাবার চায়। তারপর সে ক্ষুধায় কাঁদতে শুরু করে।’
ছেলেকে দেয়ার মতো কিছু ছিল না এবং ফলে অসহায় বোধ করছিলেন ৩১ বছর বয়সী এই মা। অসুস্থতা ও দুর্বল শরীরের জন্য কোনো কাজও করতে পারছিলেন না তিনি।
চলতি বছরের জানুয়ারির মাসের প্রথম শুক্রবার ছিল সেদিন। ঘরে কিছুই রান্না করেননি তিনি, কারণ তার কাছে রান্না করার মতো কিছু ছিল না।
প্রেমা বলেন, ‘আমার কাছে দেয়ার মতো কিছু ছিল না। এটা আমাকে কষ্ট দিয়েছিল। হৃদয় ভেঙে দিয়েছিল। আমার মনে হচ্ছিল, আমি যদি আমার বাচ্চাদের খাবার দিতে না পারি তাহলে বেঁচে থেকে কী হবে? একটা দোকানের কথা আমার মনে ছিল যেটি চুল কিনত। আমি সেখানে গিয়ে আমার পুরো মাথার চুল ১৫০ রুপিতে বিক্রি করে দিই।’
চুল বিক্রি করে তিনি যে অর্থ পেয়েছিলেন তা দিয়ে হয়তো একটি বড় শহরে মাঝারি মানের একটি রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার কেনা সম্ভব। কিন্তু তার গ্রামে সেই চুলের মূল্য ছিল সামান্যই।
তিন সন্তানের জন্য ২০ রুপি করে তিন প্যাকেট ভাত কিনতে পেরেছিলেন প্রেমা। তিনি সন্তানদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে সেই খাবার খেয়েছিলেন কিন্তু এটা ছিল ক্ষণিকের আনন্দ মাত্র।
প্রেমা জানতেন যে, তিনি তার শেষ উপায় ব্যবহার করে ফেলেছেন এবং পরের বেলা তিনি কীভাবে তার সন্তানদের খেতে দেবেন সেই চিন্তা ভর করে।
তিনি জানান, বছরের পর বছর ধরে স্বামীর সঙ্গে একটি ইটের ভাটায় কাজ করতেন তিনি। সেখানে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ভালোমতোই জীবনযাপন করতেন তারা। কিন্তু তার স্বামী নিজের ইটের ভাটা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। এর জন্য নেন ঋণ। কিন্তু সেই পরিকল্পনা কখনোই বাস্তবায়ন হয়নি এবং এতে তিনি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে ঋণের টাকা জোগাড় করতে না পারায় নিজের গায়েই আগুন দিয়ে সাত মাস আগে আত্মহত্যা করেন প্রেমার স্বামী।
চুল বিক্রির পর এবং আর কোনো উপায় না থাকায়, প্রেমাও তার স্বামীর মতো একই পথ অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে তার স্বামীর করা ঋণের চাপেও তিনি জর্জরিত। একপর্যায়ে আত্মহত্যা করতে যান তিনি। কিন্তু বাড়ির কাছাকাছি থাকা বোনের বাধায় বেঁচে যান তিনি।
অসহায় এই নারীর করুণ পরিস্থিতি জানাজানি হতেই এগিয়ে আসেন একজন দানশীল ব্যক্তি। বালা মুরুগান নামে ওই ব্যক্তির জীবনে এমন এক করুণ কাহিনি আছে। অভাব অনটনে তার মা নিজে আত্মহত্যা করতে এবং পুরো পরিবারকেই মেরে ফেলতে চেয়েছিল। পরবর্তীতে জীবনের কঠোর সংগ্রামে মুরুগান এখন নিজের পায়ে প্রতিষ্ঠিত, বর্তমানে তার একটি কম্পিউটার গ্রাফিকস সেন্টার রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি প্রেমা সম্পর্কে আমার বন্ধু প্রভুর কাছ থেকে জানতে পারি যে একটি ইটের ভাটার মালিক। প্রেমার সংগ্রাম তাকে তার পরিবারের কালো সময়গুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।’
মরুগান জানেন যে কীভাবে দারিদ্র্য মানুষকে হতাশায় ডুবিয়ে দেয়। তার বন্ধু প্রভুর সঙ্গে মিলে তিনি প্রেমাকে খাবার কেনার জন্য কিছু অর্থ দেন। এরপর পুরো ঘটনাটি মরুগান ফেসবুকে লেখেন।
তিনি বলেন, ‘একদিনের মধ্যে আমি এক লাখ ২০ হাজার রুপি জোড়ার করি। যখন আমি প্রেমাকে জানাই সে খুবই খুশি হয় এবং বলে যে এতে তার বেশির ভাগ ঋণ শোধ হয়ে যাবে।’
কিন্তু প্রেমার অনুরোধে তহবিল সংগ্রহ বন্ধ করা হয়। ‘সে বলে যে সে কাজ করে বাকি ঋণ শোধ করবে,’ বলেন বালা।
শুধু প্রেমা নয়, ভারতে এমন করুণ পরিস্থিতির শিকার অসংখ্য মানুষ। দেশটিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও লাখ লাখ মানুষ প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খায়।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, নাইজেরিয়ার পর বিশ্বের সবচেয়ে বেশি চরম দারিদ্র্য আক্রান্ত মানুষদের (যাদের দৈনিক আয় ১.৯০ ডলারে কম) বাস ভারতে।
প্রেমাকে চারজনের খাবার জোগাড় করতে হয় এবং যেদিন তিনি আয় করেন সেদিনও তার পারিশ্রমিক জনপ্রতি ৭২ সেন্টেরও কম হয়। তার অবস্থান দরিদ্রদের মধ্যেও দরিদ্র।
তবে বালা মুরুগান প্রেমাকে তার সাহায্য দেয়া অব্যাহত রেখেছে।
প্রেমা বলেন, ‘এখন আমি বুঝি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। আমি বাকি ঋণ শোধ দেয়ার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী।’
অচেনা মানুষদের কাছ থেকে সাহায্য পেয়ে অত্যন্ত খুশি প্রেমা এবং তিনি এটাকে স্বাগত জানিয়েছেন। এটা তাকে তার শক্তি ফিরিয়ে দিয়েছে।