‘গরিবের প্রতি অবহেলার প্রতিশোধ’ নিতে সারওয়ার আলীকে হত্যার চেষ্টা

ডা. সারওয়ার আলী হত্যাচেষ্টা মামলার প্রধান আসামি শেখ নাজমুল ইসলাম (৩০) হিন্দি সিনেমার পাগল। তিনি শয়নে, স্বপনে নিজেকে হিন্দি সিনেমার একজন প্রতিবাদী নায়ক বা ভিলেন হিসেবে কল্পনার মধ্যে রাখতে অভ্যস্ত।

সেই কাল্পনিক ধারণার বশবর্তী হয়ে সারওয়ার আলীর পরিবারকে উচিত শিক্ষা দেওয়া ও ভয় দেখিয়ে ডাকাতির পরিকল্পনা করেন।

মূলত সারওয়ারের স্ত্রীর কাছ থেকে দুর্ব্যবহার ক্ষুব্ধ হয় নাজমুল। সেখান থেকেই এই ডাকাতির চেষ্টা। তবে কোনো আঘাতের পরিকল্পনা ছিল না বলে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর কাছে দাবি করেছে নাজমুল।

দেশের বাইরে থাকা স্ত্রীর দেওয়া এক লাখ টাকা দিয়ে হামলার সরঞ্জামাদি কেনে নাজমুল।

সারওয়ার আলীকে হত্যাচেষ্টা মামলার প্রধান আসামি নাজমুলসহ চারজনকে বুধবার বাগেরহাট, গাজীপুর, রাজধানীর উত্তরা ও দক্ষিণখান এলাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর ওই ঘটনার রহস্য উন্মোচন করেছে পিবিআই।  

গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন, শেখ রনি (২৫), মো. মনির হোসেন (২০) ও মো. ফয়সাল কবির (২৬)।  তাদের তথ্য মতে ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে। মামলার আরেক আসামি ফরহাদকে (১৮)  ১৩ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করে পিবিআই। এ ঘটনায় সম্পৃক্ত সাতজনের আরও দুজন এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।

তারা হলেন, আলামিন মল্লিক ওরফে সুমন ও নুর মো. মোল্লা।

বুধবার সকাল ১১টায় রাজধানীর ধানমন্ডি পিবিআই সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আটকরা জানিয়েছে, ২০১৭ সালের জুন মাসে শেখ নাজমুল ইসলাম ড্রাইভার হিসেবে ডা. সারওয়ার আলীর বাড়িতে কাজ নেয়। সেখানে ৯ থেকে ১০ মাস কাজ করে। চাকরি করাকালীন ডা. সারওয়ার আলীর স্ত্রী ডা. মাখদুমা নার্গিস এর কাছ থেকে সে গরিব মানুষ হিসেবে প্রাপ্য সঠিক ব্যবহার পাচ্ছে না মনে হওয়ায় রাগ করে চাকরি ছেড়ে দেয়।

তিনি আরও বলেন, ডাকাতির পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য নাজমুল তার সহযোগী হিসেবে চাচাতো ভাই রনি, ভগ্নিপতি আল-আমিনসহ নুর মোহাম্মদ ও ফয়সালকে ডাকাতির কাজে নিয়োগ করে। এ ছাড়া রাজধানীর ঢাকার আজমপুর লেবার মার্কেট থেকে মনির ও ফরহাদকে দৈনিক ৫০০ টাকা ভিত্তিতে কাজে নিয়ে পরে ডাকাতির কাজে থাকতে রাজি করায়।

তিনি বলেন, পুরো ঘটনা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার জন্য অংশগ্রহণকৃত সদস্যদের মনে কোনো ভয়, জড়তা দূর করতে আসামি নাজমুল সিনেমার মতো করে কাল্পনিক অফিসের কথা বলে, যে অফিসে পুলিশ, সাংবাদিক, উকিল ও ডাক্তার ছায়ার মতো নিরাপত্তা দেবে। এ ছাড়া পুলিশ অস্ত্র দেবে, সাংবাদিক ক্যামেরা দেবে, উকিল স্ট্যাম্প দেবে এবং ডাক্তার প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জামাদি দেবে। ঘটনার সময় স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর ও ফিঙ্গার প্রিন্ট নিতে হবে এবং ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও করে রাখতে হবে।

তিনি বলেন, ৪ জানুয়ারি সকালে তারা রাজধানীর আশকোনা এলাকায় হাজী ক্যাম্পের সামনে একটি হোটেলে নাশতা করে ও ডাকাতির বিষয়ে বৈঠক করে। ওই বৈঠকে নাজমুল সদস্যদের জানায় ঘটনাটি সংঘটনের জন্য সে তিন মাস দাঁড়ি-গোঁফ কাটে না, যাতে উল্লেখিত বাসায় তাকে কেউ না চিনতে পারে।

ঘটনার দিন ৫ জানুয়ারি বিকেল অনুমান ৫টার দিকে আশকোনা এলাকার হোটেল রোজ ভ্যালীর ৩০৩ নম্বর কক্ষে নাজমুলের নেতৃত্বে উল্লেখিত সাতজন ডাকাতির চূড়ান্ত পরিকল্পনা করে। ঘটনার মূল হোতা নাজমুল বাসার পরিবেশ, কক্ষ, পার্কিং প্লেস ইত্যাদি সম্পর্কে সবাইকে অবগত করে এবং ডাকাতির সময় কার কী ভূমিকা হবে তা বুঝিয়ে দেয়। নাজমুল অন্যান্য আসামিদের জানায় যে, ডা. সারোয়ার আলীর বাড়িতে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার রয়েছে কিন্তু সে অন্যান্য আসামিদের ডা. সারোয়ার আলীর পরিবারের প্রতি তার ক্ষোভের বিষয়টি গোপন রাখে।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ঘটনার দিন সন্ধ্যা অনুমান সাতটার দিকে উল্লেখিত হোটেল থেকে আসামি নাজমুল প্রথমে একা বেরিয়ে যায়। নাজমুল বেরিয়ে যাওয়ার প্রায় আধা ঘণ্টা পর আসামি রনিসহ ছয়জন ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা করে। আসামি নাজমুল একটি ব্যাগে করে সাতটি চাপাতি ও পাঁচটি সুইচ গিয়ার ছুরি নিয়ে ঘটনাস্থল এলাকায় এসে আসামি রনির হাতে ছুরিগুলো দেয়।

রনি ঘটনাস্থলে থাকা পাঁচ আসামিকে ছুরিগুলো বিতরণ করে। নাজমুল রাত ৯টার দিকে পরিকল্পনা অনুযায়ী চার প্যাকেট বিরিয়ানি নিয়ে বাসায় প্রবেশ করে দারোয়ান হাসানকে দেয় এবং কৌশলে ঘুমের ওষুধ খাওয়ায়। পরে দারোয়ান হাসান ঘুমিয়ে পড়বে এ অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু রাত ১০টা পর্যন্ত দারোয়ান না ঘুমালে তাকে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত রেখে বাইরে থেকে ফয়সালকে ডেকে নিয়ে ২য় তলায় গিয়ে আড়ালে থেকে অপেক্ষা করতে বলে এবং তার সঙ্গে থাকা চাপাতিসহ ব্যাগটি গ্যারেজের পাশে রেখে দেয়। আসামি নাজমুল ও ফয়সাল ২য় তলায় তাদের সেন্ডেল খুলে রেখে ৩য় তলায় যায়। ৩য় তলায় সারওয়ার আলীর মেয়ে সায়মা আলীর বাসায় নক করে। তার মেয়ে দরজা খুললে নাজমুল ও ফয়সাল ধাক্কা দিয়ে বাসার ভেতরে প্রবেশ করে সায়মা আলী, তার স্বামী মো. হ‌ুমায়ূন কবির ও মেয়ে অহনা কবির দের ছুরির ভয় দেখিয়ে জিম্মি করে রাখে। পরে অনুমান ১০টা ২৫ মিনিটে ফয়সালকে ৩য় তলার নিয়ন্ত্রণে রেখে নাজমুল ৪র্থ তলায় সারওয়ার আলীর ফ্ল্যাটে এসে নক করে। সারওয়ার আলী দরজা খুলে দিতেই জোরপূর্বক ভেতরে প্রবেশ করে তাকে মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে মেঝেতে ফেলে গলায় ছুরি ধরে এবং এই সময়ে তার স্ত্রী ডা. মাখদুমা নার্গিস চিৎকার শুরু করলে নাজমুল বাইরে অপেক্ষারত সহযোগীদের ফোনে ভেতরে আসতে বলে। তাদের অনবরত চিৎকার চেঁচামেচি শুনে দ্বিতীয় তলার ভাড়াটিয়া মেজর (অব.) সাহাবুদ্দিন চাকলাদার ও তার ছেলে মোবাশ্বের চাকলাদার ওরফে সজিব ৪র্থ তলায় আসে। দারোয়ান ঘুমিয়ে না পড়ায় নাজমুলের বাইরে অবস্থানরত সহযোগীরা ফোন পেয়েও ভেতরে ঢুকতে না পারায় নাজমুল হতাশ হয় ও ভয় পেয়ে যায়। ওই সময় ডা. সারওয়ার আলীর পরিবারকে রক্ষার জন্য ভাড়াটিয়ার ছেলে টি-টেবিল হাতে নিয়ে ছুড়ে মারার চেষ্টা করলে গ্লাসটি ফ্লোরে পরে বিকট শব্দ হয়। তখন নাজমুল ভয় পেয়ে দ্রুত বাসার পালিয়ে যায়। ওপরের শব্দ শুনে তৃতীয় তলায় থাকা আসামি ফয়সালও দ্রুত পালিয়ে যায়।  নাজমুল ও ফয়সাল দৌড়ে নিচে চলে আসলে অন্যান্য সকল আসামিরাও দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

৫ জানুয়ারি রাত ১০টা ২০ মিনিটে ঢাকার উত্তরার নিজ বাসায় ঢুকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি ও ছায়ানটের নির্বাহী সভাপতি ডা. সারওয়ার আলীকে দুর্বৃত্তরা হত্যার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এ ঘটনায় ডা. সারওয়ার নিজেই বাদী হয়ে গত ৬ জানুয়ারি তার ব্যক্তিগত গাড়ির সাবেক চালক নাজমুল ও বাসার দারোয়ান হাসানের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত চার-পাঁচজনের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। ঘটনার পরপরই এজাহারভুক্ত আসামি হাসান ও বাদীর বর্তমান গাড়িচালক হাফিজকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। হামলার ঘটনার পর ডা. সারওয়ার দেশ রূপান্তরকে জঙ্গি হামলার আশঙ্কার কথা বলেন। তবে পিবিআই এ ঘটনার সঙ্গে কোনো জঙ্গি সম্পৃক্ততা পায়নি।