মহান আল্লাহ অপার অনুগ্রহে আমাদের যে ধর্ম দিয়েছেন, তাতে মানবীয় প্রয়োজনের কোনো দিক-ই উপেক্ষা করা হয়নি। আল্লাহতায়ালা বলছেন, ‘আমি মানুষ এবং জিনকে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি। তারা আমার ইবাদত করবে কেবল এ উদ্দেশ্যেই তাদের সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত : ৫৬)
আল্লাহর উদ্দেশ্য মোতাবেক মানুষের কর্তব্য ছিল, সার্বক্ষণিক ইবাদতে ব্যস্ত থাকা। কিন্তু আল্লাহতায়ালা তার অসীম অনুগ্রহে সব ধরনের মানবীয় প্রয়োজন পূরণের সুযোগ ও অনুমতি দিয়েছেন। এ কারণে মানুষ জীবনের সব চাহিদা পূরণকে নেক আমলে পরিণত করতে পারে।
জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ইবাদত বলা হয়েছে; কিন্তু সব কাজ-কর্ম ছেড়ে দিয়ে বসে যেতে বলা হয়নি। বরং এমন এক আদর্শ আমাদের দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে জীবনের নানাবিধ প্রয়োজনও পূরণে কোনো বাধা থাকে না। আয়-উপার্জন, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব কার্যক্রম থাকে গতিশীল ও নিয়মমাফিক। উপরন্তু এগুলো নেক আমলে পরিণত হয়।সৎ ব্যবসায়ীদের হাশর ‘নবী ও সিদ্দিকিন’দের সঙ্গে
আল্লাহতায়ালা কিছু বিষয় হালাল করেছেন আর কিছুকে হারাম। হারাম ছেড়ে হালাল গ্রহণ করলে সব কার্যক্রম আমলে পরিণত হয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সন্তান যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে না দেয়। (সুরা মুনাফিকুন, আয়াত : ০৯)
ব্যবসায় মত্ত হয়ে দ্বীনি কর্তব্য ভুলে যাওয়া কখনো কাম্য নয়। বরং কর্তব্য হলো, আল্লাহকে স্মরণ রেখে হালালভাবে আয়-উপার্জনের চেষ্টা করা। হাদিসে এসেছে, ‘সৎ ও আমানতদার ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১২০৯)
ব্যবসায়ীর দায়িত্ব তার কার্যক্রম চালু রাখা
আমার বড় ভাই মাওলানা যাকি কায়ফি স্বনামধন্য কবি ছিলেন। ওলামায়ে কেরাম ও বুজুর্গদের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। তার কিতাবপত্রের ব্যবসা ছিল। তিনি আমাদের নিজের ঘটনা শুনিয়ে বলেছিলেন
‘একদিন সকালে আমি উঠে দেখি বাইরে প্রচ- বৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তাঘাটে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় হাঁটু সমান পানি ছিল। আমার মনে হলো এ সময়ে লোকজন হয়তো তাদের অতি প্রয়োজনীয় জিনিস নিতে বের হবে। কিন্তু আমার থেকে কিতাব কেনার জন্য কে আসবে; তাও আবার দ্বীনী কিতাব! তাই আজ দোকান খুলব না। পরক্ষণে মনে হলো গ্রাহক আসুক বা না আসুক; সেটা আমার কাজ নয়। দোকান খুলে বসে গেলে গ্রাহক পাঠাবেন তো ‘তিনি’। তিনি চাইলে বৃষ্টিতেও গ্রাহক পাঠিয়ে দেবেন।
এরপর আমি ছাতা নিয়ে জলাবদ্ধতার ভেতরেই বেরিয়ে পড়ি। দোকান খুলে বসে কোরআন তিলাওয়াত শুরু করি। কিছুক্ষণের মধ্যে লক্ষ করলাম, লোকজন ছাতা মাথায় দিয়ে দোকানে আসতে শুরু করেছে।
ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিণত হয় নেক আমলে
আমানতদারি, বিশ্বস্ততা এবং সততার সঙ্গে ব্যবসা করলে এটি নেক আমলে পরিণত হবে। মহানবী (সা.) বৃহৎ পরিসরে ব্যবসা করেছেন। যাকে আজকাল ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড (International trade) বলা হয়। এ অঙ্গনে তিনি আমাদের জন্য অনেক আদর্শ রেখে গেছেন। যদি সে আদর্শগুলো আমাদের মধ্যে এসে যায়, তবে আমাদের সামগ্রিক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নেক আমলে পরিণত হবে।
হালালে বরকত, হারামে হ্রাস
ব্যবসা যেমনই হোক তা যেন শরিয়তের গণ্ডির ভেতর হওয়া জরুরি। কেউ কেউ মনে করে, শরিয়তের হুকুম অনুযায়ী লেনদেন করতে গেলে টাকা কমে যাবে অথবা মুনাফায় ঘাটতি দেখা দিবে; কিন্তু এটা সঠিক নয়, বরং বড় ধোঁকা। কারণ, টাকার পরিমাণ বা কোয়ান্টিটি (quantity) মূলবিষয় নয়; বরং মান ও কোয়ালিটি-ই (quantity) প্রণিধানযোগ্য।
প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহ-ই ব্যবসায় বরকত দান করেন। দেখা যায়, কখনো কখনো সামান্য টাকার মাধ্যমে বহু কাজ সম্পাদিত হয়ে যায়। আবার কোনো সময় অঢেল টাকা থাকার সত্ত্বেও তা বিভিন্ন কারণে-অকারণে নষ্ট হয়ে যায়।
আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করেন আর সদকাকে বাড়িয়ে দেন। (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭৬) মানুষ বলেÑ সুদে সম্পদ বাড়ে। কিন্তু কোরআন বলছে, বৃদ্ধি পায় না; বরং তার বরকতহীন হয়ে শান্তি নিঃশেষ হয়ে যায়।
ব্যবসায়ীদের হাত ধরে ভারতবর্ষে ইসলাম
ভারতবর্ষে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক মুসলমান। এ ভূ-খণ্ডে সর্বপ্রথম ইসলাম প্রচারকারীরা যোদ্ধা ছিলেন না যে, তারা সংগ্রাম-জিহাদের মাধ্যমে এখানে ইসলামের প্রসার ঘটাননি। তাবলিগের কোনো জামাতও ইসলামের দাওয়াত নিয়ে এখানে আসেনি। বরং এ অঞ্চলে সর্বপ্রথম ইসলাম প্রচারকারী ছিলেন কিছুসংখ্যক সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেঈ। যারা ব্যবসার কাজে মালাবার অঞ্চলে এসেছিলেন। ব্যবসার মাধ্যমে তারা সুমহান আদর্শ স্থাপন করেছিলেন। এতে করে এ অঞ্চলের মানুষের অন্তরে তাদের প্রতি সীমাহীন অনুরাগ জন্ম নেয়। ফলে ইসলামকে গ্রহণ করে নেয়। তাই যারা ব্যবসায়ী তারা চাইলে নিজেদের সততার মাধ্যমে অন্যদের প্রভাবিত করতে পারেন। একটি সুন্দর ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে অংশ নিতে পারেন।