বরিশালে বিসিক শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৬০ সালে। দীর্ঘ ৬০ বছর পার হলেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি সেখানে। বিভিন্ন সময় শিল্পমন্ত্রীদের শুধু আশ্বাসেই সময় পার হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১৭ সালে নগরীর উন্নয়নে ৫২ কোটি টাকার প্রকল্প বরাদ্দ হলেও নানা জটিলতায় শেষমেশ সেটিও আর তেমন একটা এগোয়নি। নতুন কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায় নামমাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে ঢিমেতালে চলছে শিল্পনগরীটি। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।
শিল্পনগরীর সাবেক ও বর্তমান উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, ২০১০ সালে নগরীর উন্নয়নে আশ্বাস দিয়েছিলেন তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়–য়া। চার বছর পর একই আশ্বাস দিয়েছিলেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। এই আশ্বাসের মধ্যেই ৬০ বছর পার করেছে বরিশাল বিসিক। শেষ পর্যন্ত একটি প্রকল্প অনুমোদন হলেও বাস্তবায়নে দেখা গেছে জটিলতা। এরকম নানামুখী আশ্বাসে আশান্বিত হতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রধান সড়ক বাদে বিসিক এলাকার অধিকাংশ সড়ক যান চলাচলের অনুপযোগী। বিসিক ভবনও জরাজীর্ণ। গ্যাস নেই। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়। সন্ধ্যার পর অধিকাংশ এলাকা থাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন। সীমানা প্রাচীর নেই। রয়েছে মাদকাসক্তদের উৎপাতও। এসব কারণে বরাদ্দ নেওয়ার পরও খালি পড়ে রয়েছে অধিকাংশ প্লট। সেখানে চড়ে বেড়াচ্ছে গরু-ছাগল।
বরিশাল বিসিক সূত্র জানায়, ১৯৬০ সালের ৯ জানুয়ারি ১৩১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩০ দশমিক ৬১ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয় বরিশাল বিসিক শিল্পনগরী। মোট সম্পত্তির ৯৯ দশমিক ৯৫ একর জমিতে প্লট করা হয়েছে। বাকি সম্পত্তি বিসিক ভবন, সড়ক ও নর্দমার জন্য রাখা হয়। রকমভেদে ৪৬৩টি প্লট রয়েছে। এর মধ্যে ৩৩০টি উন্নত, ১৩৩টি অনুন্নত। দীর্ঘ সময়ে ৩৩৯টি প্লট বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উন্নত ও অনুন্নত মিলে ৪৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে রয়েছে। চালু হওয়ার পর বন্ধ হয়ে গেছে ২২ প্রতিষ্ঠান।
সূত্র আরও জানায়, ২০১০ সালের ২৪ নভেম্বর বরিশাল বিসিক আধুনিকায়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়য়া বলেছিলেন, ‘২০১১-১২ অর্থবছরের মধ্যে অবকাঠামো, প্রাচীর, সড়ক, নর্দমা ও বিদ্যুতের সমস্যা সমাধান করা হবে।’ পরে চার বছর পার হয়ে গেলেও মন্ত্রীর ওই আশ্বাসের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ২০১৪ সালে আবারও আশ্বাস দেন তখনকার শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। তার ওই আশ্বাসের ৩ বছর পর একনেকে বিসিক উন্নয়নে ৫২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দ পেয়ে নির্ধারিত সময় শেষ হলেও উন্নয়নকাজ শুরুই হয়নি। কেবল একটি পুকুরে পাইলিং এবং দুটি গেট নির্মাণ ছাড়া আর কোনো কাজ হয়নি।
বরিশাল বিসিক শিল্পনগরী কর্মকর্তা (স্টেট অফিসার) মো. খায়রুল বাশার দেশ রূপান্তরকে জানান, ২০১৭ সালে বিসিক উন্নয়নে ৫২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর ওই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও ২টি গেট এবং একটি পুকুরের পাইলিং ছাড়া অন্য কাজ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে দুই বছরের জন্য প্রকল্প মেয়াদ বাড়ানোর জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে উন্নত এলাকার সড়ক ও ড্রেন নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের অনুমতি না পাওয়ায় ১৭ একর নিচু জমি ভরাট করা যাচ্ছে না। সে ব্যাপারেও অনুমোদনের চেষ্টা চলছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিসিকের একাধিক ব্যক্তি বলেন, ‘বিসিকের উন্নয়নে শুধু মন্ত্রীদের আশ্বাসই পাওয়া গেছে। বাস্তবে উন্নয়নের কোনো উদ্যোগ নেই। সে কারণে নতুন কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে না। নামমাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে বরিশাল বিসিক শিল্পনগরী চলছে।’
বিসিকের একসময়ের শিল্পোদ্যোক্তা শামসুদ্দিন আলম অভিযোগ করে বলেন, ‘বিসিকের মূল সমস্যা বিসিক কর্র্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা। বিদ্যুতের আলাদা ব্যবস্থা নেই। সড়কগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। নিরাপত্তাব্যবস্থাও ভালো নয়। এসব কারণে উদ্যোক্তারা এখানে আগ্রহ দেখায় না। আমি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছি।’
বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক জালিস মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০১৬ সালে শিল্পমন্ত্রীর আশ্বাসে প্রকল্প অনুমোদন পায়। ২০১৯ সালের গোড়ার দিকে কাজ শুরু হয়েছে। ওই কাজ এখনো চলমান রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। বিসিকের অনুন্নত ৩৭ একরসহ সব রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, ড্রেন-কালভার্ট নির্মাণ ওই প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে।’