বার্সেলোনার আকাশে মেঘ জমেছিল। বজ্রপাত হলো বৃহস্পতিবার। এদিন মৌসুমের একটি শিরোপা লড়াই থেকে ছিটকে গেল কাতালান জায়ান্টরা। ওইদিন একই পরিণতি হয়েছে বার্সার চিরশত্রু আরেক স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদেরও। টানা ২১ ম্যাচ অজেয় থাকার দৌড় থেমেছে তাদের। ৬৫ বছর পর এই প্রথম স্প্যানিশ কাপ থেকে একদিনে বাদ পড়ল রিয়াল ও বার্সেলোনা।
৪-৩ ব্যবধানে রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়েছে রিয়াল সোসিয়েদাদ। আর ইনজুরি সময়ের তৃতীয় মিনিটে করা একমাত্র গোলে বার্সেলোনাকে বিদায় করে দিয়েছে অ্যাথলেতিক বিলবাও। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে দুই জায়ান্টের বিদায়ের আগে অপর স্প্যানিশ জায়ান্ট আতলেতিকো মাদ্রিদও হেরেছিল। দ্বিতীয় বিভাগের দল মিরান্দেসের কাছে হারে তারা। অন্য কোয়ার্টার ফাইনাল জয়ী দল গ্রানাদা। এতে করে এবার স্প্যানিশ কাপের সেমিফাইনালের লাইনআপে থাকল না রিয়াল বা বার্সার কেউই। সর্বশেষ ২০০৯-১০ মৌসুমে কোপার সেমিফাইনালে এমনটা হয়েছিল।
স্পেনের বাস্ক ভাষাভাষী অঞ্চলের দুই দলের কাছে দুই জায়ান্টের হারকে বলা হচ্ছে ‘বাস্ক ডাবল’। এই হারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বার্সেলোনা। ম্যাচের মাত্র একদিন আগে দলটিতে প্রায় গৃহযুদ্ধ লেগে যাচ্ছিল। ডিরেক্টর আবিদালের সঙ্গে লিওনেল মেসির দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। বার্সা প্রেসিডেন্টের হস্তক্ষেপে তা মিটেছে। কিন্তু মাঠের খেলায় সেসব অস্বস্তি উড়িয়ে দেওয়া তো হলোই না বরং দলটির অন্দরমহলের সমস্যা আরও প্রকাশ পেল। গত মাস থেকে কিছুই পক্ষে আসছে না তাদের। সম্প্রতি বাজে পারফরম্যান্সের জেরে কোচ বদল হলো। নতুন কোচ এসে ভোজবাজির মতো পাল্টে দিতে পারছেন না সব। তার অধীনে ছয় ম্যাচ খেলেছে বার্সেলোনা। চার জয়ের বিপরীতে অন্যতম হতাশার দুটি হার। এক হারে লা লিগার শীর্ষস্থান থেকে পিছলে পড়া আর অপরটিতে গতকাল কাপ লড়াই থেকে ছিটকে পড়া।
সামনেই নাপোলির বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শেষ ১৬’র ম্যাচ। এমন সময় এত-এত সমস্যা সামনে চলে আসা বার্সেলোনার কঠিন সময়ের কথাই বলছে। বিলবাওয়ের মাঠ সান মামেসে বার্সেলোনা এ নিয়ে টানা দুটি ম্যাচ হারল। চলতি মৌসুমে লা লিগায় বিলবাওয়ের মাঠে ১-০তেই হারে কাতালানরা। গত বৃহস্পতিবারের জয় যেন ওই দিনটিকে স্মরণ করিয়ে দেয় বিলবাও সমর্থকদের। এদিক ইনাকি উইলিয়ামসের শেষ মুহূর্তের হেড থেকে আসা গোলে কপাল পোড়ে বার্সার। পুরো ম্যাচে গোলের স্পষ্ট সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হয় সফরকারীরা। তবে লিওনেল মেসি ম্যাচের শেষদিকে দলকে প্রায় গোল এনেই দিয়েছিলেন। কিন্তু তার শট বিলবাও গোলরক্ষকের পায়ে লেগে ফিরে আসে। এছাড়া স্ট্রাইকার গ্রিজমানও গোল পাওয়ার খুব কাছ থেকে ফিরে আসেন।
ব্যর্থতার দিনে বার্সা তারকা পিকে অবশ্য আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার আহ্বান জানালেন সতীর্থদের। ক্লাবের বর্তমান পরিস্থিতি যেন এই হারে আরও বাজে না হয় সেদিকে লক্ষ রাখবেন তারা। জানালেন, ‘আমাদের কঠিন অবস্থা আর বাড়তে দেওয়ার সময় এটা নয়। আমি নিশ্চিত করতে পারি এই হারের পরও আমাদের মধ্যে শতভাগ আত্মবিশ্বাস আছে।’
টুর্নামেন্টে রেকর্ড ৩০ বারের জয়ী বার্সা। ১৯ বার জিতেছে রিয়াল। বিলবাওয়েরও এই শিরোপা ২৩ বার জেতা হয়েছে। কিন্তু সর্বশেষটি সেই ১৯৮৩-৮৪ মৌসুমে। তবে বার্সার বিপক্ষে বৃহস্পতিবারের জয় তাদের জন্য মধুর প্রতিশোধ। এর আগে পাঁচবার বার্সার জন্য কাপ শিরোপা জিততে পারেনি দলটি। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে বার্সার কাছেই হেরে বিদায় নিতে হয় তাদের। আর ২০০৯, ২০১২ ও ২০১৫ সালে কাতালানদের কাছে ফাইনালে হেরে শিরোপা স্বপ্ন ভঙ্গ হয় বিলবাওয়ের। এবার গত ছয়টি কাপ ফাইনালে টানা খেলে যাওয়া বার্সাকে হারিয়ে শিরোপা সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে দলটি।
বার্সেলোনার জন্য এই হার যতটা ক্ষতির রিয়াল মাদ্রিদের জন্য হয়তো ততটা নয়। তবুও ম্যাচ শেষে ঘরের মাঠে হারের কষ্ট লুকাননি জিনেদিন জিদান, ‘এটা অবশ্যই কষ্টের। কারণ সত্যি বলছি কেউই হার সহ্য করতে পারে না।’ এমনিতে তারুণ্যে ভরপুর রিয়ালের সঙ্গে সোসিয়েদাদের ম্যাচটি জমেছিল দারুণ। ৭ গোলের থ্রিলারের ছয় গোলই এসেছে দ্বিতীয়ার্ধে। তিন গোলে পিছিয়ে পড়ার পর ব্যবধান কমায় রিয়াল। একপর্যায়ে ৪-১ ব্যবধান ছিল। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়েও শেষ রক্ষা হয়নি মাদ্রিদ জায়ান্টদের। ম্যাচে মিডফিল্ডে কাসেমিরো, ডিফেন্সে রাফায়েল ভারান ও গোলরক্ষক হিসেবে থিবো কর্তোয়াকে বি¤্রাম দেন জিদান। কিন্তু হারের পর এ তিন ফুটবলারের প্রয়োজনীয়তা টের পেলেন তিনি। ম্যাচ শেষে কোচ জানান, ‘বিপক্ষরা আজ সত্যিই দারুণ খেলেছে। যতবার ওরা আক্রমণে উঠেছে ততবারই আমরা বিপদে পড়েছি, ভুল করেছি। ঘরের মাঠে ৪ গোল খাওয়া মানে আমরা বড় কোনো ভুল করেছি। এখান থেকে ম্যাচে ফেরা কঠিন।’