অনন্য বোলিং আর ফিল্ডিংয়ে মন কাড়ল যুবারা

ভারতীয় যুবাদের ইনিংসের দ্বিতীয় ওভার। বাংলাদেশ পেসার তানজিম হাসান সাকিব ওভারের তৃতীয় বলটি করলেন। সোজা ব্যাটে খেললেন দিব্যানশ সাক্সেনা। বল গেল সোজা বোলার সাকিবের কাছে। বলটি ধরেই বিদ্যুৎগতিতে তা উইকেটের একটু বাইরে থাকা সাক্সেনার দিকে ছুড়ে মারেন সাকিব। সাক্সেনা ঠিক সময়ে মাথা না সরালে বল গিয়ে লাগত হার হেলমেটে। ঘটনায় হকচকিয়ে গেলেন সাক্সেনা। এটুকু হলে কথা ছিল, অগ্নিগর্ভ চোখে এগিয়ে গিয়ে কিছু উত্তপ্তবাক্য সাক্সেনাকে শুনিয়ে আসেন সাকিব। চমকে যাওয়া সাক্সেনা শুধু বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলেন। এটা কী হলো!

সত্যিই ভারতের কাছে ব্যাপারটি ‘এটা কী হলো’র মতোই। টানা ১১ ম্যাচ জয়ের রেলগাড়ি ছুটিয়ে ফাইনালে আসে তারা। টুর্নামেন্টের পাঁচ ম্যাচে ভারতের দুই ওপেনারই ম্যাচ জিতিয়েছেন। কোনো ম্যাচেই সাকিবের এই বলের মতো নাস্তানাবুদ হতে হয়নি তাদের। ফাইনালের মতো ম্যাচে তো আরও ভালো হওয়ার কথা। কিন্তু সাকিবের ওই বলে তো বটেই, বাংলাদেশ পেসারদের সামনে এদিন ছোট দলের ব্যাটসম্যান হয়ে গেল তারা। তাই রান এলো মাত্র ১৭৭। গত ১৩ ম্যাচে এই প্রথম অল আউট ভারত।

৭ ওভার পর্যন্ত রানই তুলেতে পারেননি ভারত যুবারা। প্রথম বাউন্ডারি এসেছে ৭.৪ ওভারে। তার আগেই সাকিবের চোখরাঙানিতে হৃদয়ে কাঁপন ধরা সাক্সেনা ফিরে যান ২ রানে। প্রথম পাওয়ার প্লের ১০ ওভারে ভারত করতে পারে ১ উইকেটে ২৩। ১৫ ওভারে ১ উইকেটে ৪৪। ২০ ওভারে ১ উইকেটে ছিল ৬৩। জাতীয় দলের মতো ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ব্যাটিং লাইনও শক্তিশালী করে গড়ে তোলা হয়েছে। সেই শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনের কোমর ভেঙে দিয়েছেন বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলাম, তানজিম হাসান সাকিব ও ফাইনাল খেলতে নামা অভিষেক দাশ। এ টুর্নামেন্টে প্রথম পাওয়ার প্লেতে এর আগে সবচেয়ে কম রান ছিল ভারতের, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১ উইকেটে ৩৫। শরিফুল, সাকিবদের নিখুঁত লাইন-লেন্থের ওভারগুলো দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছিল ভারতের দুই ওপেনার যশস্বী জয়সেওয়াল ও সাক্সেনার জন্য। সাকিবই তিন ওভারের দুটিতে মেডেনসহ দেন মাত্র ১ রান। তার সংহারমূর্তি সবকিছু কঠিন করে দেয় ভারতের জন্য।

শুরুটা এসেছে সেই টস জয় থেকে। আগের রাতে বৃষ্টির কারণে পিচে বেশ ময়েশ্চার ছিল। ভাগ্য এদিন শুরু থেকেই বাংলাদেশের পক্ষে। টস জিতে বোলিং নিলেন অধিনায়ক আকবর আলী। এরপর তার পেসাররা হাতে-হাত মিলিয়ে এগিয়ে গেলেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন বিধ্বংসী বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলাম। সম্ভবত এখন পর্যন্ত ক্যারিয়ারের সেরা ম্যাচটি খেললেন এ তরুণ। দুই উইকেট, দুই ক্যাচ ও একটি রান আউট। সবকটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, ওগুলো না হলে ভারতের ইনিংসটা এত কম রানে শেষ হতো না। শরিফুলের প্রথম স্পেল ছিল ৩ ওভারের। তাতে মাত্র ৭ রান দিয়েছেন। পরের স্পেলে করেছেন ২ ওভার, তাতে ৫ রান। এরপর ফেরেন ৩৮তম ওভারে। ৪০তম ওভারে তুলে নেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জয়সেওয়ালের উইকেটটি। ১২১ বলে ৮৮ করে টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরির দিকে এগোতে থাকা ভারতের টুর্নামেন্টসেরা ব্যাটসম্যানকে তানজিদ হাসান তামিমের ক্যাচ বানান শরিফুল। পরের বলেই সিদ্ধেস বীরকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা জাগান। ইনিংস শেষে সাফল্যের রহস্য শরিফুল জানান এভাবে, ‘আমরা নেটে প্রচুর প্রাকটিস করি নতুন বলে এক জায়গায় বল করার জন্য। এখানে সেটা হয়েছে। ফিল্ডিং খুব ভালো ছিল। (ফয়সাল হোসেন, ফিল্ডিং কোচ) ডিকেন্স স্যার দুই বছর ধরে আমাদের সঙ্গে কাজ করছেন। কাজটাকে উপভোগ করছি। আজ ফিল্ডিং সবদিক দিয়েই সফল হয়েছে।’

তবে শরিফুল নয়, উইকেট নেওয়ার শুরুটা করেছিলেন অভিষেক দাশ, সাক্সেনাকে ফিরিয়ে। জয়সেওয়াল ও তিলক ভার্মা ৯৪ রানের জুটি গড়ে এগোচ্ছিলেন। এ জুটি থামান সাকিব। ৩৮ রানে ফেরেন তিলক, শরিফুলের প্রথম ক্যাচ। পরে অধিনায়ক প্রিয়ম গর্গকে ৭ রানে ফেরান টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের হ্যাটট্রিকম্যান স্পিনার রাকিবুল। এরপর ধ্রুব জুরেল ও জয়সেওয়াল বাংলাদেশকে জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু শরিফুলের ৪০তম ওভারে ১৫৬ রানে থামে সেই চেষ্টা। সেখান থেকে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ভারত। ১৫৬ রান থেকে পরের ২১ রান তুলতে তাসের ঘরের মাতো বাকি ৭ উইকেট হারায় দলটির। ২২ রান করা জুরেলের আউটটি ছিল হাস্যকর। অথর্ব আনকোলেকার ও জুরেল একপ্রান্তে চলে যান। ঠিক যেন ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের কাশিম আকরামের রান আউটটি। শেষ ভরসা হিসেবে আনকোলেকার ও রবি বিঞ্চুয়ের তাকিয়ে ছিল ভারত। তখনো সাত ওভার বাকি। বিষ্ণুয়কে নিজের বলেই দৌড়ে গিয়ে রান আউট করেন। পরের ব্যাটসম্যান সুশান্ত মিশ্রার আউটে থার্ডম্যানে দুর্দান্ত ক্যাচ ধরেন শরিফুল। সাকিবের বলে উড়িয়ে মেরেছিলেন মিশ্রা। কয়েক গজ দৌড়ে সামনে ডাইভ দিয়ে শরিফুল ক্যাচটি নেন। এখানেই থামে ভারতের ইনিংস। এর আগে আনকোলেকারকে বোল্ড করেন অভিষেক। কার্তিক তিয়াগিকেও তুলে নেন তিনি।