উৎপাদন, বিপণন ও প্রচার-প্রচারণা সবকিছু নিষিদ্ধ হওয়ার পরও থেমে নেই তামাক চাষ। গোটা জেলা এখন ছেয়ে গেছে তামাক পাতায়! লাভের আশায় কৃষকরা অন্য ফসলের পরিবর্তে ঝুঁকছেন তামাক চাষে। কোম্পানিগুলো বীজ, সারসহ বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দিয়ে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছে। আস্তে আস্তে জেলার মাটির উর্বরতা শক্তি কমে গিয়ে পরিবেশসহ অন্যান্য ফসল চাষে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি বছর জেলার পাঁচ উপজেলায় ৮ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। গত বছর এর পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ১৩০ হেক্টর। তবে স্থানীয় চাষিরা বলছেন, আবাদ জমির পরিমাণ ১২ হাজার হেক্টর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লালমনিরহাটে জাপান টোব্যাকো, আবুল খায়ের টোব্যাকো, নাসির টোব্যাকো, আকিজ টোব্যাকো ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিডিসি) নামের তামাক কোম্পানিগুলো ব্যবসা করে আসছে। বিকল্প ফসল উৎপাদনে বীজ প্রাপ্তিতে জটিলতা, উৎপাদন খরচ বেশি, পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তামাক চাষে চাষিদের আগ্রহ বেশি। তার ওপর তামাক কোম্পানিগুলো ঋণ দিয়ে চাষিদের উদ্বুদ্ধ করছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, তামাক ঘিরে এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা দেশব্যাপী বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিনা পুঁজিতে তামাকের ব্যবসা করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতেন। সেই সময় বিড়ি, সিগারেট, গুল, জর্দাসহ তামাক সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে এ অঞ্চলে। এলাকার চাষিদের প্রয়োজন সামনে রেখেই তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকারের সার্ভে অনুযায়ী, ১৯০৮ সালে রংপুরের বুড়িরহাটে স্থাপিত হয় তামাক গবেষণা কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠানটি সেই সময়ে দেশের ভেতর এবং বিদেশ থেকে ১১৪ তামাকের জাত সংগ্রহ করে। এ ছাড়া সুরভি ও সুগন্ধি নামক উচ্চফলনশীল দুটি জাতসহ নতুন নতুন তামাকের জাত উদ্ভাবন করে। পরবর্তী সময়ে তামাকের ক্ষতিকারক দিক বিবেচনা করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এর চাষে নিরুৎসাহিত করা হয়। এর অংশ হিসেবে একসময় তামাক ক্রয়ের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানির (বিটিসি) রংপুর ডিপো বন্ধ হয়ে যায়। তামাক গবেষণা কেন্দ্রটি রূপ পাল্টে পরিণত হয় কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে। ১৯৮৫ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি বিকল্প হিসেবে ভুট্টা, সূর্যমুখী, সরিষা, বাদামসহ শাকসবজি চাষ করে চাষিরা যাতে তামাকের চেয়ে বেশি লাভ পেতে পারে সেই বিষয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। তারপরও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্ষতিকর তামাকের চাষ।
লালমনিরহাট সিভিল সার্জন মো. কাশেম আলী বলেন, ‘তামাক চাষে অর্থনৈতিক মুক্তি থাকলেও এর ক্ষতির কথাটি কেউ বিবেচনা করছে না। এ অঞ্চলে তামাক চাষের কারণে জড়িতদের শ্বাসকষ্ট ও চর্ম রোগ দেখা দিয়েছে।’