‘খারাপ সময় আসবে এটাই ক্রিকেটারের জীবন’

পুরোপুরি দুঃসময় বলা যাবে না। আবার তার মানের ব্যাটসম্যানের তুলনায় একেবারে কমও ছিল না। আত্মবিশ্বাসের পুরোটা, মানসিক স্বস্তির সবটুকু ফিরে পেতে অন্তত একটা সেঞ্চুরি দরকার ছিল। আরও বেশি দরকার ছিল তামিমের তার মতো খেলা। ১৫৮ রানের ইনিংসে ওই দুই শর্তই কেবল পূরণ করেনি, বাংলাদেশের ইতিহাসের নতুন রেকর্ড ইনিংস তামিমের বুকের ওপর থেকে জগদ্দল পাথুরে উপত্যকা উপড়ে ফেলে চাষ করেছে সুরভিত ফুলের বাগান। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে খেলা ইনিংসের আগে-পরের নানান বৃত্তান্ত নিয়ে গতকাল সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হলেন তামিম। হাফ ছেড়ে বাঁচা ইনিংস খেলার পরের আলাপের প্রায় পুরোটা ‘দেশ রূপান্তর’-এর পাঠকদের জন্য।

ইনিংসটা আপনার জন্য কেমন? নিশ্চয়ই এখন চাপমুক্ত?

তামিম ইকবাল : অবশ্যই। চাপে তো ছিলাম। ছিলাম না বললে মিথ্যে কথা বলা হবে। কিন্তু আমার মতে, ভালো জিনিস হলো আমি খুব ভালো ব্যাট করছিলাম। হয়তো অত বড় রান করতে পারছিলাম না। এমনকি প্র্যাকটিসেও আমি খুব ভালো ব্যাট করছিলাম। তো বিশ্বাস ছিলই যে এটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। বড় হয়ে যাবে, হয়ে যাবে... দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক দিন ধরেই হচ্ছিল না। আর অনেককেই এটার পেছনে ক্রেডিট দেওয়া উচিত। টিম ম্যানেজমেন্ট বলেন বা আমার টিমমেটরা বলেন। তারা বিশ্বাস ধরে রেখেছিলেন। হয়তোবা আমি যখন একটু হতাশ হয়ে যাচ্ছিলাম তখন তারা নিশ্চিত করছিলেন তা যেন না হয়। সাধারণত এই ধরনের সময় গেলে আশপাশে খুব কম মানুষকেই খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু যারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমার জন্য...টিমমেটস আর ম্যানেজমেন্ট...ওরা সবসময় আমাকে সাপোর্ট করেছে। এমনকি বোর্ড থেকেও, এটা না বললেই নয়, শেষ খেলার আগের দিন আমাকে প্রেসিডেন্টও ফোন করেছেন। উনি অনেক সুন্দর কিছু কথা আমাকে বলেছেন।

বিশেষ করে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে আপনার ব্যাটিংয়ের ধরন বদলেছিল। ‘অ্যাঙ্কর’ হয়েছিলেন। ধরে খেলছিলেন। বড় ইনিংসের জন্য শুরুতে শট কম খেলছিলেন। এই ইনিংসে আপনাকে আবার পুরনো মেজাজে দেখা গেল। মাঝে কি একটু দ্বিধায় ছিলেন?

তামিম : সত্যি কথা বলতে আমি কাল (মঙ্গলবার) আলাদা কোনো কিছুই করিনি। প্রথমে দু-তিনটা বাউন্ডারি বেশি পেয়ে গেছি। ওটা পক্ষে গেছে। একটা ওভারে দু’টা বল পায়ের ওপর ছিল। ফ্লিক করে চার মেরে দিয়েছি। কিন্তু একশোর আগে কোনো সময় এমন দেখবেন না যে আমি সামনে গিয়ে বড় শটস খেলেছি। আমার সবই কিন্তু ক্রিকেটিং শটস। গ্যাপে চলে গিয়ে বাউন্ডারি হয়েছে। আগের দিন গ্যাপে যায়নি বলে বাউন্ডারি হয়নি। বল আর রান প্রায় সমান ছিল বলে মনে হয়েছে যে আমি অনেক কিছু বদলে ফেলেছি। আসলে তা নয়। আমি সবসময় যে ধরনের মাইন্ডসেটে ব্যাট করি সে রকমটা নিয়েই ব্যাট করেছি। আপনার ইনটেন্ট যদি সবসময় ঠিক থাকে, পজিটিভ থাকে তাহলে...আমি ওই ইনটেন্টটা নিয়েই ব্যাট করেছি।

ডাবল সেঞ্চুরির কথা ভেবেছিলেন?

তামিম : সত্যি কথা তখন ওরকম কিছু ভাবিনি। আরও ৫ ওভার যখন ছিল,  তখন একটা ওভারে যদি আমি ১৫/২০ নিতে পারতাম তাহলে একটা সুযোগ থাকলে থাকতে পারত। কিন্তু যেহেতু এটা ৪২ রান দূরে ছিল, এখন যদি আমি বলি না, ভেবেছিলাম, তাহলে ঠিক বলা হবে না। যদি ১৫/২০ রান দূরে থাকতাম তাহলে অবশ্যই বলতাম যে ভেবেছি। কিন্তু আমি ওরকম কিছু ভাবিনি।

ওই সময় একটা জিনিসই মনে হচ্ছিল যে দ্বিতীয় ভাগে উইকেটটা প্রথম ভাগের চেয়ে ভালো হয়ে যায়। আমরা একজন ব্যাটসম্যান কম নিয়ে খেলেছি। এটাই চেষ্টা করছিলাম যে ওভার বেশি থাকতে আমি আউট না হয়ে যাই। আমি আউট হয়ে গেলে ওরকম ব্যাটসম্যান ছিল না। ক্যালকুলেটেড রিস্ক নিয়ে ব্যাট করছিলাম। ২০০৯ সালে ১৫৪ রানের ইনিংসটা খেলেছিলেন সেই ম্যাচে যেটায় বাংলাদেশ ৩১৮ তাড়া করে জেতে। এবার ১৫৮। দুটির মধ্যে কোন ইনিংসকে এগিয়ে রাখবেন?

তামিম : অবশ্যই ২০০৯-এরটা। ওই প্রথমবার আমরা ৩০০ প্লাস রান তাড়া করে জিতেছিলাম। ওই সময়ের ৩০০ এখনকার ৪০০ রান। তখন যে তাড়া করতে পারব এই বিশ্বাসটাই হয়তোবা আমাদের খুব বেশি মানুষের ছিল না। কিন্তু ওই ম্যাচে যেভাবে আমরা ইনিংসটা গড়েছিলাম, সে কারণে ইনিংসটাকে আমি এগিয়ে রাখব।

ওয়ানডেতে ৭ হাজার রান হলো। কত রান করে ক্যারিয়ার শেষ করতে চান?

তামিম : কোনো সময় আমি লক্ষ্য নির্ধারণ করি না। কোনো ক্রিকেটারের কাছে জানতে চাওয়া হলে সে বলবে ১০ হাজার রান করবে। কিন্তু আমি কোনো সময় এটা নিয়ে চিন্তা করি না। যা হচ্ছে ওটা নিয়েই থাকতে পছন্দ করি।

খারাপ সময়গুলোকে কাটিয়ে উঠতে এখন কতটা পরিণত মনে হয় নিজেকে?

তামিম : ২০১৫ থেকে... ২০১৯ থেকে... খুব ভালো ছন্দে ছিলাম। তখনো কিন্তু সাক্ষাৎকারে বলেছি, খারাপ সময় আসবে। তখন প্রশ্ন হতো, ২০১৫ সালে কীভাবে উত্তরণ ঘটিয়েছেন? আমি আবারও বলি, এরকম সময় আবার আসবে। এটাই ক্রিকেটারের জীবন। আমি চেষ্টা করতে পারি যাতে ওই সময়টা দেরিতে আসে।

মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা আছে আপনার। তিনি কিন্তু আপনার ৩৩৪ নট আউটের রেকর্ডও ভেঙে ফেলতে চান।

তামিম : মুশফিক আমার রেকর্ড ভাঙার জন্য অনেক যোগ্য। শুধু সেই নয়, আমাদের দলের তরুণ খেলোয়াড় যারা আছে লিটন, শান্ত তারাও খুব সামর্থ্য রাখে। শান্ত তো কাছাকাছি ছিল, ধরেই ফেলেছিল। আমার কাছে মনে হয় না রেকর্ডটা বেশি দিন থাকবে। অনুমান করছি হয়তোবা দুই-তিন বছরের মধ্যেই ভেঙে যাবে। আগামী বছরও ভেঙে যেতে পারে।