‘সংশপ্তক’ মাশরাফীকে মনে রাখতেই হবে

‘অধিনায়ক’ মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা অবশেষে থামছেন। অবশেষে কথাটি আসছেই। কেননা কবে থামবেন মাশরাফী, এ নিয়ে কম জল তো ঘোলা হয়নি। বিশ্বকাপের আগে থেকেই ভক্তদের মন কৌতূহলী হয়েছে। সেটা শুধু অধিনায়ক মাশরাফীর থেমে যাওয়া নিয়ে নয়, খেলোয়াড় মাশরাফীর থামা নিয়েও।

একজন ‘সংশপ্তক’ মাশরাফী ৩৬ বছর বয়সেও জানিয়ে দিয়েছেন, মাঠের ক্রিকেটটা চালিয়ে যাবেন তিনি। দল চাইলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটও খেলবেন। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটে নিজের অধিনায়ক অধ্যায়ের ইতি টেনে দিলেন তিনি।

শুক্রবার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ম্যাচ সিরিজের শেষ ওয়ানডেতে শেষ বারের মতো টস করতে নামবেন মাশরাফী। সেই মাশরাফী, ওয়ানডে ক্রিকেটে যিনি এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে সফল অধিনায়ক। ৮৭ ওয়ানডেতে নেতৃত্ব দিয়ে ৪৯ ম্যাচে জয় উপহার দিয়েছেন দেশকে। সরে যাওয়ার আগে যার সামনে ওয়ানডেতে অধিনায়ক হিসেবে জয়ের ফিফটি পূরণ করার সুযোগ।

তার নেতৃত্বেই ২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে খেলে বাংলাদেশ। ২০১৫ বিশ্বকাপে খেলে কোয়ার্টার ফাইনালে। ২০১৮ সালে ওয়েস্ট সফরে সিরিজ জয়, এশিয়া কাপের ফাইনালে ওঠার কৃতিত্বও দেখায় টাইগাররা।

২০১৯ বিশ্বকাপের আগে আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে ট্রফি জয় করে বাংলাদেশ মাশরাফীর নেতৃত্বেই। যা বহুজাতিক আসরে বাংলাদেশের প্রথম শিরোপা।

২০১৭ সালে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটকে বিদায় বলার আগে এই ফরম্যাটেও মাশরাফীর নেতৃত্বে সময়টা খারাপ কাটেনি বাংলাদেশের। ২৮ টি-টোয়েন্টিতে নেতৃত্ব দিয়ে ১০টিতে জয় পান মাশরাফী। বাংলাদেশ ২০১৬ এশিয়া কাপের ফাইনালেও খেলে তার নেতৃত্বে।

২০০৯ সালে প্রথম দফায় যখন অধিনায়কত্ব পান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে টেস্ট দিয়ে শুরু হয় মাশরাফীর অধিনায়ক অধ্যায়। তবে এক টেস্টের বেশি নেতৃত্ব দিতে পারেননি। অবশ্য এক টেস্ট না বলে অর্ধেক বলাই ভালো। অধিনায়ক হিসেবে প্রথম টেস্টের মাঝ পথেই ছিটকে যান। যে টেস্ট ক্যারিয়ারেই শেষ টেস্ট হয়ে আছে মাশরাফীর। তবে বাংলাদেশের জয় ছিল সেই ম্যাচে।

এসব পরিসংখ্যান। কিন্তু একজন অধিনায়ক মাশরাফীকে কী আর শুধু পরিসংখ্যানে মাপা যায়?

ক্যারিয়ার জুড়ে ইনজুরির সঙ্গে লড়তে হয়েছে তাকে। দুই হাঁটুতে অস্ত্রোপচার হয়েছে সাত বার। ২০১১ সালে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপের দলে ঠাঁই না পাওয়া মাশারফীর কথা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। দলে জায়গা না হওয়ার পর মিরপুরে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অঝোরে কেঁদেছিলেন মাশরাফী। সেদিন কজনই বা ভেবেছিলেন, মাশরাফী আবার ফিরবেন?

কিন্তু তিনি তো মাশরাফী। আগেও যিনি ফেরার উদাহরণ তৈরি করেছিলেন। করেছেন ২০১১ বিশ্বকাপের পরও। ২০০৯ সালে মোহাম্মদ আশরাফুলের হাত থেকে নেতৃত্ব পাওয়ার পর সে দফায় লম্বা হয়নি তার অধিনায়ক অধ্যায়। ইনজুরি কাটিয়ে দলে ফেরার পর এক দফায় অধিনায়কও হলেন। ২০১০ সালে তার নেতৃত্বেই ইংল্যান্ডকে প্রথমবারের মতো হারায় বাংলাদেশ। সেটিও ইংল্যান্ডের মাটিতে।

এরপর আবার তার ছিটকে যাওয়া ইনজুরির কারণে। ২০১১ বিশ্বকাপের পর ইনজুরি থেকে সেরে উঠে দলে ফেরেন। প্রথমে নিজের জায়গা পাকা করতে হলো দলে। সে গল্পটাও লড়াকু মাশরাফীর কথা বলে।

২০১৪ সালটা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য হয়ে এলো আঁধারে ঢাকা। টানা ব্যর্থতার বৃত্তে বন্দী দলের ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি নেতৃত্বে বদল এল। মুশফিকুর রহিমকে সরিয়ে নেতৃত্ব তুলে নেওয়া হলো মাশরাফীর হাতে। শুরু হলো বাংলাদেশের ক্রিকেটের স্বপ্নময় যাত্রা।

২০১৪ সালেই ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ দিয়ে যার শুরু। এরপর ২০১৫ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা। বিশ্বকাপ খেলে ফেরার পর ঘরের মাঠে একে একে পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়। ওয়ানডে ক্রিকেটে সমীহ জাগানিয়া এক শক্তি হিসেবেই পরিণত হলো বাংলাদেশ।

মাশরাফীর সবচেয়ে বড় গুণ যেটি, গোটা দলকে এক সুতোয় বাঁধার কাজটা করেছেন তিনি। কখনো কখনো হয়তো শুধুই অধিনায়ক মাশরাফীর গুণগান এতটাই বেশি হয়েছে যে, খেলোয়াড় মাশরাফী আড়ালে চলে গেছেন। কিন্তু পারফরম্যান্স বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাশরাফী সেখানে পিছিয়ে ছিলেন না কখনোই।

২০১৭ সালে যখন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ছাড়ার ঘোষণা দিলেন, তখন তাই সবার মাঝে হাহাকারই তৈরি হলো। ‘কেন ছেড়ে দিলেন মাশরফী?’ ২০২০ সালে এসে যখন ওয়ানডের নেতৃত্ব ছাড়লেন, তখন ঠিক সেই পরিবেশটা নেই। বরং ভবিষ্যতের জন্যই হয়তো নতুন কারো প্রয়োজন অনুভব হচ্ছিল।

কিন্তু সেই নতুনের জন্যও তো উদাহরণ মাশরাফীই। একজন ‘সংশপ্তক’ মাশরাফী।