অকেজো সিসি ক্যামেরায় বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকি

চুরি, ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপরাধ দমন এবং সার্বক্ষণিক নাগরিক নিরাপত্তার কথা ভেবে চট্টগ্রাম নগরজুড়ে ২০১৪ সালে সিসি ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নেয় নগর পুলিশ। এর অংশ হিসেবে প্রথম ধাপে ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ১১০টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। এর বাইরে ব্যক্তিগত কিংবা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও অফিস এবং স্থাপনার সামনে ক্যামেরা লাগানো হয়। গত বছর সিসি ক্যামেরা লাগানোর এই কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়। তবে সম্প্রতি নগরীর ষোলশহর ২ নম্বর গেট এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ বক্সে বোমা বিস্ফোরণের পর এখন এমন তথ্য বেরিয়ে আসছে যে নগরীতে সিএমপির তত্ত্বাবধানে লাগানো অধিকাংশ সিসি ক্যামেরাই বিকল হয়ে পড়ে আছে।

সিএমপির জনসংযোগ শাখার তথ্যানুযায়ী, নগরীতে পুলিশের তত্ত্বাবধানে স্থাপন করা ২৯টি আইপি ক্যামেরার মধ্যে সচল আছে ১৯টি। আর ৭৫টি (ম্যানুয়েল) সাধারণ ক্যামেরার মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র ৬টি। সব মিলিয়ে পুলিশের তত্ত্বাবধানে স্থাপন করা মোট ১০৪টি ক্যামেরার মধ্যে সচল আছে মাত্র ২৫টি।

সরেজমিনে নগরীর আগ্রাবাদ, হালিশহর, দেওয়ানহাট, দামপাড়া, জিইসি, ষোলশহর, বহদ্দারহাট, টার্মিনাল ও চান্দগাঁও ঘুরে দেখা যায়, সব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নেই সিসি ক্যামেরা। আবার কিছু জায়গায় থাকলেও তা অপরিকল্পিতভাবে স্থাপন করা। গুরুত্বপূর্ণ ওই সব পয়েন্টে ক্যামেরা লাগানো হলেও রাতে কম আলোয় কোনো ছবিই ধারণ করতে পারে না। হয় ওই সব ক্যামেরা ঢাকা পড়েছে বৈদ্যুতিক খুঁটিতে, না হয় ডিশ লাইনের তারের সঙ্গে। ফলে এসব ক্যামেরায় ভালো রেজল্যুশনের ফুটেজ পাওয়া যায় না। অন্যদিকে নগরীর আলমাস মোড়, কাজির দেউড়ি মোড় ও মইজ্জারটেকসহ প্রায় ১৫টির বেশি জনসমাগমপূর্ণ স্থানে কোনো সিসি ক্যামেরাই নেই। অকেজো ও সিসি ক্যামেরা না থাকায় স্পর্শকাতর অপরাধের ঘটনাগুলো তদন্তে হিমশিম খাচ্ছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।

সর্বশেষ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে ষোলশহর ২ নম্বর গেট এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ বক্সে বিস্ফোরণে পাঁচজন আহত হয়। এটা পুলিশ প্রথমে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে বিস্ফোরণ বলে মনে করলেও প্রাথমিক তদন্তের পর জানিয়েছে, পরিকল্পিতভাবে নাশকতার উদ্দেশ্যে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে পুলিশ বক্সে। ওই ঘটনায় সিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিট তদন্তে নামে। কিন্তু ঘটনাস্থলের আশপাশে কোনো সিসি ক্যামেরা সচল না পাওয়া যাওয়ায় অপরাধী শনাক্তে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, ওই ট্রাফিক বক্সের আশপাশে কোনো সিসি ক্যামেরা সচল পাওয়া যায়নি। পুলিশ বক্সের ৫০ গজের মধ্যে বিপ্লব উদ্যানের সামনে থেকে নাসিরাবাদমুখী দুটি ক্যামেরা আছে। এ ছাড়া বিপ্লব উদ্যানের উল্টো দিকে মসজিদ থেকে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সামনের সড়ক অভিমুখী একটি ক্যামেরা আছে। তিনটি ক্যামেরাই গত ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে অচল হয়ে আছে।

এদিকে চট্টগ্রামে বেশির ভাগ খুন, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত অপরাধী শনাক্ত করা হয়েছে বিভিন্ন ভবনে লাগানো ব্যক্তিমালিকানাধীন সিসি ক্যামেরা থেকে। আর যেসব বাসা বাড়ি ও অফিসে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে, সেগুলোর রেজল্যুশন অনেক কম। আর এ কারণে দূরের ভিডিওগুলো অনেকটা অস্পষ্ট। সাম্প্রতিক সময়ে খুন, ছিনতাই, অপহরণসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বাড়ায় ক্ষুব্ধ নগরবাসী ক্ষোভ ঝাড়ছেন পুলিশের ভূমিকা নিয়ে। সনাক-টিআইবির চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি অ্যাডভোকেট আক্তার কবির চৌধুরী বলেন, ‘নাগরিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে যারা এর দায়িত্বে তারা দায় এড়াতে পারেন না। দ্রুত ক্যামেরাগুলো মেরামত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আরও ক্যামেরা স্থাপন না করা গেলে নগরীতে অপরাধপ্রবণতা বাড়বে।’

এ ব্যাপারে জানতে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ মাহবুবর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চালু তো আছে কিছু ক্যামেরা। তবে কিছু ক্যামেরা নষ্ট হয়ে গেছে সংস্কারের অভাবে। আবার উদ্যোগ নিচ্ছি চালু করার জন্য। আমাদের তো প্রকল্প নেই। এগুলো স্থাপন ও নিয়মিত দেখভাল এবং সংস্কার করা মূলত সিটি করপোরেশনের কাজ। তারা করে না বলেই আমরা অস্থায়ী ভিত্তিতে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার ধনাঢ্য ব্যক্তির সহযোগিতা এবং আমাদের সামর্থ্যরে মধ্যে যা আছে তাতেই করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সিটি করপোরেশনকে অনুরোধ করেছি তারা যেন এ কাজটি করে। এখন নিরাপত্তার কারণে আমরা বন্ধ সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো চালু করার কাজ করছি।’