অগ্নিঝুঁকিতে অধিকাংশ বহুতল ভবন

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এলাকায় নির্মিত অধিকাংশ আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক পর্যায়ের সাততলা থেকে শুরু করে সুউচ্চ ভবনগুলো। এসব আবাসিক ও বাণিজ্যিক বেশিরভাগ ভবনেই নেই আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। গুটিকয়েক বাণিজ্যিক ভবনে আগুন নেভানো বা প্রতিরোধের ব্যবস্থা থাকলেও অধিকাংশ ভবনই অগ্নিঝুঁকি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে নগরীর আবাসিক ও বাণিজ্যিক বহুতল ভবন মালিকরা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের অনুমোদন ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছাড়া কীভাবে এসব ভবন গড়ে উঠল তা নিয়ে নগরবাসীর সমালোচনার মুখে রয়েছে নগর কর্তৃপক্ষ। এ পরিস্থিতিতে নগর কর্তৃপক্ষও বহুতল ভবনগুলোর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ে বিপাকে রয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী পাঁচতলা থেকে বহুতল যেকোনো ভবনে অগ্নিনির্বাপণের পরিপূর্ণ ব্যবস্থা থাকতে হবে। যার মধ্যে থাকবে হাইডেন্ট সিস্টেম, স্প্রিংলার সিস্টেম ও হোস পাইপসহ সংশ্লিষ্ট নানা সরঞ্জাম। থাকবে জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি ও

রাস্তা। যার কোনোটিই নেই কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এলাকার বহুতল ভবনগুলোতে। এ পরিস্থিতিতে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, অপরিকল্পিত ভবনগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের কারণে যেকোনো সময় ঘটতে পারে প্রাণহানির ঘটনা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কুমিল্লা নগরীসহ শহরতলির আনাচে-কানাচে প্রতিনিয়তই নির্মিত হচ্ছে ছোট-বড় দালান ও সুউচ্চ বহুতল ভবন। সিটি করপোরেশন গঠন হওয়ার পর গত ১০ বছরে নগরীতে কয়েক হাজার ছোট-বড় নতুন ভবন তৈরি হয়েছে। এসব ভবনে অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থাই নেই। কাগজে-কলমে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের অনুমোদন থাকলেও নকশা এবং ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া ছাড়পত্র অনুসরণ করছে না কোনো ভবন মালিকই।

ছয়তলার উপরের ভবন মূলত হাইরাইজ বা সুউচ্চ ভবন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে। কুমিল্লা নগরীতে এমন সুউচ্চ ভবন রয়েছে পাঁচশোর বেশি। এসব ভবনের বেশিরভাগেই নেই পর্যাপ্ত ও আধুনিক মানের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। নগরীতে এমনসব বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে যেখানে ভবনের পাশে নেই পর্যাপ্ত রাস্তা। ফলে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করা তো দূরের কথা মানুষ প্রবেশ করাই কঠিন হয়ে পড়বে। নকশা এড়িয়ে নিজেদের মতো করে নির্মিত এসব বাড়িঘরে আগুন লাগলে দুর্ঘটনাকবলিতদের উদ্ধার করার মতো কোনো সুযোগই নেই। এছাড়া আগুন লাগলে জরুরি অবস্থায় বের হওয়ার সিঁড়িও নেই অধিকাংশ ভবনে।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরীর হাউজিং এস্টেট, চকবাজার, ডিগাম্বরীতলা, কাপড়িয়াপট্টি, গোয়ালপট্টি, রাজগঞ্জ, বজ্রপুর, নানুয়াদীঘির পাড়, দারোগাবাড়ী এলাকা, মনোহরপুর, চর্থা, টমছম ব্রিজ, শাকতলা, ইপিজেড এলাকা, পদুয়ার বাজার, পুলিশ লাইন, ঝাউতলা, তালপুকুর পাড়, বাদুরতলা, নজরুল অ্যাভিনিউ এলাকা, রেসকোর্স, কাপ্তান বাজার, গাংচর, মোগলটুলি, শুভপুর ও চানপুরে বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। অথচ এসব ভবন মালিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না রেখেই পেয়ে গেছে ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কুমিল্লা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোথাও আগুন লাগলে তা নিয়ন্ত্রণে তারা পুরনো সরঞ্জামের ওপর নির্ভরশীল। ছয়তলার ওপরের ভবনের আগুন নেভানোর মতো পর্যাপ্ত ও আধুনিক সরঞ্জাম কুমিল্লা ফায়ার সার্ভিসের নেই। এছাড়া রয়েছে জনবল সংকট। এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘কুমিল্লা নগরী ও আশপাশের এলাকায় প্রতিনিয়ত বড় বড় আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন গড়ে উঠছে। এসবের মধ্যে বিশেষ করে ৬/৭ তলার যেসব আবাসিক ভবন রয়েছে তার বেশিরভাগেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কুমিল্লা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক জসিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছাড়াই অনেক ভবন চালু করা হয়েছে। আমরা এসব ভবনকে চিহ্নিত করে ভবনগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা চালু করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করেছি।’