সকালের রোদ চোখে পড়ার আগেই মোবাইলের আলো ছুঁয়ে যায় কর্নিয়া। গভীর রাতের অন্ধকারেও চোখের পাপড়িতে লেগে থাকে স্ক্রিনলাইট। এ প্রজন্ম তো বটেই, পুরনো প্রজন্মের অনেকেরও এখন নিত্যদিনের অভ্যাস এটি। জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ মোবাইলের এমন ব্যবহারে কী পরিমাণ শারীরিক ক্ষতি হচ্ছে সেটি অনেকেরই অজানা।
করোনার দিনগুলোতে ঝুঁকি : বাইরে সতর্ক হয়ে চলাফেরা করে ঘরে আসার পর হাতের মোবাইল থেকে এ সময়ে শরীরে ঢুকতে পারে নভেল করোনাভাইরাস (কভিড-১৯)। জার্নাল অব হসপিটাল ইনফেকশনে প্রকাশিত একটি গবেষণায় জার্মানির গবেষকরা জানিয়েছেন, মোবাইলে করোনাভাইরাসের জীবাণু কয়েক দিন বেঁচে থাকে।
এ গবেষণাকে আমলে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (এনআইএইচ) জানিয়েছে, কপার জাতীয় পদার্থের ওপর কভিড-১৯ ভাইরাসটি চার দিন বেঁচে থাকতে পারে! তিন দিন থাকে প্লাস্টিক এবং স্টেইনলেস স্টিলের ওপর।
এ দুটি গবেষণা থেকে বোঝা যাচ্ছে মোবাইল নভেল করোনাভাইরাসের বেশ ‘প্রিয়’ জায়গা। কেননা শক্ত কাগজে এটি এক দিনের বেশি বাঁচতে পারে না। বাতাসেও তার সুবিধা হয় না, এখানে টিকতে পারে তিন থেকে চার ঘণ্টা। সেখানে প্লাস্টিক, স্টিল, কপারে কয়েক দিন!
মোবাইল থেকে করোনা যেন আক্রমণ করতে না পারে, সেজন্য সৌদি আরবের প্রাইম হাসপাতালের চিকিৎসক শ্যাম রাজমোহন গালফ নিউজের সঙ্গে আলাপকালে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন, ‘মোবাইল অন্যের কাছে দেওয়া যাবে না। যখন একাধিক মানুষ ফোনটি ব্যবহার করবেন, তখন সতর্ক হতে হবে। কোনো কাপড়ে উদ্বায়ী পদার্থের পরিষ্কারক লাগিয়ে মালিশ করা যেতে পারে।’
অনেকেই দিনে গড়ে শতবারের বেশি মোবাইল স্পর্শ করেন। করোনাভাইরাস থেকে সতর্ক থাকতে সাধারণ স্বাস্থ্য নির্দেশিকা মানতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে নিয়মিত ভালো করে হাত ধোয়া। পারলে হালকা গরম পানি ও সাবান দিয়ে ২০ সেকেন্ড হাত ধোয়া। বারবার মুখে হাত দেওয়া যাবে না। যেসব জিনিস নিয়মিত স্পর্শ করা হয়, তা জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে। টয়লেটে কোনোভাবেই ফোন নেওয়া যাবে না।
ফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাপল ও স্যামসাং কর্র্তৃপক্ষ ফোন পরিষ্কারের ক্ষেত্রে কোনো ডিটারজেন্ট, অ্যালকোহল বা অ্যামোনিয়াভিত্তিক পরিষ্কারকদ্রব্য ব্যবহার করতে নিষেধ করে। অ্যাপল জানায়, অ্যারোসল স্প্রে ও ব্লিচের ক্ষেত্রে এখনো এ সমস্যা হতে পারে। তবে অ্যাপলের সাপোর্ট পেজ বেশকিছু পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। সেখানে নতুন একটি বিভাগ যুক্ত করে কীভাবে অ্যাপল পণ্য পরিষ্কার করতে হবে, এর দিকনির্দেশনা দিয়েছে। অ্যাপলের প্রকাশ করা ওই নোট অনুযায়ী, অ্যাপল পণ্য ব্যবহারকারীরা তাদের আইফোনে ‘ক্লোরক্স ডিসইনফেকটিং ওয়াইপস’ বা একই ধরনের পণ্য ব্যবহার করতে পারেন।
স্যামসাংয়ের ক্ষেত্রেও ভেজা কাপড় ও হালকা সাবান দিয়ে ফোন পরিষ্কার করতে বলা হয়েছে। তবে ডিটারজেন্ট ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। অনেক দোকানেই ফোন ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রবান্ধব স্যানিটাইজার বিক্রি করা হয়। ফোন জীবাণুমুক্ত রাখতে এসব পণ্যেও ভরসা রাখা যায়।
চোখের সর্বনাশ : যুক্তরাজ্যের চক্ষুরোগ-চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মানুষ স্মার্টফোনে এতটাই আসক্ত হয়ে যাচ্ছে যে, তারা চোখের সর্বনাশের ঝুঁকি তৈরি করে ফেলছে। অতিরিক্ত সময় ধরে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ট্যাব ও ফ্লাট স্ক্রিন টিভি দেখার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। যে যন্ত্রগুলো থেকে আলো নির্গত হয় তা চোখের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি ও মাথাব্যথা হতে পারে।
দুই হাজার লোকের মধ্যে চালানো এক জরিপের কথা উল্লেখ করে বিবিসির প্রতিবেদনে এমনটা বলা হয়েছে। ওই জরিপে ২৫ বছরের কম বয়সীরা দিনে ৩২ বারেরও বেশি মোবাইল ফোনে চোখ রাখেন এমন তথ্য জানা গেছে।
চক্ষুরোগ-চিকিৎসক অ্যান্ডি হেপওর্থ দাবি করেছেন, মোবাইল ব্যবহারের সময় চোখের পলক কম পড়ে এবং স্বাভাবিকের তুলনায় স্মার্টফোন চোখের বেশি কাছাকাছি এনে কোনো বিষয় দেখা হয়। মোবাইল ফোনের আলো চোখের জন্য ক্ষতিকর ও বিষাক্ত হতে পারে। তাই একটানা দীর্ঘক্ষণ স্মার্টফোন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা উচিত নয়।
মস্তিষ্কে প্রভাব : মোবাইল ফোন সংক্রান্ত শারীরিক ঝুঁকির বিষয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন মোবাইল থেকে ছড়িয়ে পড়া রেডিয়েশনের বিষয়টি অনেকে সামনে টেনে আনেন। অতীতে বিভিন্ন গবেষণায় এটাও বলা হয়েছে যে, মোবাইল ফোনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার মস্তিষ্কে টিউমার সৃষ্টি করতে পারে। এ রেডিয়েশন আসলে কতটা ক্ষতিকর? সুইস গবেষক মার্টিন রুসলির মনে করেন, মোবাইল ফোনের রেডিয়েশন নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে সতর্ক হতে হবে। মস্তিষ্কের সরাসরি কোনো ক্ষতি না করলেও আমাদের ব্রেনওয়েভে পরিবর্তন আনতে পারে।
আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির ওয়েবসাইটে আবার বলা হচ্ছে, মোবাইল ফোন হয়তো ব্রেন টিউমার, মাথা বা গলার টিউমারের ঝুঁকি অনেকটা বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে একটি মাইক্রোওয়েভ যেভাবে কাজ করে, সেভাবে এমন বেতার তরঙ্গ মানুষের শরীরের কোষের উষ্ণতা বাড়িয়ে দিতে পারে। যদিও মোবাইল ফোনের বিকিরণের মাত্রা খুবই কম এবং এটা শরীরের কোষকে কতটা উষ্ণ করতে পারে, তা পরিষ্কার নয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, আগাম সতর্কতা হিসেবে ফোনের কাছাকাছি কম আসাই ভালো।
ঘুমের ছুটি : অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে ঘুমকে ছুটি দিয়ে দেয় মোবাইল। ঘুমে কীভাবে মোবাইল ব্যাঘাত ঘটায় তা নিয়ে মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ডা. সুজানা ই ফ্ললোসের দীর্ঘ গবেষণা আছে। তাকে উদ্ধৃত করে বিজনেস ইনসাইডারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘স্মার্টফোন অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে বেশি দেখা দেয় ঘুমের সমস্যা বা নিদ্রাহীনতা। যারা ঘুমাতে যাওয়ার আগে এ ধরনের প্রযুক্তিপণ্য অতিমাত্রায় ব্যবহার করেন তাদের শরীরে মেলাটোনিনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এতে স্লিপ ডিজঅর্ডারের ঝুঁকি তৈরি হয়।’
কমে যেতে পারে শুক্রাণু : একটি গবেষণার বরাত দিয়ে টেলিগ্রাফের মতো পত্রিকায় বলা হয়েছে, প্যান্টের পকেটে মোবাইল রাখার কারণে পুরুষের স্পার্ম কাউন্ট কমে যেতে পারে।
ইসরায়েলের টেকিওন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মার্থা ডার্নফেল্ড ওই গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘যারা নিয়মিত পকেটে মোবাইল রাখে তাদের সক্রিয় স্পার্মের সংখ্যা এবং গুণাগুণ বিশ্লেষণ করে আমরা হতাশ হয়েছি। সব পরিসংখ্যান নিম্নমুখী। ফোনের তাপমাত্রা এবং বৈদ্যুতিক চৌম্বকীয় ক্রিয়াকলাপ থেকে এটি হচ্ছে বলে আমাদের ধারণা।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই গবেণায় ১০০ পুরুষের স্পার্ম বিশ্লেষণ করা হয়। মার্থারের পরামর্শ, ফোন চার্জে দিয়ে কথা বলা যাবে না। পকেটেও কম রাখতে হবে।
আঙুলের সমস্যা : মোবাইলে অতিরিক্ত চ্যাটিং করার কারণে হাত এবং আঙুলে সমস্যা দেখা দেয়। চিকিৎসাবিষয়ক মার্কিন জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেটে’ ২০১৪ সালে ‘হোয়াটসঅ্যাপাইটিস’ নামে নতুন একটি রোগের কথা বলা হয়।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, দীর্ঘসময় ধরে হোয়াটসঅ্যাপে টেক্সট করায় অনেক সময় হাতের বুড়ো আঙুল থেকে শুরু করে কবজিতে খুব ব্যথা হয়। এমনকি হাতের পেশিকেও দুর্বল করে দেয়। অতিরিক্ত বার্তা আদান-প্রদান করতে গিয়ে ব্যথা উদ্রেককারী অসুখের নামই হোয়াটসঅ্যাপাইটিস। এ রোগের উপসর্গ হচ্ছে, কবজির বাইরের দিক বা বুড়ো আঙুলের দিক ব্যথা কিংবা আড়ষ্টতা তৈরি হওয়া, বুড়ো আঙুলের ভেতরের দিকে ব্যথা বা ফুলে ওঠা, হাত দিয়ে কিছু ধরতে গেলে ব্যর্থ হওয়া, বুড়ো আঙুলে ব্যথাসহ জ্বালা জ্বালা ভাব।
এ রোগ থেকে মুক্তি পেতে প্রতিষেধকের পরামর্শও দিয়েছেন চিকিৎসকরা। এর জন্য তীব্রতা অনুসারে প্রয়োজনীয় ওষুধ খেতে হবে। ঠান্ডা সেঁক দিলে পাওয়া যাবে উপকার। হাত ও কবজির ব্যায়াম তো আছেই। তবে ক্রনিক সমস্যায় লেজার বা আল্ট্রাসোনিক থেরাপি করা যেতে পারে। এমনকি পেশিতে ইনজেকশন পুশ করাসহ অপারেশন করানোর প্রয়োজন হতে পারে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
এসবের পাশাপাশি অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের কারণে হার্টের সমস্যা, শ্রবণ ক্ষমতা হ্রাসের পাশাপাশি শরীরের অস্থি-সন্ধিগুলোর ক্ষতি হতে পারে।
সামাজিক ক্ষতি : শরীরিক ক্ষতি তো থাকলই, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার ব্যক্তিগত জীবনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। স্বামী-স্ত্রীর রোমান্টিক সম্পর্কে এটিকে অন্যতম বাধা হিসেবে দায়ী করা হয়। সন্তানদের সঙ্গে অভিভাবকের দূরত্ব কমে যায়। নষ্ট হয় সামাজিক এবং পারিবারিক স্থিতিশীলতা।
মুক্তির পথ : মোবাইলের পরিমিত ব্যবহারই একমাত্র সমাধান। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমআরসি কগনিশন অ্যান্ড ব্রেইন সায়েন্সেস ইউনিটের গবেষণা ফেলো অ্যামি ওরবেন বলছেন, ‘মোবাইল ব্যবহারের প্রভাবকে সরলীকরণ করা যাবে না। এটি আগেও দেখানো হয়েছে যে স্মার্টফোনের প্রভাব সবসময় একমুখী হয় না। ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার যেমন মানুষের মেজাজে প্রভাব ফেলতে পারে, তেমনি মানুষের মন-মেজাজ স্মার্টফোন ব্যবহারের পরিমাণকে প্রভাবিত করতে পারে। শিশু ও তরুণদের মধ্যে স্মার্টফোনের ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে এবং বাচ্চারা ফোনে কতটা সময় ব্যয় করছে অভিভাবকদের তা নিয়ে সচেতন হওয়া উচিত।’