করোনাভাইরাসের কারণে গতকাল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংসের ক্যাম্প। এক সপ্তাহের ছুটি পেয়ে দলটির সব খেলোয়াড় চলে গেছেন নিজ নিজ বাড়িতে। ব্যতিক্রম মাসুক মিয়া জনি। জাতীয় দলের এই মিডফিল্ডার রয়ে গেছেন শূন্যক্যাম্পে কেবলমাত্র মাঠে ফেরার তাড়না থেকে।
গত সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের আগে চলছিল জাতীয় দলের ক্যাম্প। অনুশীলন চলাকালীন এক সতীর্থের সঙ্গে সংঘর্ষে ডানপায়ের এসিএল ছিঁড়ে যায় জেমি ডে যুগে জাতীয় দলে অটোমেটিক চয়েজ জনির। ওই চোট নিয়ে দলের সঙ্গে তাজিকিস্তান যান তিনি। তখনো চোটের ভয়াবহতা বুঝতে পারেননি। ম্যাচ না খেলে দেশে ফিরে স্ক্যান করে দেখা যায় এসিএল ছিঁড়ে গেছে তার। বসুন্ধরাকে গত মৌসুমে লিগ শিরোপা জেতাতে বড় ভূমিকা রাখা জনির ইনজুরিতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন ক্লাব কর্তারা। জাতীয় দলে থাকাকালীন চোট পাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন যখন জনির চিকিৎসার দায়িত্ব এড়িয়ে গেল, তখন বসুন্ধরা এগিয়ে আসে সহায়তার হাত বাড়িয়ে। যদিও ততদিনে কিংসের সঙ্গে চুক্তিও শেষ হয়ে গিয়েছিল জনির। ২৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর এ্যাপোলো হাসপাতালে ভারতীয় চিকিৎসক নন্দকুমার জনির পায়ে সফল অস্ত্রোপচার করেন। তারপর থেকে শুরু তার অপেক্ষা।
মাঠে ফিরতে এতটাই উন্মুখ যে সতীর্থরা চলে গেলেও ক্যাম্প ছেড়ে শ্রীমঙ্গলে থাকা নিজ পরিবারের কাছে যাননি জনি, ‘আমি পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি। ফিজিও ও ট্রেনার আমাকে কিছু হোমওয়ার্ক দিয়েছেন। সেগুলো করতে হবে বলে ক্যাম্প বন্ধ হওয়ার পরও যাইনি।’ চিকিৎসক জানিয়ে দিয়েছিলেন পুরোপুরি সেরে উঠতে এক বছর সময় লেগে যেতে পারে। কিন্তু জনি ততদিন অপেক্ষা করতে রাজি নন। তাই তো মঙ্গলবার থেকে রানিং শুরু করে দিয়েছেন। ‘সাধারণ মানুষের জন্য এক বছর সময় লাগে পুরোপুরি সেরে উঠতে। কিন্তু আমরা যেহেতু খেলোয়াড়, নিয়মিত অনুশীলনের মধ্যে থাকি, পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকি, তাই আমাদের সময় কম লাগে। আশা করছি এপ্রিলের শেষ দিকে খেলা শুরু করতে পারব। সেটা করতে পারলে হয়তো জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের বাকি ম্যাচগুলো খেলতে পারব।’
শুধু জাতীয় দল নয়, জনির বিশ্বাস এএফসি কাপে নিজ দল বসুন্ধরা কিংসকে সহায়তা করতে পারবেন তিনি, ‘লিগের প্রথমপর্ব হয়তো মিস করব। তবে এখনো জানি না লিগ আবার কবে শুরু হবে। করোনার কারণে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক সব খেলাই পিছিয়ে যাওয়ায় এখন হয়তো জাতীয় দল ও ক্লাবের কিছু বেশি ম্যাচ খেলতে পারব।’ ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের চারটিসহ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ, বঙ্গবন্ধু কাপ, এসএ গেমসের অনেকগুলো ম্যাচ খেলতে পারেননি জনি। কিংসের হয়ে ফেডারেশন কাপ ও লিগের ছয় ম্যাচ এবং এএফসি কাপের প্রথম ম্যাচ মিস করেছেন। এই খেলতে না পারাটা কত বড় হতাশার, সেটা হারে হারে টের পাচ্ছেন জাতীয় দলের কোচ জেমি ডে’র গুডবুকে থাকা জনি, ‘সত্যি খুব হতাশ লাগত যখন জাতীয় দল এবং কিংসকে ম্যাচগুলো খেলতে দেখতাম। কিন্তু চোট যে খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ারেই একটা অংশ। এটাকে এড়ানোর উপায় নেই। তবে আমি মুখিয়ে আছি মাঠে ফেরার জন্য।’ কিংসের প্রতিও কৃতজ্ঞতার শেষ নেই জনির, ‘চিকিৎসার সব দায়িত্ব ক্লাব নিয়েছে। এরপর একজন চোটগ্রস্ত খেলোয়াড়ের সঙ্গে লোভনীয় চুক্তিও করেছে। সত্যি আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। দেশে অন্য কোনো ক্লাব এতটা করবে না আমি নিশ্চিত।’
কিংসের টেকনিক্যাল ডাইরেক্টর বায়েজিদ জোবায়ের নিপুও বুঝিয়ে দিলেন জনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ তাদের জন্য, ‘জনির শূন্যতা এখনো পূরণ হয়নি দলে। ওর চোটের কারণে বিকল্প হিসেবে ফাহাদকে (আতিকুর রহমান) নিয়েছিলাম। কিন্তু ফাহাদ নিজেই আবার ইনজুরিতে পড়ায় ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের অভাবটা দলে রয়েই গেছে। এটা নিয়ে আমাদের ভুগতেও হচ্ছে। আমি তো জনিকে অনেক দিন ধরেই দেখছি। ও আসলে এ সময়ে ডিফেন্সিং মিডফিল্ডারদের মধ্যে সেরা।’ এএফসি কাপে উড়ন্ত শুরু করলেও চলতি লিগে শেষ দু’ম্যাচে হেরে বসেছে বসুন্ধরা কিংস। সর্বশেষ ম্যাচে ৩ গোলের লিড নিয়েও তারা চট্টগ্রাম আবাহনীর কাছে হেরেছে ৪-৩ ব্যবধানে। এতেই দলের রক্ষণের দুর্বলতা প্রকট হয়ে উঠেছে। নিপু মনে করেন জনি থাকলে এমনটা হতো না, ‘দেশসেরা ডিফেন্সলাইন নিয়েও লিগে এর মধ্যেই আমরা ৯টি গোল হজম করেছি ৬ ম্যাচে। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। জনি থাকলে এমনটা হবে না। কারণ ও ডিফেন্সে সবসময় সহায়তা করে। আর ওর পজিশনে খেললে আখতাম নাজারভ এবং নিকোলাস দেলমন্তের একজনকে ডিফেন্সে নিয়ে আসা যাবে।’ জনিও দেরি করতে চাইছেন না বলেই করোনাভীতির মাঝেই প্রস্তুত করে তুলছেন নিজেকে।