দুর্গাপুরের শহীদ পরিবারগুলোর দিন চলে ভিক্ষা করে

১৯৭১ সালের ২২ অক্টোবর রাতে রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ ধরে এনে উপজেলার গগনবাড়িয়া গ্রামে বেঁধে রাখে পাকিস্তানি সেনারা। পরের দিন সন্ধ্যার দিকে গগনবাড়িয়া গ্রামের একটি মাঠের মধ্যে নিয়ে গিয়ে সারিবদ্ধ দাঁড় করানো হয় সবাইকে। ১৮৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকার সাধারণ মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়। অনেককে জীবন্ত মাটিচাপা দেওয়া হয়। পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ওই দিন নিহতদের স্বজনরা প্রায় পাঁচ দশক ধরেই উপেক্ষিত। নিজেদের প্রাপ্য সম্মানটুকু না পেয়ে অনেকেই বিদায় নিয়েছেন এ জগৎ থেকে। তাদেরই কয়েকজন বেঁচে আছেন এখনো। তারা কেউ কেউ জীবন বাঁচাতে এখন ভিক্ষা করেন। মানুষের কাছে হাত পেতে যেটুকু জোটে তা-ই খেয়ে জীবন চলে। বয়সের ভারে তারা এখন প্রায় অসহায়। মানুষের কাছে চাইতে যাওয়ার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন তারা। 

পাকিস্তানি সেনাদের এই বর্বরতা ওই এলাকার মানুষের প্রায় সবারই জানা। ১৮৫ জন মানুষের শহীদ হওয়ার কথা মনে রেখেছে সাধারণ মানুষ। কিন্তু সেসব শহীদ পরিবারের খোঁজ নেওয়ার যেন কেউ নেই। গগনবাড়িয়ার এসব শহীদ পরিবারের অন্তত ৪০ জন জীবনে সংগ্রাম করতে গিয়ে ভিক্ষা করতে বাধ্য হন। বেশির ভাগই এরই মধ্যে মারা গেছেন। কেউ বয়সের ভারে কেউবা রোগে-শোকে এ জগৎ ছেড়েছেন। যে কজন বেঁচে আছেন তারা কাটাচ্ছেন মানবেতর জীবন। দিন চলছে তাদের মানুষের সহায়তা নিয়ে।

শহীদ নিবারণ প্রামাণিকের স্ত্রী সুন্দরী প্রামাণিক বললেন, ‘আমাদের যা একটু জমি ছিল সেগুলো বিক্রি করে ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছি।’ তিনি জানান, এরপর মানুষের ধান ভেঙে, মুড়ি ভেজে, বাড়িতে কাজ করে চলেছেন। প্রায় ২০ কিলোমিটার দূর থেকে মাথায় করে ২০ কেজি ধান নিয়ে এসেছেন আর সেই ধান থেকে চাল করে আবার নিয়ে গেছেন। সুন্দরী প্রামাণিক বলেন, সরকার থেকে আমাদের শহীদ পরিবার হিসেবে সামান্য কিছুও দেয়নি। এর মধ্যে তিন-চার বছর আগে ১০ কেজি চাল আর একটা কাপড় দিয়ে গেছে। এর বাইরে আর কোনো সহায়তা জোটেনি।

একই অবস্থা শহীদ শীতল চন্দ্র দাসের স্ত্রী পঞ্চমী দাসের। তিনি বলেন, আমার স্বামী যখন মারা যায়, তখন আমার ছয় মাসের ছেলে কোলে। আমি তাকে নিয়েই ভিক্ষা করে খেয়েছি। এখনো ভিক্ষা করে খাই। তবে শরীরে শক্তি না থাকায় আর ভিক্ষাও করতে পারি না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহসিন মৃধা বলেন, ‘এটা আমার নজরে আছে। এখন সামনে অনুদান পেলেই আমরা একটা ব্যবস্থা নেব। অন্তত যাতে ভিক্ষা না করে খেতে হয়।