ক্রিকেট তখন বাংলাদেশের জনপ্রিয় কোনো খেলা ছিল না, ছিল না দেশের ক্রিকেটের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপও। সেই সময় যারা ক্রিকেটকে নিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন, ক্রিকেটের জন্য নানা রকমের ত্যাগ স্বীকার করেছেন ও ক্রিকেটকে ঘিরে স্বপ্ন দেখে গেছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও আলোচিত নাম রেজা-ই-করিম। বাংলাদেশের ক্রিকেটের শুরুর দিকের এই সংগঠক চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
রবিবার ভোরে ৮২ বছর বয়সে রাজধানীর একটি হাসপাতালে মারা গেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রথম কার্যনির্বাহী সম্পাদক ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক রেজা-ই-করিম। বেশ কিছু দিন থেকেই ভুগছিলেন ক্যানসারসহ নানা শারীরিক জটিলতায়। দুপুরে রাজধানীর মনিপুরী পাড়ায় স্থানীয় মসজিদে জানাজার পর মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। ক্রিকেটে নিবেদিতপ্রাণ এই সংগঠকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড।
রেজা-ই-করিমের জন্ম ১৯৩৯ সালে কলকাতায়। চাকরির সুবাদে তার বাবা থাকতেন সেখানেই। ১৯৪২ সালে বাবা তাদের রেখে যান চাঁদপুরে। দেশ বিভাগের পর চট্টগ্রাম রেলওয়ের হেড অফিসে যোগ দেন চিফ অডিট অফিসার হিসেবে। চট্টগ্রামে রেজা-ই-করিমের ক্রিকেট জীবনের শুরু। কয়েকজন মিলে গড়েছিলেন স্টার ক্লাব, যেখানে পরে খেলেছেন সেই সময়ের অনেক নামি ক্রিকেটার। তার সংগঠক হওয়ার শুরুও সেই ক্লাব থেকেই।
চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় করেন বিএসসি ও এমএসসি। ক্রিকেটের সঙ্গে সম্পর্ক আরও পোক্ত হয় তখন। ছিলেন ওপেনিং ব্যাটসম্যান, প্রয়োজনে করতেন উইকেটকিপিংও। ঢাকা প্রথম বিভাগে খেলেন সেই সময়ের অন্যতম সেরা ক্লাব ঈগলটসে। পরে চাকরির সুবাদে খেলেন কমার্স ব্যাংকের হয়ে। ঈগলটসে খেলার সময়ই সংগঠক হিসেবে ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। ক্রমে খেলোয়াড় পরিচয় ছাপিয়ে সেটিই হয়ে উঠেছে বড়। পূর্ব পাকিস্তান দলে খেলার স্বপ্ন ছিল তার, কিন্তু সংগঠক হিসেবে এতটাই অপরিহার্য হয়ে ওঠেন যে নিজের খেলার স্বপ্ন একসময় বিসর্জন দিতে হয়।
স্বাধীনতার আগে নানা ভূমিকায় সম্পৃক্ত ছিলেন দেশের ক্রিকেটে। স্বাধীনতার পর পুরনো কমিটির কাউকে রাখা হয়নি, তাকেও রাখা হয়েছিল দূরে। পরে ১৯৭২-৭৩ ও ১৯৭৩-৭৪ মৌসুমে পরপর ঢাকা লিগ শেষ করতে না পারায় তাকে অনুরোধ করা হয় ঢাকা মেট্রোপলিস ক্রিকেটের দায়িত্ব নিতে। অভিমান করে তখন তিনি দায়িত্ব নেননি। তবে বেশিদিন দূরে থাকতেও পারেননি। ১৯৭৪ সালের নভেম্বরে শুরু করেন লিগ কমিটির সচিব হিসেবে। এরপর আর পেছনে তাকাননি। বাংলাদেশের আইসিসির সদস্যপদ পাওয়ার পেছনে তার ছিল অনেক অবদান। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশে এসেছিল মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি), বিদেশি কোনো দলের প্রথম বাংলাদেশ সফর ছিল সেটি। সেই সফরের আমন্ত্রণপত্রটি ছিল তারই লেখা।
এমসিসির সফরের আগে ইংল্যান্ড সিরিজ কাভার করতে ভারতে এসে ব্রিটিশ সাংবাদিক রবিন মার্লার ঘুরে গিয়েছিলেন ঢাকা থেকেও। এখানকার ক্রিকেটের অবস্থা দেখে নিজের পত্রিকায় তিনি লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেট অস্তগামী।’ পরে রেজা-ই-করিম কড়া ভাষায় মার্লারকে চিঠি লিখে করেছিলেন প্রতিবাদ, বলেছিলেন সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতার কথা। মার্লার পরে অনেকভাবে সহযোগিতা করেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের প্রথম আইসিসি ট্রফির দলে রেজা ই করিম ছিলেন সহকারী ম্যানেজার। এরপর ম্যানেজার, নির্বাচক হিসেবে কাজ করেছেন নব্বই দশকের শেষ পর্যন্ত।