করোনাভাইরাসের ভয়াল গ্রাসে থমকে গেছে গোটা বিশ্ব। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সব খেলাধুলা স্থগিত। সাধারণ মানুষদের মতো বন্দী সময় কাটছে খেলোয়াড়দেরও। তা এই সময়টা কীভাবে কাটাচ্ছেন তারা? ধারাবাহিক প্রতিবেদনে আজ থাকছে দেশের নারী ফুটবলারদের কথা-
সাবিনা খাতুন
চারদিকে তো আসলে আতঙ্ক। এই পরিস্থিতে বাসায় পরিবারের সঙ্গেই সময় কাটছে আপাতত। বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই এই সময়ে। সে চিন্তা করারও তো উপায় নেই।
আমাদের লিগ চলছিল। অনেক দিন পর মেয়েদের প্রিমিয়ার লিগটা মাঠে গড়িয়েছিল। কিন্তু সেটি আপাতত স্থগিত হয়ে গেছে। তবে এসব নিয়ে আসলে ভাবছি না। এখন আসলে নিজেদের নিরাপত্তা সবচেয়ে আগে। নিজের স্বাস্থ্য, নিজের জীবন যদি না বাঁচে তাহলে খেলাধুলা দিয়ে কি হবে। ছুটিতে বাসায় (সাতক্ষীরা) আসছি, এটা সবচেয়ে ভালো হয়েছে। সেফ জোন বলতে পারেন।
সবকিছু স্বাভাবিক হলে আমরাও তখন মাঠে ফিরব। তবে দেশের পরিস্থিতি যেমন, আল্লাহকে ঢাকা ছাড়া তো কিছু নেই। সারা বিশ্বের পরিস্থিতি একটু স্বাস্থ্যসম্মত হোক। এরপর সবকিছু ধীরে ধীরে শুরু করা যাবে সব।
খেলা শুরু হতে দেরি হলে এই সময়ে ফিটনেস ধরে রাখাটা হবে গুরুত্বপূর্ণ। ফিটনেসের জন্য অবশ্য মাঠে যাওয়াটা দরকার। এখন আপাতত তেমন সুযোগ খোঁজার উপায় নেই। তবে বাসায় যতটুকু পারছি, কিছু ফিজিক্যাল অ্যাকটিভিটিস নিজে নিজে করার।
দেশের মানুষের উদ্দেশ্যে বলব- সরকার, প্রশাসন থেকে সতর্ক বার্তা দেওয়া হচ্ছে। এটা মেনে চলাটাই হচ্ছে মুখ্য বিষয়। আমার মনে হয় নিজেদের এখানে সচেতন হওয়া দরকার। যদি আমরা নিজের ভালোর জন্য বাসার ভেতরেই কাটাই সেটা আমাদের জন্য ভালো, পরিবারের জন্যও ভালো। সবাই তো নিজের ভালোটা বোঝে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতে যদি জোর করে মানুষকে কিছু করাতে হয়, সেটা তো দুঃখজনক।
কৃষ্ণা রানী সরকার
এই সময়ে তো বাড়ি থেকে মোটেও বের হচ্ছি না। যতটুকু নিরাপদে থাকার, সতর্ক থাকার চেষ্টা করছি। বাবা-মাকে সময় দিচ্ছি। আমার ছোট ভাইও বাইরে থেকে পড়াশোনা করে। ওর কলেজও ছুটি, তাই বাড়ি চলে এসেছে। ভাই-বোন গল্প করি অনেকটা সময়জুড়ে।
খেলা বন্ধ হয়ে গেছে। এটা নিয়ে খারাপ লাগা তো অবশ্যই আছে। কিন্তু আগে তো জীবন বাঁচাতে হবে। পরে না খেলাধুলা। করোনাভাইরাস যেন অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশে আঘাত না হানে এটাই চাওয়া এখন। সেটা হলেই হয়তো সব স্বাভাবিক হবে দ্রুত। এখন এটাই একমাত্র চাওয়া।
করোনার ভয়াবহতার মধ্যে খেলাবিহীন এই সময়ে আপাতত ফিটনেস নিয়েও খুব বেশি চিন্তা করছি না, সত্যি কথা। সবকিছু বন্ধ থাকার এই সময়টা যদি দীর্ঘ হয় তাহলে তো অবশ্যই ফিটনেস নিয়ে কাজ শুরু করতে হবে। সবকিছু স্বাভাবিক হলেই হয়তো খেলা শুরু হয়ে যাবে। নিজে নিজে যা করা যায় সেগুলোই করার চেষ্টা করব।
দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলব- সবাই সতর্ক থাকুন। নিজের নিরাপত্তা সবার আগে। আপনি নিজেকে সুরক্ষিত করতে পারলে আপনার পাশের জনও রক্ষা পাবে। কারণ এই রোগটা আপনার হলে আপনার পাশের জনেরও হবে। তাই আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে সবাইকে সচেতন হতে হবে। আর সেটা এখনই।
মিসরাত জাহান মৌসুমী
সত্যি বলতে একটু ভয়ের মধ্যেই সময় কাটছে। লিগ চলছিল। কিন্তু অন্য সব খেলার মতো আমাদের খেলাও বন্ধ হয়ে গেছে। বাসায় আসছি, এটা একদিক দিয়ে ভালো লাগছে। অনেক দিন পর পরিবারের সবার সঙ্গে সময় কাটাতে পারছি। কিন্তু কোথাও ঘুরতে যাওয়ার তো সুযোগ নেই। সব সময় সতর্কতার মধ্যে চলতে হচ্ছে।
সময়টা আসলে আমাদের প্রত্যেকের জন্যই চ্যালেঞ্জিং। ভাইরাস থেকে নিজেকে রক্ষা করাটাও চ্যালেঞ্জিং। আমাদের যেটা করণীয় বাইরে বের না হওয়া। আমি নিজে সেটা মেনে চলার চেষ্টা করছি। পরিবারের কাউকে বাইরে যেতে দিচ্ছি না। আর নিয়মিত হাত ধোয়া, সবকিছু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, যেসব করণীয় সেগুলো করছি।
খুব দ্রুত খেলা শুরু না হলে ফিটনেসের দিক দিয়ে একটু ক্ষতি হবে। কারণ আমাদের বাসায়-বাসায় তো আর জিম নেই। হালকা কিছু ব্যায়াম ছাড়া কিছু করার সুযোগ নেই। বলের বাইরে থাকতে হবে। মাঠে গিয়েও তো প্র্যাকটিস করা সম্ভব নয়। পারফরম্যান্স হয়তো একটু লো হতে পারে। তবে সবকিছু স্বাভাবিক হলে এই গ্যাপও পুষিয়ে নেওয়া যাবে।
যারা এখনো বাইরে অনেক ঘোরাফেরা করছেন, আমি তাদের সবাকে অনুরোধ করব তারা যেনে বাইরে বের না হন। কেননা এটা খুব দ্রুত ছড়াচ্ছে। আর খুবই ছোঁয়াচে রোগ। কখন কীভাবে কার শরীরে প্রবেশ করবে কেউ বলতে পারবে না। বড় বড় দেশগুলোও হিমশিম খাচ্ছে করোনার বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে। তো আমাদের দেশে যদি এটা বাড়তে থাকে তাহলে হয়তো বাড়তেই থাকবে। তাই এখনই আমাদের সচেতন হতে হবে। আর যারা সামর্থ্যবান আছেন তাদের বলব অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে।
মারিয়া মান্দা
বাসাতেই থাকছি, কিছুটা মাকে হেল্প করি। রিলাক্স সময়ে গান শুনতে বেশ ভালো লাগে আমার। এখন সেটাই করছি। এ ছাড়া অনেকে মিলে একসঙ্গে হলে গল্প করতেও আমার খুব পছন্দ। কিন্তু এখন তো সেই সুযোগ নেই। করোনাভাইরাসের কারণে সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
আমরা তিন বোন, এক ভাই। ছুটিতে সবাই এক সঙ্গে হয়েছি। বড় আপু অবশ্য শ্বশুর বাড়িতে। তবে তার শ্বশুর বাড়িও আমাদের ধোবাউড়াতেই (ময়মনসিংহ)। মা, মেজ বোন ও ছোট ভাইকে নিয়ে আমার সময় কাটছে। ছুটিতে বাড়ি আসার সময় আমাদের আসলে বলেও দেওয়া হয়েছে, এসব ছোঁয়াচে রোগ। কারো সাথে আড্ডা দেওয়ার যাবে না। তাই ঘরেই থাকি বেশির ভাগ সময়। খেলাধুলা নিয়েও তেমন ভাবছি না এখন।
ছুটি দীর্ঘ হলে ফিটনেস ধরে রাখার জন্য অবশ্যই আমাকে প্র্যাকটিস করতে হবে। আমার বাড়ির পাশেই নদী। নদীর পাশে একটা মাঠ আছে। সেখানে সবাই ফুটবল খেলে। সব ঠিক হলে সেখানে প্র্যাকটিস শুরু করব।
সবার উদ্দেশ্যে বলব, করোনাভাইরাস তো নোংরা জিনিস থেকেই ছড়ায়। তাই সবাকে প্রয়োজনীয় সব সতর্কতা অবলম্বন করতে।
সিরাত জাহান স্বপ্না
চারদিকের অবস্থা তো মোটেও ভালো না। শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বের অবস্থাই খুব খারাপ। বাসা থেকে একদমই বের হচ্ছি না। পরিস্থিতি যেমন দাঁড়িয়েছে এখন ফুটবল নিয়ে ভাবারও কোনো সুযোগ নেই।
ক্যাম্প ছুটি দেওয়ায় বাড়িতে চলে এসেছি আগেই। রংপুরে আমাদের যে মাঠে প্র্যাকটিস হতো সেখানেও সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফিটনেস ধরে রাখতে হবে, তাই বাসায় যতটুকু কাজ করা যায় সেটা করছি। বল প্র্যাকটিস বা রানিং করা সম্ভব হচ্ছে না।
আমাদের সবার জন্যই আসলে এখন ভয়াবহ পরিস্থিতি। মানুষকে অনেক সতর্ক করার পরই তারা সচেতন হচ্ছেন না। অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে প্রয়োজন নেই এরপরও ঘোরাঘুরি করছে। সবার কাছে একটাই আবেদন থাকবে, এটা অনেক সিরিয়াস একটা বিষয়। এটা কোনো মজার বিষয় নয়। বিশেষ করে সারা বিশ্বের যে অবস্থা। সবার কাছে একটাই চাওয়া, নিজে সচেতন থাকা এবং অন্যকে সচেতন করা। সবার নিজের দায়িত্বে এটা করা উচিত।
তহুরা খাতুন
যেহেতু করোনাভাইরাস। বাইরে বের হওয়ার সুযোগ নেই। তাই বাড়িতেই সময় কাটছে। আম্মুর সাথে গল্প করি। আমার ভাইয়া ঢাকায় পড়াশোনা করে। ও বাড়ি এসেছে, ওর সঙ্গে গল্প করে সময় কাটাই। নিজেরা সতর্ক থাকার চেষ্টা করছি। গ্রামের মানুষ তো সবাই এসব নিয়ে সচেতন না। অনেকে জিজ্ঞেস করছে, এগুলো সত্যি কিনা। তাদেরকে চেষ্টা করছি সচেতন করার। সবকিছু বুঝিয়ে বলার।
আপাতত খেলা, ফিটনেস নিয়ে কিছু ভাবছি না। যেহেতু দেশের পরিস্থিতি ভালো না। এখন আল্লাহ কাছে প্রার্থনা যত দ্রুত সবকিছু ঠিক হয়ে যায়।