মহামারি করোনাভাইরাস মোকাবিলায় বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব হিমশিম খাচ্ছে। এরই মধ্যে হাতছানি দিচ্ছে ডেঙ্গু। ইতিমধ্যে বছরের প্রথম দিন থেকে সোমবার পর্যন্ত সারা দেশে ২৭১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, যা গত বছরের প্রথম ৫ মাসের মোট আক্রান্তের চেয়েও বেশি। এপ্রিলে ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা চিকিৎসা গবেষকদের।
করোনা ও ডেঙ্গুর প্রাথমিক উপসর্গসমূহ প্রায় একই। অথচ করোনা আতঙ্কে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে জ্বর ও সর্দি-কাশির চিকিৎসা এক প্রকার বন্ধ রয়েছে। এতে ডেঙ্গুর চিকিৎসা পাওয়া নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই ডেঙ্গু দমনে সমন্বিত কৌশল নির্ধারণ ও দেশব্যাপী মশা নিধন করতে না পারলে এবারে ডেঙ্গু পরিস্থিতি গত বছরের চেয়েও ভয়াবহ হবে।
প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা.লেলিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে গিয়ে ডেঙ্গুর বিষয়টি সবাই ভুলে গেছেন। অথচ কয়েক দিন পরেই এটি আমাদের ঘাড় চেপে ধরবে। সিটি করপোরেশন করোনার কারণে মশা মারার কথা ভুলেই গেছে। কিন্তু ডেঙ্গুর বিস্তার কিন্তু ক্রমশ বাড়ছে। আমরা গত বছরই বলেছিলাম ডেঙ্গু দমনে একটি জাতীয় সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। কিন্তু এখনো সেটা হয়নি। পাশাপাশি দেশব্যাপী মশা নিধন ও প্রতিটি জেলায় জ্বর, সর্দি উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের জন্য আলাদা সেল গঠন করতে হবে। ওইখানেই নির্ধারিত হবে কে ডেঙ্গু রোগী ও কে করোনা রোগী। অন্যথায় মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সোমবারের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২৭১ জন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে জানুয়ারিতে ১৯৯ জন, যা গত বছর ছিল ৩৮ জন। ফেব্রুয়ারিতে ৪৫ জন, যা গত বছর ছিল ১৮ জন ও মার্চে ২৭ জন, যা গত বছর ছিল ১৭ জন। গত বছর ডেঙ্গুতে সারা দেশে ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন আক্রান্ত হন। ওই বছর সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) কাছে ডেঙ্গু সন্দেহে ২৬৬ জনের মৃত্যুর তথ্য আসে। এদের মধ্যে ২৩৪টি মৃত্যু পর্যালোচনা করে ১৪৮ জন ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত হয় তারা। বাকিরা ডেঙ্গুসহ অন্যান্য উপসর্গ নিয়ে মারা যায়। উল্লেখ্য, করোনাভাইরাসে এখন পর্যন্ত দেশে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৫ জন।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ায় মার্চে দেশের বেশির ভাগ হাসপাতালে জ্বর ও সর্দি-কাশি উপসর্গের রোগী আসা কমে গেছে। এই রোগীদের বড় একটি অংশই বাড়িতে চিকিৎসা নিয়েছেন। এ জন্য মার্চে কম ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর পরেও এই সংখ্যা গত বছরের চেয়ে বেশি। এ থেকেই বোঝা যায়, এ বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি গত বছরের চেয়ে অনেক খারাপ। এই অবস্থা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে দেশে করোনার বর্তমান পরিস্থিতির চেয়েও ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে চিকিৎসকরা বলছেন, গত বছরের ডেঙ্গুর মৌসুম এখনো চলছে। সাধারণত প্রতি বছর আগস্ট থেকে ডেঙ্গুর উপদ্রব শুরু হয়ে অক্টোবর পর্যন্ত চলতো। কিন্তু গত বছর জুনেই ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়। ডিসেম্বরের শেষে আক্রান্ত সংখ্যা কমলেও একেবারে বন্ধ হয়নি। এখনো তা অব্যাহত আছে। এ থেকে বোঝা যায়, ডেঙ্গুর লার্ভা ও এর বাহক এডিস মশা দেশব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এখন প্রয়োজন শুধু উপযুক্ত পরিবেশ। যা সৃষ্টি হয়েছে সম্প্রতি রাজধানীবাসীর বেশির ভাগ গ্রামে চলে যাওয়ায়। অনেকেই বাড়ির বিভিন্ন পাত্র পরিষ্কার করে যাননি। বিভিন্ন স্থানে জমে আছে স্বচ্ছ পানি। এসব পানিতেই এডিস জন্মায়। করোনাভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি-বেসরকারি ছুটি আরও দীর্ঘ হতে পারে। এই সুযোগে ডেঙ্গুও রাজধানীতে তার বংশ বিস্তার করতে থাকবে। আর এরই মধ্যে যদি চৈত্রের বৃষ্টির নামে তাহলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। গত বছর দেশজুড়ে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটের সংকট দেখা দিয়েছিল। এতে অনেক রোগীই সময়মতো ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে পারেননি। এ বছরও এমন হতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এদের বেশির ভাগই এখনো সেভাবে ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেনি। অনেক বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটও নেই। এছাড়া করোনাভাইরাসের ভয়ে বেশির ভাগ হাসপাতালের বহির্বিভাগে জ্বরের চিকিৎসা বন্ধ আছে। এমতাবস্থায় কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া এখনো হাসপাতালগুলোতে কিট ও স্যালাইন সরবরাহ শুরু না করায় গত বছরের মতো সংকট দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি মাসে রাজধানীতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া এক রোগী বলেন, অসুস্থ হওয়ার পরে তিনি একটি বেসরকারি হাসপাতালে যান। ওই হাসপাতাল তাকে ফিরিয়ে দেয়। এরপর আরেকটি বড় বেসরকারি হাসপাতালে গেলে তারাও ফিরিয়ে দেন। এরপর রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালে গেলে প্রথমে চিকিৎসকেরা করোনা রোগী হিসেবে সন্দেহ করেন। নার্সরা কেউ কাছে আসেনি। পরে মেডিসিন বিভাগের এক চিকিৎসক অনেক সতর্কতার সঙ্গে তার শরীরের স্যাম্পল নিয়ে পরীক্ষা করে ডেঙ্গু আক্রান্ত হিসেবে নিশ্চিত হন। এরপরেই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ততক্ষণে ওই হাসপাতালে ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়।
এ বিষয়ে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক উত্তম কুমার বড়ুয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার ধারণা, আগামী মাসেই ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হতে পারে। আর এটা গত বছরের চেয়েও খারাপের দিকে যেতে পারে। কারণ বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীরা চিকিৎসা নিতে পারবে কী না তা নিয়েই সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতেও এখন জ্বরের রোগীদের চিকিৎসার বিষয়ে কিছু দ্বিধায় আছে।
রাজধানীর মশা মারার বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলার জন্য তার মোবাইলে কল দিলেও তাকে পাওয়া যায়নি।