করোনাভাইরাসে লকডাউন হয়ে আছে গোটা ভারত। এতে রাজ্যে রাজ্যে আটকে পড়েছে লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষ। যানবাহন বন্ধ থাকায় শত শত কিলোমিটার রাস্তায় হেঁটে বাড়ি ফিরতে গিয়ে মাঝপথেই অভুক্ত অবস্থায় প্রাণ হারানোর ঘটনাও ঘটেছে।
‘জনতার কারফিউ লাগার আগের দিন মালিক কিছু টাকা দিয়েছিল। তা দিয়ে তিন চার দিন খেয়েছি। তারপর থেকে আমরা কয়েকশ বাঙালি শ্রমিক শুধু নলের পানি খেয়ে থাকছি। একটাও পয়সা নেই হাতে। কোনো মতে পেটে গামছা বেঁধে রয়েছি। সবাইকে মিনতি করছি, একটু আমাদের কথাটা ভাবুন।’
গুজরাটের সুরাট শহরে কাজ করতে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের এক শ্রমিক মুহাম্মদ সেকান্দার শেখ এমন আহাজারি প্রকাশ করেন।
মাস তিনেক হলো পূর্ব বর্ধমান থেকে সুরাটে এমব্রয়ডারির কাজ করতে গেছেন সেকান্দার।
বিবিসি বাংলা জানায়, ভারতে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে যখন লকডাউন চলছে, তার মধ্যেই এক মানবিক সংকটের দিকে দেশটি এগোচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
দিল্লি, মুম্বাই, গুজরাট বা দক্ষিণ ভারতে কাজ করতে যাওয়া লাখ লাখ শ্রমিক সেই সব জায়গায় আটকে পড়েছেন। কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারগুলো তাদের আর্থিক অনুদান এবং খাদ্যদ্রব্য সরবরাহের বিষয়ে আশ্বস্ত করলেও সেসব সাহায্য তাদের কাছে এখনো পৌঁছায়নি।
বহু মানুষ পায়ে হেঁটেই পাঁচ, ছয় বা সাতশ কিলোমিটার দূরে নিজের গ্রামে যাওয়ার জন্য রওনা হয়েছেন স্ত্রী সন্তানদের হাত ধরে। অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে আশঙ্কা প্রকাশ করছিলেন যে, এই কয়েক লাখ মানুষ নিজেদের গ্রামে ফিরে যেতে গিয়ে সারা দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে দেবেন।
কিন্তু তারা বাধ্য হচ্ছিলেন পায়ে হেঁটে শয়ে শয়ে কিলোমিটার পাড়ি দিতে, কারণ এদের কাজ বন্ধ, তাই খাবারের সংস্থান অনিশ্চিত। গ্রামে ফিরলে অন্তত ঘরভাড়া গুনতে হবে না, আর কোনো মতে খাবার ঠিকই জুটে যাবে - এমনটাই ভেবেছিলেন এরা।
যদিও দিন কয়েক পরে সরকার ওইসব শ্রমিকদের দিল্লি ত্যাগ আটকাতে পেরেছেন। তবে লকডাউন শুরু হওয়ার আগেই অনেকে ফিরে এসেছেন গ্রামের বাড়িতে।
চেন্নাইতে কাজ করতে গিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার একদল শ্রমিক। সারা দেশে লকডাউন হয়ে যেতে পারে, এমন একটা আশঙ্কা করে ২২ তারিখের জনতা কারফিউয়ের আগেই তারা ট্রেন ধরেছিলেন বাড়ির উদ্দেশ্যে। কোনো মতে বাড়ি ফিরতে পেরেছিলেন, কিন্তু যেহেতু অন্য রাজ্য থেকে এসেছেন, তাই চিকিৎসক তাদের বাড়িতেই কোয়ারেন্টাইনে থাকার উপদেশ দিয়েছিলেন।
‘আমাদের বাড়ির অবস্থা এমন নয় যে আলাদা ঘরে থাকতে পারব। আবার এই পরিস্থিতিতে গ্রামের মানুষ বা পরিবারের অন্যদের কোনো বিপদ হোক তাও চাইনি। তাই গ্রামের বাইরে একটা বড় গাছে মাচা বেঁধে আমরা সাতজন থাকছিলাম। দিন ছয়েক ওইভাবেই ছিলাম। গ্রাম থেকে খাবার দিয়ে যেত। সংবাদ প্রচার হতে সরকারি কর্মকর্তারা জানতে পারেন। তারা এখন একটা শিশু বিকাশ কেন্দ্রতে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। জল, খাবার - সব সরকারই দিচ্ছে।’ এমনটাই বললেন দিন ছয়েক মাচা বেঁধে গাছের ওপরে আশ্রয় নেওয়া এক শ্রমিক বিজয় সিং লায়া।
বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সরকারি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন- শ্রমিক মহল্লাগুলোতে খাবার পাঠানোর জন্য। সারা দেশেই লাখ লাখ শ্রমিক এই লকডাউনের ফলে আটকে রয়েছেন। খুব কম মানুষই আগে বাড়ি চলে আসতে পেরেছিলেন।
করোনাভাইরাস সংক্রমণ রুখতে গিয়ে একটা বড় মানবিক সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স সলিডারিটি নামের একটি সংগঠনের নেতা রাতুল ব্যানার্জি।
তিনি বলেন, ‘সরকার বলেছে ঠিকই যে এদের কাছে আর্থিক অনুদান, খাদ্যশস্য পৌঁছানো হবে। কিন্তু সেটা ঠিক কীভাবে হবে, তার কোনো দিশা কিন্তু এখনো নেই। আমাদের নেটওয়ার্কের সবার কাছে অসংখ্য ফোন আসছে, ফেসবুকে পোস্ট করছেন অনেকে নিজেদের দুরবস্থা জানিয়ে। আমরা সেই সব এলাকার স্থানীয় প্রশাসনের কাছে সেই বার্তা পৌঁছিয়ে দিচ্ছি।’
ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে পায়ে হেঁটে কয়েকশ কিলোমিটার পাড়ি দিতে গিয়ে ইতিমধ্যেই দু'জন মারা গেছেন।
ব্যানার্জির মতো সামাজিক কর্মকর্তারা বলছেন দ্রুত যদি এই শ্রেণির মানুষের কাছে খাবার, পানীয় জল, চিকিৎসার ব্যবস্থা আর কিছু অর্থ সাহায্য না পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে এরা রাস্তায় বেরোতে বাধ্য হবেন খাবারের খোঁজে, আর তখন লকডাউনের মূল উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে।