মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ চট্টগ্রাম নগরীর বাসিন্দারা। মশার উৎপাত থেকে রক্ষা পেতে দিনের বেলায়ও মশার কয়েল ব্যবহারে মুক্তি মিলছে না। নগরের ঘরে-বাইরে, অফিস-আদালত প্রায় সবখানেই মশার উপদ্রব ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বৈশ্বিক সংকট করোনাভাইরাস সংক্রমণ আতঙ্কের মাঝে নগরবাসী ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়ার শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। নগরবাসীর ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে মশার ওষুধ না ছিটানো এবং নালা-নর্দমা পরিষ্কার না করায় দিন দিন মশার উপদ্রব বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে মশার কামড়ে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মহামারী আকার ধারণ করতে পারে। তাই শিগগিরই মশা নিধনের কার্যকরী ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম বেগবান করা জরুরি। যদিও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নগরের সব ওয়ার্ডের নালা-নর্দমায় মশার ডিম বা লার্ভা ধ্বংসকারী ‘লার্ভিসাইড’ ওষুধ ছিটানো অব্যাহত রয়েছে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর বিভিন্ন খাল ও নালা-নর্দমায় কিলবিল করছে মশার লার্ভা। এসব লার্ভা থেকে মশার জন্ম হয়ে বাসাবাড়িতে ঢুকে উপদ্রব করতে থাকে দিন-রাত সবসময়ই। নগরের ষোলকবহর ওয়ার্ডের বাদুড়তলা বড় গ্যারেজ এলাকার বাসিন্দা মো. আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মশার উপদ্রব সে তো আর নতুন কথা নয়। সারা বছরই আমাদের এলাকায় মশার উপদ্রব থাকে। এ বছর এখনো মশার ওষুধ ছিটাতে দেখিনি। মাঝেমধ্যে এসে নালার ময়লা পরিষ্কার করে সিটি করপোরেশনের লোকজন। ভালোমতো যদি মশার ওষুধ ছিটাত তাহলে এত মশা হতো না। এমনিতেই করোনাভাইরাস নিয়ে জীবনমরণের প্রশ্ন উঠেছে, সারাদিনই বাসায় থাকতে হচ্ছে। রাতে তো মশা আছেই, ইদানীং দিনের বেলায়ও মশার কামড় খেতে হচ্ছে। নাকি মশার কামড় খেতে খেতে আবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় সবাই? চসিকের পরিচ্ছন্ন বিভাগ কি মশার ওষুধ ছিটানোর বরাদ্দ মেরে দিচ্ছে! না হলে ওষুধ ছিটাচ্ছে না কেন?’
মশার উপদ্রব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে চকবাজারের কাপাসগোলা এলাকার জানে আলম বলেন, ‘কিছুদিন আগে এখানে মশার ওষুধ ছিটাতে দেখেছি। কিন্তু এরপরও তো মশা কমছে না। কীভাবে কমবে, চকবাজারের মুখের খালটা কিছুদিন বন্ধ রাখে, কিছুদিন খোলা রাখে। এতে ময়লা জমে থাকে। পরে ময়লা পানিতে মশার লার্ভা ও পূর্ণাঙ্গ মশা কিলবিল করে। কার্যকরী ওষুধ ছিটানো ও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নয়তো মশা নিয়ে আমাদের কঠিন সময় পার করতে হবে।’
চান্দগাঁও ওয়ার্ডের কালুরঘাট শিল্পাঞ্চল এলাকার সবজি ব্যবসায়ী মো. জামাল বলেন, ‘ওষুধ ছিটানো তো দূরের কথা, আমাদের এলাকার নালাগুলো তেমন একটা পরিষ্কার করা হয় না। তাই নালায় জমে থাকা ময়লার সঙ্গে মশা জন্ম নেয়। দিন-রাত সবসময় এখানে মশার কামড় খেতে হয়। কাউন্সিলরও মশার উপদ্রব ঠেকানোর বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয় না।’
চসিকের পরিচ্ছন্ন বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে চসিক কর্র্তৃপক্ষ নগরের ৪১ ওয়ার্ডজুড়ে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছে ২০ কোটি টাকা অর্থ সহায়তা চেয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় গত ২৫ মার্চ মশক নিধন কার্যক্রম চালাতে ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এর বাইরে চলতি অর্থবছরে মশক নিধনে চসিকের বাজেটে ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে।
মশার উপদ্রব বাড়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ শফিকুল মান্নান সিদ্দিকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নগরের প্রত্যেক ওয়ার্ডে মশার উপদ্রব কমাতে প্রতিনিয়ত “লার্ভিসাইড” ও “অ্যাডালটিসাইড” ওষুধ ছিটানো হয়। বর্তমানে প্রত্যেক ওয়ার্ডের নালা-নর্দমায় পরিচ্ছন্নকর্মীরা মশার ওষুধ ছিটাচ্ছে।’
ওষুধ ছিটানোর পরও মশার উপদ্রব না কমার কারণ জানতে চাইলে এ পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা বলেন, ‘নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ চলছে। সিডিএ ও সেনাবাহিনী এ প্রকল্পের কাজ করছে। এ প্রকল্পের অধীনে নগরের বেশ কয়েকটি খালের খননকাজ চলছে। এতে কয়েকটি খাল ও নালার মুখ বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে মশা একটু বেড়েছে। এসব খালের মুখ খুলে দেওয়া হলে মশার উপদ্রব কিছুটা কমবে।’ অন্যদিকে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মশার উপদ্রব ঠেকাতে প্রত্যেক ওয়ার্ডে অ্যাডালটিসাইড ও লার্ভিসাইড ওষুধ ছিটানো হয়। তবে বর্তমানে অ্যাডালটিসাইড ওষুধ ছিটানো বন্ধ রাখা হয়েছে। ফগার মেশিন দিয়ে এ ওষুধ ছিটানোর সময় ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। এতে এলাকাবাসীর শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দিতে পারে।’
চসিকের পক্ষ থেকে ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি নগরবাসীকেও নিজ নিজ বাসাবাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখারও আহ্বান জানান সামসুদ্দোহা। তবেই মশার উপদ্রব অনেকাংশে কমবে বলে মত তার।