ময়লার ব্যাগের তৈরি পিপিই নিয়ে করোনা যুদ্ধে ব্রিটিশ চিকিৎসকেরা

ভয়াবহ করোনাভাইরাসে মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে যুক্তরাজ্যে। এখন পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় ৪৩ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, এর মধ্যে মারা গেছে ৪ হাজার ৩২০ জন।

এমন পরিস্থিতিতে দেশটির হাসপাতালগুলোতে স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজের পরিবেশ ও সরঞ্জামের শোচনীয় অবস্থা উঠে এসেছে নিবিড় পরিচর্যা বিভাগের (আইসিইউ) একজন চিকিৎসকের বক্তব্যে।

আশঙ্কাজনক অবস্থায় থাকা রোগীদের সেবায় দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে হাসপাতালগুলো।

বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তারা যে বিষয়টিতে জোর দিয়েছেন তা হলো সরঞ্জামের অভাব। তাদের গণমাধ্যমে কথা বলতেও নিষেধ করা হয়েছে।

ডা. রবার্টস (ছদ্মনাম) নামে এক ব্রিটিশ চিকিৎসক সেখানকার করুণ পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন।

তার হাসপাতালের আইসিইউ এখন কভিড-১৯ রোগীতে পরিপূর্ণ। হাসপাতালে কর্মীর অভাব আছে, সংকটময় রোগীর জন্য বিছানার অভাব আছে, একদম সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক ও ভেন্টিলেটরের অভাব আছে।

ধারণা করা হচ্ছে যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাস ১৪ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে বড় আঘাত হানবে, বিশ্লেষকদের ভাষায় যেটাকে বলা হচ্ছে ‘পিক টাইম’।

স্বাস্থ্যকর্মীরা এখনই অনুভব করছে কী পরিমাণ সংকটময় সময় আসছে সামনে। চূড়ান্তভাবে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিচ্ছেন এমন চিকিৎসকেরা এখন ১৩ ঘণ্টা করে কাজ করছে প্রতিদিন। কিন্তু তাদের অভিযোগ যথাযথ সাপোর্ট বা সরঞ্জাম তারা পাচ্ছেন না।

ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) এর অভাব প্রকট। এমনও হয়েছে যে পিপিইর অভাবে ময়লা ফেলার পলিথিন, প্লাস্টিকের অ্যাপ্রোন ও স্কিইং করার চশমা পরে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন তারা।

যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই করোনাভাইরাস আক্রান্ত হতে পারেন এমন ব্যক্তির থেকে ২০ সেন্টিমিটারের মতো দূরত্বে থেকে কাজ করছেন ডাক্তাররা, যেখানে সাধারণ মানুষকে বলা হচ্ছে ২ মিটার হতে হবে ন্যূনতম দূরত্ব।

রবার্টস জানান, যে মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে তাদের জীবনে সেটা এখনই ভাবাচ্ছে, তারা এখন ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ছেন এবং নিজেদের পিপিই নিজেরাই তৈরি করছেন।

তিনি বলেন, ‘এটা বাস্তব চিন্তা, নিবিড় চিকিৎসা যেসব নার্স দিচ্ছেন তাদের এটা এখনই প্রয়োজন। তারা যেখানে কাজ করছেন সেখানে ভাইরাস অ্যারোসলের মতো করে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের বলা হচ্ছে খুব সাধারণ টুপি পরতে যেটায় ছিদ্র আছে। যেটা কোনো সুরক্ষাই দিচ্ছে না।’

তার বক্তব্য, এটা প্রচণ্ড রকমের ঝুঁকিপূর্ণ। তাই কর্মীরা বিনের ব্যাগ ও অ্যাপ্রোন পরে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন।

এদিকে যুক্তরাজ্যের সরকার সরঞ্জাম বিতরণ নিয়ে যে ঝামেলা হচ্ছে সেটা স্বীকার করেছেন। এখন এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সশস্ত্র বাহিনী।

১ এপ্রিল ১০ লাখ শ্বাসযন্ত্র রক্ষাকারী মাস্ক দিয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা (এনএইচএস)। তবে সেখানে মাথার সুরক্ষা ও গাউনের কথা বলা হয়নি।

রবার্টস যেখানে কাজ করছেন সেই হাসপাতালে কোনো সরকারি সামগ্রী পৌঁছায়নি বলছেন তিনি।

ড. রবার্টস একটি ফেস মাস্কের প্যাকেট থেকে মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ লেখা স্টিকার সরিয়ে ফেলেছেন। এই চিকিৎসক বলেন, ‘এখন আমরা যে মাস্ক দিয়ে কাজ করছি সেটা নতুন করে তারিখ বসানো হয়েছে। আমি তিনটি স্টিকার দেখেছি যেখানে লেখা মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ ২০০৯, ২০১৩ ও একটিতে ২০২১।’

তবে কর্তৃপক্ষ জানায়, যেগুলোতে মেয়াদের তারিখ শেষ হয়ে গেছে সেগুলো তারা পরীক্ষা করে দেখে যে ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু ড. রবার্টস বলছেন, তিনি এ বিষয়ে আশ্বস্ত হতে পারছেন না।

এই মুহূর্তে রবার্টসের তিনজন সহকর্মী ভেন্টিলেশনে আছেন যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। যারা আক্রান্ত হয়েছে তাদের একজন কভিড-১৯ ওয়ার্ডে কাজ করতেন।

বাকি দুজন ওই ওয়ার্ডে কাজ করতেন না তাই তাদের পিপিই ছিল না। রবার্টস মনে করছেন এই দুজনেরও কর্মক্ষেত্রেই সংক্রমণ হয়েছে।

সহকর্মীরা দেখা সাক্ষাৎ করতে পারছেন। কিন্তু কোনো আত্মীয়কে সেখানে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না।

চিকিৎসক রবার্টস সবচেয়ে কঠিন যে পরিস্থিতির কথা বলেন, ‘পরিবারগুলোকে আমাদের বলতে হচ্ছে যে, আপনার রোগী মারা যাচ্ছে, তারা দেখতেও আসতে পারছে না।’

তিনি বলেন, ‘এমনি সময়ে তো কেউ না কেউ পাশে থাকে, যাকে আমরা সান্ত্বনা দেই যে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’

রবার্টস বলেন, ‘আমরা সেরা ভেন্টিলেটর সেবা দিতে পারছি না। আমরা নার্সিং কেয়ার সর্বোচ্চ দিতে পারছি না, আমাদের সেরা নার্সদের এত কাজ করানো হচ্ছে যে সেটা অমানবিক। আমাদের অ্যান্টিবায়োটিক শেষের পথে আমি তাদের সকল সেবার নিশ্চয়তা দিতে পারছি না।’

ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস বলছে তাদের কাছে স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিতরা করোনাভাইরাসে কর্মক্ষেত্রে সংক্রমিত হচ্ছে কি না সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।

ইউরোপে যে দুটি দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও এর ফলে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি তাদের মধ্যে একটি স্পেন যেখানে সরকারি হিসেবে ২৭শে মার্চ পর্যন্ত ৯৪০০ স্বাস্থ্যকর্মীর করোনাভাইরাস পজিটিভ নিশ্চিত।

৩০শে মার্চ পর্যন্ত ইতালিতে সংক্রমিত স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা ৬৪১৪ জন।

যুক্তরাজ্যে কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী মারা গেছেন বলে জানা গেছে। পশ্চিম মিডল্যান্ডের একজন নার্স আরিমা নাসরিন মারা গেছেন করোনাভাইরাসে।

পূর্ব লন্ডনের হেলথ কেয়ার সহকারী থমাস হারভে, সেন্ট্রাল লন্ডনের প্রফেসর মোহাম্মদ সামি সৌশা, দক্ষিণের ড. হাবিব জাইদি, পশ্চিম লন্ডনের ড. আদিল এল তাইয়ার এবং লেস্টারের ড. আমজেদ এল হাওরানি মারা গেছেন।