‘আমার টাকাও নেই, সরকারের ত্রাণ বা কোন সহায়তার কার্ডও নেই। গরিবের জন্য মেম্বার ও চেয়ারম্যান কেউ নেই। তারা আছে সচ্ছলদের জন্য। এ পৃথিবীতে আমি অসহায় এক মহিলা, আমাকে দেখার কেউ নেই, আমার কান্না কে-বা শুনবে! আল্লাহকে ডাকা ছাড়া আমার কেউ নেই’!
এভাবেই চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলছিলেন জীবনযুদ্ধে হেরে অসুস্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে থাকা ষাটোর্ধ্ব বয়সী কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার সদর ইউনিয়নের পুকুরপাড় গ্রামের মৃত আনু মিয়ার সর্বহারা মেয়ে হাসেদা বানু। এখন বিছানায় শুয়ে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, জেলার নিকলী উপজেলার সদরের পুকুরপাড় গ্রামের হতদরিদ্র হাদেসা বানু তার ছোট বোন হোসনা বানুর ঘরের এক কোনায় ঠাঁই নিয়ে বার্ধক্যজনিত অসুস্থ হয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিছানায় পড়ে আছেন।
তার ছোটবোন হোসনা বানু জানায়, ৩৫ বছর আগে বোন হাদেসা বানুর বিয়ে হয় একই উপজেলার দামপাড় গ্রামের মো. আল- ইসলাম মিয়ার সঙ্গে। বিয়ের ৩ বছর পর তাদের ঘরে এক মেয়ের জন্ম হয়। কিন্তু অভাব-অনটনের সংসারে যৌতুকের জন্য হাদেসার স্বামী প্রায়ই তাকে নির্যাতন করতো। এক সময় হাদেসাকে নির্যাতন করে তার ডান চোখ নষ্ট করে দেয়। পরে তার স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করলে স্বামী তার প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে শিশু মেয়েকে নিয়ে চলে যায়। এর পর থেকে তার হতদরিদ্র দুই ভাইয়ের সংসারে কোনোমতে ঠাঁই নিয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন হাদেসার। তার দুই ভাই মৃত্যু বরণ করলে আবার কষ্টের ছায়া নেমে আসে তার জীবনে। অবশেষে ভাইয়ের সংসারের অভাব দেখে পেটের দায়ে কোন উপায় না পেয়ে বাড়ি ছেড়ে কাজের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে যায় চট্টগ্রামে। সেখানে কাজ না পেয়ে রাস্তায় রাস্তায় আর বাসা-বাড়িতে ভিক্ষা করে কোন রকমে দিন কাটতো তার। এক সময় সে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেলে দীর্ঘ ২০ বছর পর নিজ বাড়ি নিকলীতে চলে আসে। বাড়িতে এসে তার ছোট বোন হোসনা বানুর অভাব-অনটনের সংসারে বোঝা হয়ে এখনো পর্যন্ত বিছানায় শুয়ে কাতরিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন তিনি। এ পর্যন্ত তার ভাগ্যে জোটেনি সরকারি অনুদানের কার্ড বা কোন সহায়তা। চলতি করোনাভাইরাসের লকডাউনে থাকা সরকারি ত্রাণসামগ্রী বা রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তি উদ্যোগের কোন সহায়তা।
এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শিপন মিয়া বলেন, আমার কাছে এ পর্যন্ত কেউ আসেনি। এ বিষয়ে আমি খোঁজ নিচ্ছি।
নিকলী সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহরিয়ার আহম্মেদ বলেন, তিনি কোন ভাতার কার্ড না পেয়ে থাকলে আমি অবশ্যই খোঁজ নিয়ে তাকে একটি কার্ড করে দেব। আর আজই আমি তার জন্য বাড়িতে ত্রাণসামগ্রী পাঠাচ্ছি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামসুদ্দিন মুন্না বলেন, বিষয়টি জানা ছিল না। আপনার মাধ্যমে শুনেছি। খোঁজ-খবর নিয়ে আমি অবশ্যই অসহায় মহিলার জন্য সাহায্য-সহযোগিতার ব্যবস্থা করব।
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আহসান রুহুল কুদ্দুস ভূঞা জনি বলেন, আমি বিষয়টি এখন জানলাম। তিনি ত্রাণ না পেয়ে থাকলে আজই নির্বাহী অফিসারের সঙ্গে কথা বলে তার ঘরে ত্রাণ পাঠাচ্ছি।