দেশের ক্রীড়াঙ্গনে সবচেয়ে গ্ল্যামারাস খেলাটার নাম- ক্রিকেট। নানা চড়াই-উতরাইয়ের পথে হাঁটতে হাঁটতে বিশ্ব দরবারে এখন আলাদা জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। লাল-সবুজের দলেও এখন তারার মেলা। তবে ক্রিকেট যেমন অনেক তারকা উপহার দিয়েছে বাংলাদেশকে, তেমনি কিছু তারার অপ্রত্যাশিত পতনও দেখেছে এ দেশের ক্রিকেট। যারা অনেকেই প্রতিষ্ঠিত হতে হতেও হারিয়ে গেছেন, কেউ বা আবার অনুবাদ করতে পারেননি নিজ প্রতিভার পুরোটা। সেই সব ক্রিকেটারদের নিয়ে ধারাবাহিকে আজ থাকছে রাজিন সালেহর গল্প-
হোম অব ক্রিকেট মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে যে জায়গাটায় অধিনায়কদের স্মারক ছবি সারিবদ্ধ ভাবে সাজানো, সেখানে দেখা মিলবে তার ছবিও। হাবিবুল বাশারের ইনজুরির কারণে ২০০৪ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেন রাজিন সালেহ। ডানহাতি এই ব্যাটের অধিনায়কত্বের সেই ঘটনাই তো বলে দেয় একটা সময় কতটা অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলেন জাতীয় দলে।
অথচ এর চার বছর পরই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়ে যায় রাজিনের। ফেরার লড়াইটা অবশ্য এরপরও করে গেছেন। কিন্তু সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
তবে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে রাজিন এক লড়াকু যোদ্ধাই হয়ে থাকবেন। নিয়মিত যিনি পারফর্ম করে গেছেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলেছেন দেড় যুগ। ২০১৮ সালে জাতীয় লিগে ঢাকা বিভাগ-সিলেট বিভাগের মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে সব ধরনের ক্রিকেটকে বিদায় বলেন সিলেটের ছেলে রাজিন।
বিদায় বেলায় তার নামের পাশে ছিল ১৪৮ ফাস্ট ক্লাস ম্যাচ, ১৪০ টি লিস্ট এ ম্যাচ ও ১টি ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি। ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচেও দুই ইনিংসে ফিফটি (৬৭, ৮৭) উপহার দিয়েছিলেন এই ‘যোদ্ধা’।
তবে তার নামের পাশে ২৪ টেস্ট ও ৪৩ ওয়ানডে কেবল আক্ষেপের কথাই বলে। ২০০০ সালে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের স্কোয়াডে ছিলেন রাজিন। একাদশে জায়গা না হলেও দ্বাদশ খেলোয়াড় হওয়ার সুযোগ মেলে। ক্যাচ নিয়েছিলেন শচীন টেন্ডুলকার ও মুরালি কার্তিকের।
জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়াতে জড়াতে এরপরও তিন বছর লেগে যায়। ২০০৩ সালে পাকিস্তান সফরে করাচি টেস্টে অভিষেক রাজিনের। যে আসরে পাকিস্তানি বোলারদের সামনে বুক চিতিয়ে লড়াই করে দারুণ প্রশংসা কুড়ান তখনকার তরুণ।
নিজের অভিষেক ম্যাচে দ্বিতীয় ইনিংসেই ২৯১ মিনিটের দীর্ঘ এক ইনিংস খেলেছিলেন (৬০ রান) রাজিন। মুলতানে বাংলাদেশের জিততে জিততে হেরে যাওয়া ম্যাচেও দুই ইনিংসে দারুণ ব্যাটিং করেন তিনি।
ধীরস্থির ব্যাটিং আর দুর্দান্ত ফিল্ডার হিসেবে সমাদৃত ছিলেন রাজিন। বাংলাদেশের অভিষেক টেস্ট সিরিজ জয়েরও অন্যতম নায়ক তিনি। ওয়ানডেতে মেহরাব হোসেন অপি ও আশরাফুলের পর তৃতীয় সেঞ্চুরিটি এসেছিল এই রাজিনের ব্যাট থেকেই। ২০০৬ সালের মার্চে কেনিয়ার বিপক্ষে খেলেন অপরাজিত ১০৮ রানের ইনিংস।
অথচ সে বছরই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচের পর আর ওয়ানডে খেলা হয়নি রাজিনের। সেটা ওই ধীর-স্থির ব্যাটিংয়ের জন্যই। যে ব্যাটিং দিয়েই একটা সময় পাকিস্তানের বিপক্ষে বুক চিতিয়ে লড়েছেন। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঢাকা টেস্ট ড্র করে দেশকে উপহার দিয়েছেন প্রথম সিরিজ জয়ের আনন্দ।
‘টেস্ট স্পেশালিস্ট’ রাজিন এরপর টেস্ট দল থেকেও বাদ পড়ে যান দুই বছরের মধ্যে। ২০০৮ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঢাকা টেস্টই হয়ে আছে তার শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ।
২৪ টেস্ট খেলে রাজিনের সংগ্রহ ১১৪১। সর্বোচ্চ ৮৯। অর্ধশত আছে ৭টি। আর ৪৩ ওয়ানডে খেলে সংগ্রহ করেছেন ১০০৫ রান। সর্বোচ্চ অপরাজিত ১০৫। ক্যারিয়ারে একমাত্র শতরানের সাথে আছে ৬টি অর্ধশত রান।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অবশ্য সমৃদ্ধ রাজিনের ক্যারিয়ার। ১৪৮ ম্যাচে করেছেন ৮৪৮১ রান। ৪৪টি ফিফটির সঙ্গে সেঞ্চুরি ১৮টি।
তবুও রাজিন আসলে এক আক্ষেপের নাম। অন্তত টেস্ট ক্যারিয়ারটা যার দীর্ঘ হতে পারত আরো।