৮ এপ্রিল ১৯৯৫। ২৫ বছর আগের এই দিনে হেলমেট পরে অ্যান্টিগা টেস্টে ব্যাট করতে নেমেছিলেন রিচার্ড বেঞ্জামিন রিচার্ডসন। জীবনে মাত্র একবারই? না। অবসরের আগের ৭ টেস্টেও পরেছিলেন। তবে প্রথম হেলমেট পরেন ৭৮তম টেস্টে। প্রতিপক্ষ ছিল অস্ট্রেলিয়া।
এই ঘটনার প্রতীকী তাৎপর্য অসীম। একে তো রিচি রিচার্ডসন ছিলেন অ্যান্টিগার। খেলাও হয়েছিল অ্যান্টিগাতেই। তাছাড়া ক্রিকেটে ক্যারিবিয়ান আধিপত্যও ক্রমশ মøান হচ্ছে তখন। উইন্ডিজ ক্রিকেটের ‘ভয়-ডর-হীন’ ইমেজ আস্তে আস্তে অপসৃয়মান। রিচার্ডসনের হেলমেট পরার ঠিক তিন সপ্তাহ পরে উইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া, যা ছিল ১৫ বছর পর ক্যারিবীয় দ্বীপে কোনো দলের প্রথম সিরিজ জয়।
রিচার্ডসন হেলমেটটা অ্যান্টিগা টেস্টে পরেছিলেন বলেই কি ঘটনার তাৎপর্য সহস্রগুণ বেড়ে গিয়েছিল? হতে পারে। কারণ উইন্ডিজের এই ছোট্ট দ্বীপ থেকেই উঠে এসেছিলেন স্যার আইজ্যাক ভিভিয়ান আলেকজান্ডার রিচার্ডস। ইংরেজ ক্রিকেট-লিখিয়ে শিল্ড বেরি যার সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘তার মাঠে ঢোকা দেখে মনে হতো একজন সম্রাট তার সাম্রাজ্যে ঢুকছেন। বিশ্বে এমন কোনো কোরিওগ্রাফার নেই যে সব রকম আলো এবং শব্দের ছটায় কোনো নায়কের এর চেয়ে ভালো প্রবেশ-দৃশ্য দেখাতে পারবে।’
অর্নিবচনীয় দৃশ্যই বটে। হাতে সøাজেঞ্জার ব্যাট। মাথা উঁচু, চুইংগাম চিবুতে চিবুতে ঢুকছেন মাঠে। প্রতিপক্ষের দিকে চরম উদ্ধত দৃষ্টি। মাথায় মেরুন রঙের টুপি। আজীবন এটাই পরেছেন ভিভ। লিলি-টমসনের আগুনে পেসের বিপক্ষেও। কারণ ভিভ মনে করতেন হেলমেট মানে আগেই ভয় পেয়ে যাওয়া। বোলারকে বেশি পাত্তা দিয়ে ফেলা।
অ্যান্টিগা থেকে উঠে আসা রিচার্ডসনও তাই মনে করতেন। যে কারণে ৭৭ টেস্ট খেলেছিলেন হেলমেট ছাড়া। এতে তার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ঔদ্ধত্যও প্রকাশ পেত। রিচার্ডসনের টেস্ট ক্যারিয়ার শুরু ১৯৮৩ সালে। আশির দশকের পুরোটাই তিনি ভিভের মতো মেরুন রঙের টুপি পরে ব্যাট করতেন। মেরুন হ্যাট পরা শুরু করেন এরপর, যা উইন্ডিজের ‘ফেয়ারলেস ব্র্যান্ড অব ক্রিকেটের’ প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রিচার্ডসন কিন্তু ভিভের প্রখর সময়েও দলে ছিলেন। ১৯৯১ সালে ভিভের বিদায়ী টেস্টে সেঞ্চুরিও আছে তার। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপারÑ অ্যান্টিগা থেকে উঠে আসার সুবাদে তাকে ভিভের উত্তরসূরিও ভাবা হতো। সেই ভাবনা কতটা যৌক্তিক ছিল তা ভিন্ন প্রসঙ্গ। তবে ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বেলায় রিচার্ডসনের জন্য তিক্ত অভিজ্ঞতাও হয়েছে ভিভের।
হ্যাটের প্রসঙ্গে ফেরা যাক। এক সময় রিচি রিচার্ডসনের হ্যাট পরা নিয়ে ‘লেট নাইট কমেডি শো’ও হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার টিভি চ্যানেলগুলোতে। সাধারণত সব ব্যাটসম্যানই তখন হেলমেট পরে মাঠে নামতেন। রিচার্ডসন একা পরতেন না। জানিয়েছিলেনÑ হেলমেটে শস্তিবোধ করেন না তিনি, ‘আমার বিশ্বাস ছিল বলের ওপর ঠিকভাবে চোখ রাখলে সহজাত রিফ্লেক্সের কারণে আপনা-আপনিই মাথাটা সরিয়ে নেওয়া যাবে।’ কিন্তু ১৯৮৫ সালে বেনসন অ্যান্ড হেজেস ওয়ার্ল্ড সিরিজের ম্যাচে খেলতে নেমে আহতও হন রিচার্ডসন। সেদিন ট্রেডমার্ক হ্যাট পরেই নেমেছিলেন। শ্রীলঙ্কান পেসার অশান্থা ডি মেলের একটি বল তার মুখে লেগেছিল। রক্তাক্ত অবস্থায় মাঠ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। তারপরও হেলমেট পরেননি। পরেছিলেন ১৯৯৫ সালের এই দিনে, হোমগ্রাউন্ডে। তরুণ গ্লেন ম্যাকগ্রার বাউন্সারের ভয়ে? এই একজন বাদে অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণ ভয়ংকর কিছু ছিল না। পল রেইফেল, ব্রেন্ডন জুলিয়ান আর যেই হনÑ লিলি-টমসন নন। হয়তো ক্যারিয়ারের উপান্তে রিচার্ডসনের মনে ভয় ঢুকেছিল। ভাটা পড়েছিল আত্মবিশ্বাসেও। কিংবা ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটের পতনের প্রতিধ্বনি শুনতে পেয়েছিলেন তিনি। খেলা ছাড়ার পর সিডনি মর্নিং হেরাল্ডকে বলেছিলেন আসল কারণটা, ‘অ্যান্টিগাতে আমি আগেও আঘাত পেয়েছিলাম। তাই ঝুঁকি নিতে চাইনি। তাছাড়া জ্যামাইকা টেস্টে ম্যাকগ্রার বল আমার মাথায় লেগেছিল। প্রথমবার হেলমেট পরার এটাও কারণ।’
ওই বছরেরই আগস্টে অবসর নেন রিচার্ডসন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওভালে শেষ টেস্টে আবার প্রিয় হ্যাট পরেই মাঠে নেমেছিলেন। তারপর মেরুন রঙের হ্যাটটা শোয়ার ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখতেন। কেন? সিডনি মর্নিং হেরাল্ডকে রিচার্ডসন বলেছিলেন, ‘রাতে আমি যখন ঘুমিয়ে পড়ি তখন ওটা আমার দিকে চেয়ে থাকে।’
উইন্ডিজ দলের সাবেক অধিনায়কের কাছে মেরুন হ্যাটটি ছিল আসলে গৌরবময় ক্রিকেট ক্যারিয়ারের জীবন্ত প্রতিচ্ছবির মতো। ব্রিজটাউনের কেনসিংটন ওভালের ড্রেসিং রুমে বসে এক দিন স্বগোক্তির মতো বলেছিলেন, ‘হ্যাটে আমি ডেসমন্ড হেইন্স, ভিভ, স্যার গ্যারি সোবার্স, এভারটন উইকসের মতো কিংবদন্তির স্বাক্ষর নিয়েছিলাম। যখন তরুণ ছিলাম তখন এদের মতো হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম।’
রিচার্ডসনের সেই স্বপ্ন কি সত্যি হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরে ৮৬ টেস্টে ৪৪.৩৯ গড়ে ৫৯৪৯ রান কী সাক্ষ্য দেয়? আসলে এমন প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর হয় না। কেবল সংশয় বারে। ক্রিকেট দুনিয়া জানে অ্যান্টিগা মানে ভিভ রিচার্ডস কিংবা বড়জোর অ্যান্ডি রবার্টস। কিছুতেই রিচি রিচার্ডসন নন। উইন্ডিজের ক্ষেত্রেও কথাটা একই রকম সত্য। রিচি রিচার্ডসন আসলে চেনা নক্ষত্রের ভিড়ে মিটিমিটি জ্বলতে থাকা তারাটির মতো। চোখে পড়লেও যার নাম মনে রাখে না কেউ!