নভেম্বরেই চীনে করোনার অস্তিত্ব পেয়েছিল মার্কিন গোয়েন্দারা

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে সেটি নভেম্বর থেকে ‘ট্র্যাক’ করছিল যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা। এর কয়েক সপ্তাহ পর বিষয়টি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জানানো হয়।

দেশটির প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে এই তথ্য দিয়েছেন এক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

যদিও ভাইরাসটি নিয়ে ঠিক কোন তারিখে প্রথম রিপোর্ট দেয়া হয় সেটি এখনো অস্পষ্ট। তবে সূত্রটি জানিয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দারা নভেম্বরেই এই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছিল এবং  যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব নিয়ে পরের কয়েক সপ্তাহে ঊর্ধ্বতন মহলকে একাধিক প্রাথমিক সতর্কতা দেয়।

অনেক যাচাই বাছাই ও মূল্যায়ন শেষে কোনো তথ্যের প্রতি বিশ্বস্ততা ও আস্থা অর্জনের পর নানা পরামর্শসহ সেটি মার্কিন সরকারের সর্বোচ্চ মহলে পৌঁছায় গোয়েন্দা বিশ্লেষক ও কর্মকর্তারা। সেই দিনটি ছিল ৩ জানুয়ারি, এদিন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দৈনিক ব্রিফিংয়ের মধ্যে চীনে একটি ভাইরাসের সংক্রমণ এবং সেটি যুক্তরাষ্ট্রেও প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে এমন তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেই ব্রিফিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন একজন বিষয়টি জানান।

কিন্তু পর্দার আড়ালে এই তথ্য নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে কাজ চলছিল। সিআইএ এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সংগৃহীত তথ্য অনুসন্ধান করে দেখছিল চীন কীভাবে এই সংক্রমণে জড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।

অস্ট্রেলিয়ান সংবাদমাধ্যম এবিসি বুধবার এক প্রতিবেদনে জানায়, মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিআইএ) এর শাখা ন্যাশনাল সেন্টার ফর মেডিকেল ইন্টেলিজেন্স (এনসিএমআই) নভেম্বরেই তথ্য সংগ্রহ করেছিল এবং সতর্ক করেছিল যে, চীনের উহান থেকে একটি নতুন ভাইরাস ছড়িয়ে যেতে পারে।

তবে সিএনএনের কাছে একজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা এই ধরনের প্রতিবেদন নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, ‘এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর টানা ২৪ ঘণ্টা ধরে করোনাভাইরাস নিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন সম্পর্কিত প্রত্যেকটি সম্ভাব্য বিষয়বস্তু যাচাই বাছাই করে দেখেছে এনসিএমআই এবং ডিআইএ। কিন্তু এ রকম কিছু পায়নি।’  

একইভাবে এবিসি নিউজের এই প্রতিবেদন অস্বীকার করে একটি বিবৃতি দিয়েছে পেন্টাগন। সেখানে এনসিএমআই এর ডিরেক্টর কর্নেল ডা. আর.শ্যান ডে বলেন, ‘এনসিএমআই নির্দিষ্ট কোনো গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে সাধারণত প্রকাশ্যে কোনো ধরনের মন্তব্য করে না। কিন্তু বর্তমান জনস্বাস্থ্য সংকট মুহূর্তে স্বচ্ছতা রাখতে আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে, নভেম্বরে করোনাভাইরাস সম্পর্কিত এনসিএমআই'র কোনো তথ্য বা মূল্যায়ন নিয়ে সংবাদমাধ্যমে যে খবর প্রকাশ হয়েছে সেটি মিথ্যা।’

এদিকে মার্চের মাঝামাঝি সময়ের পরও ওয়াশিংটন পোস্ট এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

সেখানে বলা হয়, করোনাভাইরাস বৈশ্বিক মহামারি ধারণ করতে পারে বলে আগে থেকেই মার্কিন গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য ছিল।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে করোনার বিস্তার এবং এর বিশ্বব্যাপী মহামারি হওয়ার আশঙ্কা সম্পর্কে গোপন সতর্কবার্তা মার্কিন সরকারকে দেওয়া হয়েছিল।

নাম প্রকাশ না করে মার্কিন কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গত জানুয়ারি মাস থেকেই সতর্ক করে আসছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পাশাপাশি কংগ্রেসের সদস্যদের কাছেও এসব বার্তা দেওয়া হয়েছিল।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো এ অবস্থা প্রত্যাশা করেননি। কিন্তু সরকারের অনেক ব্যক্তিও তাকে এ বিষয়ে কিছু করতে দেননি।’

ফেব্রুয়ারি মাসে এক টুইটে ট্রাম্প করোনাভাইরাসের হুমকিকে খাটো করে দেখিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাস যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ন্ত্রণেই আছে। শেয়ারবাজার আমার কাছে খুব ভালো বলে বোধ হচ্ছে।’

এ ছাড়া গোয়েন্দা তথ্য প্রাপ্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংক্রমণের শুরুতেই ট্রাম্প অস্বীকার করেন এ নিয়ে রাজনৈতিকভাবে বেশ সমালোচিত হন।

এদিকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শেষের দিকে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে নতুন করোনাভাইরাস ব্যাপকভাবে সংক্রমিত হতে শুরু করে। অল্পদিনেই প্রদেশজুড়ে সেটি ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই বিশ্ব সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পেতে থাকে করোনাভাইরাসটি। পরবর্তীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটির নাম দেয় কভিড-১৯। এক পর্যায়ে যা দুই শতাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়ে এই ভাইরাস।

জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা এখন ১৬ লাখ ৪২৭ জনে দাঁড়িয়েছে। মারা গেছেন ৯৫ হাজার ৬৯৯ জন। সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৬ জন।

আক্রান্তের সংখ্যায় শীর্ষে অবস্থান করছে যুক্তরাষ্ট্র। জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ৪ লাখ ৬৫ হাজার ৩২৯ জনে দাঁড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যা ১৬ হাজার ৬৯১ বলে জানিয়েছে ওয়ার্ল্ডোমিটারস।