করোনায় বন্দী ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে মায়ের দুঃসাহসী যাত্রা

করোনাভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ভারতজুড়ে চলা লকডাউনে আটকে পড়া ছেলেকে ১৪০০ কিলোমিটার স্কুটি চালিয়ে বাড়িতে নিয়ে এসেছেন এক মা। তেলেঙ্গানার রাজ্যের সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাজিয়া বেগম (৪৮) ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে এই তিন দিনের দুঃসাহসিক যাত্রায় অসাধ্যসাধন করেছেন।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, রাজিয়া বেগম নিজের আটকে পড়া তরুণ ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে গত সোমবার সকালে যাত্রা শুরু করেন। ছেলেকে নিয়ে বাসায় ফেরেন ৮ এপ্রিল বুধবার সন্ধ্যায়।

তেলেঙ্গানা প্রদেশের নিজামাবাদের বোধান থেকে অন্ধ্র প্রদেশের নেল্লোরের দূরত্ব ৭০০ কিলোমিটার। আসা-যাওয়া ধরলে ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। করোনাকালে লকডাউনের কারণে বাস, ট্রেন সবই বন্ধ। সাহসী এই নারীকে স্কুটি চালাতে হয় ২৩ থেকে ২৪ ঘণ্টা। এ হিসাবে ঘণ্টায় তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে ৬০ কিলোমিটারের মতো।

রাজিয়া বেগমের ছেলে মোহাম্মদ নিজামউদ্দিন হায়দরাবাদের নারায়ণা মেডিকেল একাডেমির শিক্ষার্থী। বয়স ১৯ বছর। গত ১২ মার্চ সহপাঠীর অসুস্থ বাবাকে দেখতে ও দরগার জিয়ারতে উদ্দেশে নেল্লোরে যান নিজাম। ফিরতি টিকিট ছিল ২৩ মার্চ। কিন্তু করোনাভাইরাস পরিস্থিতি সবকিছু বদলে দেয়। ট্রেন বাতিল হয়, শুরু হয় লকডাউন। নিজাম আটকা পড়েন বন্ধুর বাড়িতে।

এদিকে নেল্লোর করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেশি হওয়ায় ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ের রাজিয়া বেগম। এ জন্যে তাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করলেন। পুলিশের সহায়তা চাইলেন। কিন্তু লকডাউনের কড়াকড়ির কারণে বিফল হলেন।

রাজিয়া বলেন, আমি খুবই উদ্বিগ্ন ছিলাম। সে বাসায় থাকলে আমি তাকে চোখে চোখে রাখতে পারতাম। এ জন্য পুলিশের পরামর্শে লকডাউন শিথিল হয় কি না, সেই আশায় আমি অপেক্ষা করছিলাম।

কিন্তু রাজিয়াকে হতাশ করে ৫ এপ্রিল লকডাউন বাড়ানো হয়। লকডাউনের মধ্যে কোনো গাড়িচালক রাজি হচ্ছিলেন না। এ ছাড়া গাড়ি নিয়ে গেলে মহাসড়কে পুলিশের বাঁধার মুখে পড়ার সম্ভাবনা ছিল। এবার রাজিয়া সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি নিজেই যাবেন এবং স্কুটিতে বসিয়ে ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরবেন। যে কথা, সেই সিদ্ধান্ত। গত সোমবার সকালে নিজের স্কুটিতে রওয়ানা দেন তিনি।

রাজিয়া বলেন, আমি ২৫ বছর ধরে (টু হুইলার) স্কুটি চালাই। তাই স্কুটি চালানো নিয়ে ভীত ছিলাম না। কিন্তু দূরত্বটা ছিল আসলেই বেশি। এই যাত্রার কথা আমি ছেলেকেও জানাইনি। এমনকি আমার ভাইবোনদেরও না। আমি সোমবার সকালে যাত্রা করি এবং হায়দরাবাদের বাইরে গিয়ে ছেলেকে জানাই যে আমি তাকে নিতে আসছি।

যাত্রাপথে রাজিয়া বেগম যেখানেই পেট্রলপাম্প পেয়েছেন, জ্বালানি ভরে নিয়েছেন। এ ছাড়া একটি ক্যানে সব সময় বাড়তি জ্বালানি রেখেছেন। আর ক্ষুধা নিবারণের জন্য বহন করেন রুটি ও সবজি।

রাজিয়া বলেন, আমি পেট্রলপাম্পে ১৫-২০ মিনিট বিরতি দিতাম। পানি পান করতাম। আর স্কুটির ইঞ্জিনটিকে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ দিতাম। ভাগ্য ভালো, স্কুটিটি মাঝপথে বিকল হয়নি।

রাজিয়া যখন তেলাঙ্গানা অন্ধ প্রদেশ সীমান্তে পৌঁছান, তখন সন্ধ্যা হওয়ার পথে। তার যাত্রা শুরু এবং গন্তব্যের কথা শুনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ভড়কে যান। কারণ, মহাসড়কে আর কোনো যানবাহন নেই। নিরাপত্তার কথা বলে ফেরত যেতে বলেন। কিন্তু রাজিয়া তাদের বোঝাতে সক্ষম হন যে তিনি নিরাপদে পথ চলতে পারবেন।

রাজিয়া বলছিলেন, মহাসড়ক ছিল অন্ধকার এবং সুনসান। কিন্তু আমাকে আমার ছেলেকে আনতে যেতেই হবে। রাত ২টার দিকে পুলিশ চেক পয়েন্টে থামায়। তারা আমার উদ্দেশ্যে সম্পর্কে শোনে। সামনের সড়ক খুবই বিপজ্জনক উল্লেখ করে সেখানেই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরামর্শ দেয়। চেকপোস্টের কাছে কিছুক্ষণ আশ্রয় নিয়ে রাত চারটায় রওনা করি। তখন ছেলেকে ফোনে বলি আমি কাছাকাছি চলে এসেছি।

ছেলে নিজামউদ্দিন মায়ের সম্পর্কে বলেন, আমাকে নেওয়ার জন্য ২৩-২৪ ঘণ্টা স্কুটি চালিয়ে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মা তাকে নিতে আসেন। আমি তাকে দেখে বিহ্বল ও আনন্দিত ছিলাম। ওই দিন বিকেলেই আমরা ফিরতি যাত্রা শুরু করি। বুধবার সন্ধ্যায় বোধানে ফিরে আসি। তখনই মা দুই দিন পর ঠিকমতো খাবার গ্রহণ করেন।

বোধানের সহকারী পুলিশ কমিশনার ভি জয়পাল রেড্ডি বলেন, রাজিয়া খুবই সাহসী নারী। আমি তাকে একটা গাড়ি ভাড়া করার পরামর্শ দিয়েছিলাম। এত টাকা খরচ করতে পারবেন না বলে তিনি স্কুটিতেই যেতে চাইলেন। তিনি তার এই যাত্রার উদ্দেশ্য লিখে একটি কাগজ দেওয়ার অনুরোধ করলেন, যাতে পথে পুলিশ আটকালে দেখাতে পারেন। আসলে তার সাহসেই তিনি আটকে পড়া ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে পেরেছেন।