লকডাউনের মাঝে ভাঙা সাইকেলে ৭০০ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে বাড়ি ফিরে আস্তাব আলী বললেন, ‘‘ঘরে ফেরা যে কী শান্তির!’’ উত্তর প্রদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে ফেরার সময় তার সম্বল বলতে ছিল আধ-ভাঙা মোবাইল, ১২০০ টাকা আর জোগাড় করা নড়বড়ে একটি সাইকেল।
আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, মেয়ের কান্না সহ্য করতে না পেরে আস্তাব বৃহস্পতিবার বিকেলে উত্তরপ্রদেশের বালিয়া থেকে পাড়ি দেন গ্রামের দিকে। পাঁচ দিন প্যাডেল করে গ্রামে পৌঁছান তিনি। এরপর চিকিৎসক তাকে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দেন।
টোল খাওয়া প্যাডেল, দু-চাকা মিলিয়ে উধাও খান পাঁচেক স্পোক, রং চটে যায় পথে। কিন্তু মেয়ের কান্না আর খিদের জ্বালায় শেষ পর্যন্ত নদী-নালা-পাকা সড়ক ঠেঙিয়ে তাকে টেনে এনেছে ডোমকলের মানিকনগর গ্রামে। আস্তাব আলি বলেন, ‘‘এতটা পথ, কেমন ঘোরে ছিলাম। এই কয়েকটা দিন অনেক কিছু শিখিয়ে দিল।’’
আস্তাব আলি শেখের নিজের এলাকা বাজিতপুর গ্রামের শাঁখার খ্যাতি ভারতজোড়া। গত দশ বছর সেই শাঁখা নিয়েই বিভিন্ন রাজ্যে বিক্রি করেন তিনি। মাস দুয়েক আগে শাঁখা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন বিহার-উত্তরপ্রদেশে। ২১ মার্চ লকডাউন ঘোষণার সময়ে তিনি ছিলেন উত্তরপ্রদেশের এক গ্রামে।
আস্তাব বলেন, ‘‘লকডাউন শুরু হওয়ার পরে ভেবেছিলাম, হয়তো কয়েক দিন পর উঠে যাবে। কিন্তু সময়সীমা ক্রমেই বাড়তে থাকে। দেখলাম, গ্রামে পৌঁছতে না পারলে না খেয়েই মরতে হবে ভিনরাজ্যে। তাই আর দেরি করিনি।’’
বালিয়াতেই দেখা হয় বেলডাঙার কয়েকজন যুবকের সঙ্গে। তাদেরই একজনের ধার দেওয়া ভাঙা সাইকেল আর বারোশো টাকা নিয়ে ভেসে পড়েছিলেন আস্তাব।
বিহারের রাস্তায় নষ্ট হয়ে যায় সেই নড়বড়ে সাইকেল। ভেঙে পড়েননি। আশপাশের লোকজনের কাছে হাতজোড় করে মিনতি করেছিলেন একটা সাইকেল জোগাড় করে দেওয়ার জন্য। শেষতক, সঞ্চয়ের ওই বারোশো টাকা দিয়েই একটি সাইকেল কিনে শুরু হয় তার দ্বিতীয় পর্বের যাত্রা।
পথে কিছু মানুষের সাহায্যও পেয়েছেন আস্তাব। বলেন, ‘‘আমার দুরবস্থার কথা শুনে সেখানকার একটি স্কুলে রাত কাটানোর ব্যবস্থা করে দেন এক প্রৌঢ়। রাতে নিজের বাড়ি থেকে রান্না করা খাবারও এনে দেন। রাস্তায় আরও কয়েক জনের সঙ্গে দেখা হয়েছে, তারা কেউ আমায় চা-জলের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, কেউ নিজের বাড়ির বারান্দায় রাতে থাকার জায়গা দিয়েছেন।’’
১৪ এপ্রিল উঠে যাওয়ার কথা থাকলেও ৩ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে ভারতের লকডাউন। মঙ্গলবার এই ঘোষণা দেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।